প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নারীকে জাহিলিয়াতের আঁধার থেকে আলোতে এনেছেন নবীজি

আল ফাতাহ মামুন : উপমহাদেশে ইসলাম আগমনের হাজার বছর আগে থেকেই হিন্দুরা ধর্মের নামে নারীকে গৃহবন্দি রাখার নিয়মকানুন পালন করে আসছিল। শরৎচন্দ্রের ‘নারী’ প্রবন্ধে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা আছে। এ অঞ্চলের হিন্দুরা যখন ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করে, তখন অনেক সংস্কৃতির সঙ্গে নারীকে বন্দি রাখার সংস্কৃতি থেকে তারা বেরিয়ে আসতে পারেনি। বেগম রোকেয়ার লেখা থেকে জানা যায়, এক বাড়ির মেয়ে অন্য বাড়ির মেয়ের সঙ্গে কথা বলাকে কবিরা গোনাহ মনে করত উপমহাদেশের মুসলিম ধর্মবিদরা। শিশুকন্যার কান্না পরপুরুষ শোনা পাপ- এ জন্য তার মুখ চেপে ধরত মা।

ভাবা যায়, মাত্র একশ’ বছর আগেও ইসলামের নাম করে কী নির্মমভাবে ঠকানো হতো নারীদের! বেগম রোকেয়ার কলম গর্জে উঠে বলল, ধর্মের নামে নারীর অবরোধ জীবন ভেঙে দাও। তিনি নারীদের বোঝাতে শুরু করলেন, মহাবিশ্বে চিরকল্যাণকর কিছু করতে হলে পুরুষের পাশাপাশি নারীকেও সমানভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

এসব কিছু ছোট্ট রাশিদার মনে গভীর প্রভাব ফেলে শত বছর আগে বলা বেগম রোকেয়ার কথাগুলো। ওই বয়সেই জীবনের লক্ষ্য ঠিক করে নেন তিনি। নিয়ত করেন- মুসলিম নারী উন্নয়নে জীবন উৎসর্গ করব। নিয়ত যখন খালেস হয়, প্রভু তখন এভাবেই কবুল করেন। সেদিনের ছোট্ট রাশিদা আজ নারায়ণগঞ্জের কুতুবপুর ইউনিয়ন পরিষদের সফল মেম্বার। প্রথমে তিনি ছিলেন নারী সংগঠক। বয়স্ক শিক্ষাকার্যক্রম দিয়ে শুরু হয় তার নারী উন্নয়নের কাজ। এরপর নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ধর্ম-ইবাদত ঠিক রেখে দীর্ঘ বিশ বছর তিনি রাজনীতির ময়দানে দাপটের সঙ্গে জনগণের হৃদয় দখল করে আছেন।

দাদা হাজী পান্দেআলী মিয়া ছিলেন পাকিস্তান আমলের চেয়ারম্যান। ধর্মভীরু মানুষ। বাবা ছিলেন কঠোর শরিয়ত মানা লোক। সত্তরের দশকের শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে রাশিদা বেগম বলেন, ওই সময় আমরা পারিবারিক-সামাজিক কারণে কঠোর অবরোধ প্রথা মেনে চলতাম। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই আমার মন নারী জাগরণ নিয়ে ভাবত। মানুষের বিপদাপদে একজন পুরুষের মতোই ঝাঁপিয়ে পড়তাম। বাবা বলতেন, ‘তোর সাহস দেখে মনে হয় না- তুই একজন মেয়ে। বরং একজন পুরুষের চেয়ে দক্ষতায়-সাহসে তুই কোনো অংশেই কম না।’

এক বড়দিল মানুষের সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন রাশিদা বেগম। স্বামী আবদুল কাদির তাকে বললেন, ‘অবহেলিত নারী সমাজের উন্নয়নে তুমি কাজ শুরু করে দাও। আমার পক্ষ থেকে কোনো বাধা নেই।’ যেন এক মায়ামন্ত্র ঢেলে দেয়া হল রাশিদার কানে। জাদুগ্রস্ত মানুষের মতো তন্ময় হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন গ্রামের অশিক্ষিত নারীদের জীবনে উন্নয়নের জিয়নকাঠি ছুঁইয়ে দিতে। রাশিদা কাদির বলেন, প্রথমে আমি বয়স্ক শিক্ষাকার্যক্রম শুরু করি। শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতি বড় হয় না। নবীজি (সা.)-এর প্রতি কোরআনের প্রথম ওহিও ছিল ‘ইকরা’ বা ‘পড়’। তারপর ‘ওয়ার্ল্ড ফুড’ অর্থাৎ কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির মাধ্যমে নারীদের নানা বিষয়ে কর্মমুখী শিক্ষা দিতে থাকি। নারীরা ঘর ছেড়ে বেরোতে চাইত না- তাই তাদের বাড়ি গিয়ে কিংবা কাছাকাছি কোনো বাড়িতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতাম। ওই সময় দেশে প্রচুর অভাব ছিল। কারণ নারীরা ছিল অলস এবং উপার্জন অক্ষম। প্রশিক্ষণ পেয়ে নারীরা যখন উপার্জনের মুখ দেখল, তখন অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফিরে আসতে শুরু করল। আজ পুরো দেশের দিকে তাকিয়ে দেখুন, দেশে অনেক সমস্যা আছে কিন্তু না খেয়ে কেউ মরছে না। ভাতের অভাবে ঘরে ঘরে মানুষ ভাতের মাড় খেয়ে কিংবা না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে না। এটি কেন হয়েছে? কারণ অর্থনীতিতে নারীরা অবদান রাখছে। যে কারণে শত প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কষ্টের কথা হল- পুরুষের মতো কখনও কখনও পুরুষের চেয়ে বেশি শ্রম দিয়েও অল্প পারিশ্রমিক দেয়া হয় নারীকে। ইসলামী শ্রমনীতির দৃষ্টিতে এ বৈষম্য ভয়াবহ গোনাহ।

শুরুর দিকে অনেকেই আমার কাজ ভালো চোখে দেখত না। বিশেষ করে এলাকার আলেম সমাজ। বলত নারী হয়ে কেন এত দৌড়ঝাঁপ করি। বংশগত একটি প্রভাব থাকার পাশাপাশি আমি ছিলাম পাক্কা ধার্মিক। আমার চলনবলনে ধর্মের গাঢ় ছাপ এখনও রয়েছে। এ জন্যই সাধারণ নারীরা আমার ডাকে ছুটে এসেছে। এ দেশের আলেমরা তো একসময় রাজনীতিকে হারাম মনে করত। সাধারণ মানুষের এখনও রাজনীতি সম্পর্কে সুধারণা হয়ে ওঠেনি। অথচ সেই নব্বইয়ের দশকে আমি এলাকার কট্টর মুসলিম ঘরের মেয়েদের নিয়ে নিয়মিত মিছিল-মিটিং-সভা-সমিতি করতাম। আমার প্রতি মানুষের এ বিশ্বাস

জন্মেছিল- আর যাই করুক রাশিদা কোনো গোনাহের কাজে মেয়েদের নেবে না।

২০০৩ সালে আমি প্রথম মেম্বার নির্বাচিত হই। সেই থেকে আমি একাধারে দায়িত্ব পালন করে আসছি। মানুষের সুখে-দুঃখে আমি সর্বক্ষণ তাদের পাশে আছি। আল্লাহর রহমতে আমি গর্ব করেই বলতে পারি- কোনো পুরুষের চেয়ে কোনো অংশেই আমি পিছিয়ে নেই বরং সবদিক থেকে এগিয়ে। জাতীয়-আন্তর্জাতিক অনেক সার্টিফিকেট আমি পেয়েছি। প্রচার-প্রসারের ফন্দি ফিকির কখনই করিনি। প্রতিকূল পরিবেশে একজন নারী তার ধর্ম ঠিক রেখে সামাজের নেতৃত্ব দেয়া চাট্টিখানি কথা নয়। এখন হয়তো অনেক সহজ হয়ে গেছে কিন্তু আমরা যখন শুরু করেছিলাম, তখন সহজ ছিল না। আল্লাহর সাহায্য এবং আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে আমি এত দূর এসেছি।

নারীদের উদ্দেশ্য কোরআন থেকে একটি চমৎকার উদাহরণ দেন রাশিদা বেগম। হজরত মরিয়ম (আ.) জন্মের পর তার মা প্রার্থনার দু’হাত তুলে বলল, হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে পুত্র সন্তানের আরজি করেছিলাম, যে হবে তোমার ঘর বায়তুল মোকাদ্দাসের খাদেম। আর্ত-মানবতার সেবায় নিবেদিতপ্রাণ। মানুষের জন্য নিজেকে উজাড় করে দেয়া অভিভাবক। দরদি নেতা। অথচ তুমি খুশি হয়ে আমার কোলজুড়ে দান করলে ফুটফুটে কন্যাসন্তান। এখন আমার স্বপ্নগুলো কীভাবে ডানা মেলবে! জবাবে আল্লাহ বললেন, এ কন্যা অন্যসব পুরুষের চেয়েও উত্তম। সূরা আলে ইমরানের এ ক’টি আয়াত পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর পাশাপাশি যুগ যুগ ধরে প্রচলিত একটি ধারণাও ভেঙে দিয়েছে। ধারণাটি হল- যতই পড়াশোনা কর না কেন, যেহেতু নারী হয়ে জন্মেছে রান্না ঘরে বাসন মেজেই জীবনপার করতে হবে। ইসলামের সোনালি যুগে যুদ্ধের সেনাপতি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে পুরুষের পাশাপাশি দায়িত্ব পালন করেছে সর্বজয়া নারী। এ বিশ্বজুড়ে নারীর জয়জয়কার চলছে। ধর্মের দোহাই দিয়ে নারীদের অন্দরের অন্ধকারে পড়ে থাকলে চলবে না। বেরিয়ে আসতে হবে আলো ঝলমলে পৃথিবীতে। আমাদের নবীজি (সা.) ও ঠিক এ কাজটিই করেছেন। জাহেলিয়াতের অন্ধকার থেকে নারীদের ইসলামের আলোতে নিয়ে এসেছিলেন।

লেখক : সাংবাদিক

সূত্র : যুগান্তর

সর্বাধিক পঠিত