প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

গতি নেই মশক নিধনে

আমাদের সময় : সম্প্রতি মশার উপদ্রব অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু ঢাকার দুই সিটি কর্তৃপক্ষের মশক নিধনে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। মশক নিধনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) কেনা নতুন মেশিনগুলো চালালে আগুন ধরে যাচ্ছে। আর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেশিনগুলো এ পর্যন্ত বাক্স থেকে খোলাই হয়নি। মশক নিধনে শিগগির কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে এ বছরও দেশে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম দিন থেকে গত বুধবার পর্যন্ত ডেঙ্গু সন্দেহে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৩৬ জন। তাদের মধ্যে চিকিৎসার পর ইতোমধ্যেই ছাড়পত্র পেয়েছেন ২২৯ জন।

গত বছর মার্চের শেষের দিকে রাজধানী ঢাকায় ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। পরে তা দেশের সব জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। এ রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা সে সময় লাখ ছাড়িয়ে যায়। শুধু সরকারের হিসাব রাখা হাসপাতালগুলোতেই ১৬৬ ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয় বলে সরকারের তরফে জানানো হয়। নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত ছিল ডেঙ্গুর প্রকোপ। সে সময় হাসপাতালগুলোতে ধারণ সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি রোগী ভর্তি হওয়ায় হাসপাতালগুলোর বারান্দা, মেঝে ইত্যাদিও ভরে যায় ডেঙ্গু রোগীতে। এ রোগে আক্রান্তদের ওষুধ সংকট ছাড়াও রোগটি নির্ণয়ের সরঞ্জামও ছিল অপ্রতুল।

সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন ডেঙ্গু প্রকট আকারে ছড়িয়ে পড়ার পর তা প্রতিরোধে তৎপর হলেও কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। সে সময় মশক নিধনে দুই সিটির ধারণাতীত সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও উঠে আসে। ঋতুগত পরিবর্তনের পর প্রকৃতিগতভাবেই ডেঙ্গুর ভয়াবহতা অনেকটাই কমে আসে নভেম্বরের শেষ দিকে। সেই সঙ্গে থমকে যায় দুই সিটি কর্তৃপক্ষের ঘোষণাকৃত নানা উদ্যোগও। এর মধ্যে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ডামাডোলে হারিয়ে যায় ডেঙ্গুর কারণে পুরো জাতি যে মারাত্মক সংকটে-শঙ্কায়, উদ্বেগে-উৎকণ্ঠায় ছিল, সেই বিষয়টি।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ডেঙ্গুর ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়ার সময় প্রায় নিয়মিতই এলাকায় এলাকায় মশার ওষুধ ছিটানো হলেও গত দুই মাস ধরে বন্ধ রয়েছে মশার ওষুধ ছিটানো। ফলে যারপরনাই বেড়েছে মশার অত্যাচার। উত্তর সিটি করপোরেশনের কিছু কিছু এলাকায় মশার ওষুধ ছিটানো হলেও দক্ষিণে অনেকাংশেই বন্ধ রয়েছে। কালেভদ্রে মশার ওষুধ ছিটানো হলেও তা পর্যাপ্ত নয়, বলছেন নগরবাসী। এর বাইরে উত্তর সিটি মশক নিধনে সাধারণ মানুষকে সচেতনতায় বেশ কয়েকটি সভাও করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর বেশ কিছু এলাকায় এডিস মশার পরিমাণ বেশি। বিভিন্ন সরকারি সংস্থার জরিপেও রাজধানীর অন্তত ত্রিশটি স্থানে মশার ভয়াবহতার কথা বলা হয়েছিল। এক্ষেত্রে নতুন মেয়রদের প্রধান কাজ হবে, এসব স্থানকে গুরুত্ব দিয়ে পুরো রাজধানীতেই মশার প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ। ওয়ার্ডভিত্তিক এডিস মশা নিধনে টিম গঠন করে কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও পরিচ্ছন্ন সিটি গড়ার কার্যক্রমে যুক্ত করা।

অন্য বছর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে এডিস মশার উপদ্রব তেমন ছিল না। তবে এবার জানুয়ারি মাস থেকেই নগরীতে এডিস মশার উপস্থিতি বেশি পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে ডেঙ্গু সার্ভিলেন্স অ্যান্ড প্রেডিকশন প্রোজেক্টের আওতায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মশার উপস্থিতি নিয়ে গবেষণা করছেন তিনি।

কবিরুল বাশার বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকাকে ছয়টি অঞ্চলে ভাগ করে জানুয়ারির ১ তারিখ থেকে মশার উপস্থিতি দেখা হচ্ছে। এই জরিপ চলবে আগামী দুই বছর। এই জরিপে দেখা গেছে, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসেও রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার উপস্থিতি রয়েছে। এখন উপস্থিতি কম থাকলেও তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মার্চ-এপ্রিলের দিকে এর আরও প্রকোপ বাড়বে। তাই বৃষ্টি হওয়ার আগে আগেই মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করার উদ্যোগ নিতে হবে।

তিনি বলেন, মশা নির্মূল কিন্তু হঠাৎ করে সম্ভব নয়। গত বছর জানুয়ারি মাসে যে পরিমাণ ডেঙ্গু রোগী ছিল এ বছরের জানুয়ারি মাসে কিন্তু সেই তুলনায় ডেঙ্গু রোগী অনেক বেশি। এটা অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে।

তিনি বলেন, এক্ষেত্রে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বছরব্যাপী পরিকল্পনার মাধ্যমে কাজ করতে হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে অন্তত চারজন কর্মীকে ডেঙ্গু নিধনে কাজে লাগাতে হবে। যারা প্রতি মাসে মাসে মেয়র বরাবর রিপোর্ট দেবেন।

এদিকে গত বছরের ডেঙ্গু মৌসুমে উত্তর সিটির উদ্যোগে জরুরি ভিত্তিতে মেসার্স প্যারেন্টস এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কেনা হয় জার্মানির তৈরি দুইশ ফগার মেশিন ও পাঁচটি ভেহিক্যাল মাউন্টেন্ড ফগার মেশিন। কিন্তু এখন পর্যন্ত মেশিনগুলো সফলভাবে ব্যবহার করতে পারেনি তারা। অভিযোগ উঠেছে, মেশিনগুলো চালুর পর আগুন ধরে যায়। ভালো করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করেই তুলনামূলক বেশি দাম দিয়ে এগুলো কেনা হয়েছে।

গত ১৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মিরপুর পুলিশ কনভেনশন হলের পেছন থেকে মশা নিধনে দুই সপ্তাহব্যাপী ক্রাশ প্রোগ্রামের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছে ডিএনসিসি। উদ্বোধনের আনুষ্ঠানিকতা শেষে ভেহিক্যাল মাউন্টেন্ড ফগার মেশিন দুটি চালুর চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ চেষ্টার পর একটি চালু হলেও সেটি থেকে বিপজ্জনকভাবে আগুনের স্ফুলিঙ্গ বের হতে থাকে। অন্যটি কিছু সময় চললেও পরে নল থেকে স্ফুলিঙ্গ বের হয়। জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটির প্রধান ক্রয় ও ভা-ার কর্মকর্তা মো. সগীর হোসেন বলেন, আমরা যথাযথ প্রক্রিয়ায় মেশিনগুলো ক্রয় করি। কমিটি যেই মেশিনগুলো কেনার জন্য সুপারিশ করে, আমরা সেগুলোর জন্য প্রক্রিয়া শেষ করি। আমাদের কাছে যেই অর্ডার এসেছে, সেই অর্ডার অনুযায়ী আমরা কাজ করেছি।

একই অবস্থা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনেরও। সংস্থাটি জরুরি ভিত্তিতে প্যারেন্টস এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমেই আড়াই শতাধিক ফগার মেশিন আমদানি করে জার্মানি থেকে। প্রতিটি মেশিন এক লাখ ৬৭ হাজার টাকার দরে কেনা হলেও মেশিনগুলো এখনো ব্যবহার করা হচ্ছে না। ভা-ার বিভাগের সামনে গত কয়েক মাস ধরে বাক্সবন্দি অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে। যদিও দক্ষিণ সিটিতে ফগার মেশিনের সংকট রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারি ভা-ার ও ক্রয় কর্মকর্তা মনোজ কুমার রায় বলেন, আমরা আড়াইশর মতো মেশিন আমদানি করেছি। এর ব্যবহারের বিষয়ে কিছু বলতে পারব না। স্বাস্থ্য বিভাগ বলতে পারবে। তবে প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রি. জেনারেল (ডা.) মো. শরীফ আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

এদিকে গত মাসে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে মশার ওষুধ মিক্সিংয়ের জন্য দরপত্র আহ্বান করে ভা-ার বিভাগ। উড়ন্ত মশা মারার জন্য দক্ষিণ সিটির নিজস্ব তত্ত্বাবধানে আমদানিকৃত ৬ লাখ ৪০ হাজার মেলাথিউন মশার ওষুধ মিক্সিং করার জন্য এ টেন্ডারে অংশ নেয় তিনটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো লিমিট এগ্রো, ফরওয়ার্ড ও জায়িন কনস্ট্রাকশন। এর মধ্যে লিমিট এগ্রো উত্তর সিটিতে গত এক বছরের জন্য টেন্ডারে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ ছিল। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী কামরুল ইসলাম মোল্লা বলেন, আমরা এক বছরের জন্য উত্তর সিটিতে নিষিদ্ধ ছিলাম। এখন নিষিদ্ধ নয়। সরকারিভাবে কাজ করার যোগ্য আমাদের প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া টেন্ডারে অংশ নেওয়া ফরওয়ার্ড কোম্পানি লিমিট এগ্রোর ডিরেক্টর মিজানুর রহমান নিজেই প্রতিষ্ঠা করেছেন। অন্যদিকে জায়িন কনস্ট্রাকশন একটি নির্মাণ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকনের বন্ধু পরিচয় দেওয়া নগর ভবনের বিতর্কিত ঠিকাদার জসিমউদ্দিন সবুজের। যার অতীতে এ সংক্রান্ত কোনো কাজের অভিজ্ঞতা নেই।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ