প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ব্যবসা-বাণিজ্য ও ইসলামি দর্শন

মোহাম্মাদ মোস্তাকিম হোসাইন : ইসলাম একমাত্র ধর্ম বা জীবনব্যবস্থা, যার মধ্যে রয়েছে মানব জাতির যাবতীয় সমস্যার সমাধান। মহান আল্লাহ্ তায়ালা মানুষ ও জিন জাতিকে একমাত্র তার ইবাদতের জন্য তৈরি করেছেন। বনি আদমের ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রে যাবতীয় কার্যক্রমই ইবাদতের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে, যদি কার্যক্রমগুলো কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে পরিচালিত হয়। ব্যক্তি পর্যায় থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন অর্থের। অর্থ মানবজীবনের জন্য একটি অপরিহার্য উপাদান। আর অর্থ উপার্জনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যাম হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য। পৃথিবীতে নানা ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু রয়েছে। মনে রাখতে হবে, একটি দেশের অর্থব্যবস্থার আলোকে সেদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের মূলনীতি নির্ধারিত হয়। সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থার মূলনীতি আর পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার মূলনীতি এক রকম নয়। উক্ত দুই মূলনীতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নতর ও ব্যতিক্রম, যা ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে জনগণ ও রাষ্ট্রকে কল্যাণ ও অগ্রগতির দিকে ধাবমান করে ইসলাম। ইসলামি ব্যবসানীতিতে সব অবৈধ কারবার ও লেনদেন নিষিদ্ধ। তেমনি জবরদস্তিমূলক কারবার, নিষিদ্ধ জিনিসের কারবার, ধোঁকা ও প্রতারণামূলক কারবার ইত্যাদি নিষিদ্ধ। ইসলামের ব্যবসানীতি ও ইসলামের মৌল নীতিমালার আলোকে স্থিরকৃত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর মো. মাসুদ আলম তার একটি প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ব্যবসা-বাণিজ্য ও পারস্পরিক কার্যকারবারের বৈধতা ও সুষ্ঠুতা চারটি প্রধান নীতির ওপর নির্ভর করে। ১. পারস্পরিক সহযোগিতা ২. পারস্পরিক সম্মতি ৩. চুক্তিবদ্ধ হওয়ার যোগ্যতা এবং ৪. ন্যায়সংগত কারবার।

পারস্পরিক সহযোগিতা ছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য সম্ভব নয়। শুধু একক ব্যক্তির পক্ষে ব্যবসা অসম্ভব। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ তায়ালা বলেন, ‘সত্কর্ম ও খোদাভীতিতে একে অন্যের সাহায্য করো। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা কোরো না। (আল-কোরআন ৫-২) আল্লাহ্ তায়ালা স্বীয় অসীম জ্ঞান ও পরিপূর্ণ ক্ষমতায় বিশ্বচরাচরের জন্য এমন অটুট ব্যবস্থা রচনা করেছেন, যাতে একজন অন্যজনের মুখাপেক্ষী। দরিদ্র ব্যক্তি পয়সার জন্য যেমন বিত্তবানের মুখাপেক্ষী, তেমনি একজন শ্রেষ্ঠ ধনী লোক পরিশ্রম ও মেহেনতের জন্য দিনমজুরের মুখাপেক্ষী।

মনে রাখতে হবে, অবৈধ পন্থায় অর্থসম্পদ বৃদ্ধি করা এবং মুনাফা অর্জন করা ইসলামি শরিয়তের বিরোধী। এজন্য সব ধরনের জুয়া ও লটারির ব্যবসা নিষিদ্ধ করেছে ইসলাম। কারণ এর মাধ্যমে নির্ঘাত লোকসানে পড়ে পথে বসার আশংকা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেন, ‘তারা আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, বলে দিন এতদুভয়ের মধ্যে রয়েছে মহাপাপ। (সুরা বাকারা :২১৯) আল্লাহ্ অন্যত্র বলেন, ‘নিশ্চয় মদ ও জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্যনির্ধারণ (গণক)—এসব শয়তানের অপবিত্র কাজ। অতত্রব এগুলো থেবে বেঁচে থাকো, যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হতে পারো। (সুরা মায়দা :৯০)। এতে অনুধাবন করা যায় যে হারাম জিনিসের ব্যবসাও হারাম। অর্থাত্, ব্যবসার জন্য দরকার শরিয়তসম্মত তথা বৈধ বস্তু। পারস্পরিক সহযোগিতা ছাড়া ব্যবসা সম্ভব নয়। শুধু বিক্রেতার মাধ্যমে পূর্ণ ক্রয়-বিক্রয় সম্ভব। তেমনি দরকার পারস্পরিক সম্মতি। মনে রাখতে হবে, সব ধরনের কারবারে উভয় পক্ষের (ক্রেতা-বিক্রেতা) স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি অবশ্যই প্রয়োজন। এখানে জবরদস্তির কোনো সুযোগ নেই। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তায়ালা সুরা নিসার ২৯ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করেছেন, ‘হে বিশ্বাসীগণ, তোমরা একে অপরের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করিও না। কিন্তু তোমাদের পরস্পরের সম্মতিতে ব্যবসা করা বৈধ এবং একে অপরকে হত্যা করিও না, নিশ্চয় আল্লাহ্ পরম দয়ালু।’ যেসব ক্ষেত্রে ব্যবসার নামে সুদ, জুয়া, ধোঁকা, প্রতারণা ইত্যাদির আশ্রয় নিয়ে অন্যের সম্পদ হস্তগত করা হয়, সেসব পস্থায় সম্পদ অর্জন করা বৈধ ব্যবসার অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং হারাম ও বাতিল পন্থা। তেমনিভাবে উভয় পক্ষের আন্তরিক সন্তুষ্টি না থাকলে সেইরূপ ক্রয়-বিক্রয়ও হারাম ও বাতিল বলে গণ্য হবে।

অনেকে জবরদখল বা প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে ব্যবসার নামে অন্যের সম্পদ, দোকান, পজেশন, জায়গা দখল করে নেয় নামমাত্র অর্থ দিয়ে অথবা সমুদয় গ্রাস করে, যা ইসলামবিরোধী এবং হারাম। তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। তাই সুদের কারবার কিংবা শ্রমিকের শ্রমের তুলনায় পারিশ্রমিক কম দেওয়া উচিত নয়, বরং তা ত্যাগ করা ও তওবা করা জরুরি। যার প্রাপ্য যতটুকু, তা ঠিকমতো বুঝিয়ে দেওয়া মালিকের কর্তব্য। সুদের কারবারে রয়েছে জবরদস্তি ও অসহায় মানুষকে নিঃস্ব করার ফাঁদ। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তায়ালা সুরা বাকারার ২৭৫ নম্বর আয়াতে বলেন, ‘আল্লাহ্ ক্রয়-বিক্রয়কে (ব্যবসা) হালাল এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ সুতরাং বিষয়টি আমাদের কাছে সুস্পষ্ট যে চাপ সৃষ্টি করে বা জবরদস্তি করে লেনদেন করতে বাধ্য করা এবং তা থেকে মুনাফা অর্জন করা যাবে না। সুদ সম্পর্কে জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ্ (স) সুদগ্রহীতা, সুদদাতা, সুদের লেখক (চুক্তি সম্পাদনকারী) ও সুদের সাক্ষী—সবার ওপর অভিশাপ প্রদান করেছেন এবং বলেছেন, তারা সবাই সমান অপরাধী। (সহিহ মুসলিম-পঞ্চম খণ্ড, হাদিস নম্বর ৩৯৪৭)

ব্যবসার ক্ষেত্রে ন্যায়সংগত চুক্তিবদ্ধ হওয়া জরুরি। ইসলামি কারবারে কোনো ধরনের প্রতারণা, ওজনে কম দেওয়া, আত্মসাত্, মিথ্যা তথ্য পরিবেশন, ক্ষতি ও পাপাচার থাকতে পারে না। অর্থাত্, ব্যবসা-বাণিজ্যে এমন কোনো লেনদেন করা যাবে না, যার মাধ্যমে বিন্দুমাত্র ভেজাল বা ধোঁকা রয়েছে। রাসুল (স) বলেন, ‘যে ধোঁকা দেয় ও প্রতারণা করে, সে আমার দলভুক্ত নয়।’ ব্যবসার ক্ষেত্রে আমানতদারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমানতের খিয়ানতকারী হচ্ছে মুনাফিক আর মুনাফিকেরা জাহান্নামের তলদেশে অবস্থান করবে। মহানবি (স) প্রথম জীবনে আবু তালেবের সঙ্গে ব্যবসা করতেন। তিনি ছিলেন মক্কার শ্রেষ্ঠ ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী, যার কারণে মক্কার শ্রেষ্ঠ ধনী রমণী খাদিজাতুল কোবরা (রা) ইয়াতিম নবি মুহাম্মদ (স)কে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করে তার সমস্ত সম্পত্তি রাসুলের পদতলে প্রদান করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন বিশ্ব ইতিহাসে। ব্যবসা-বাণিজ্য হচ্ছে শ্রেষ্ঠ উপার্জন। রাসুল (স) বলেন, উত্তম উপার্জন হচ্ছে বায়ায়ে মাবরুর—কল্যাণকর বেচাকেনা এবং হস্তশিল্পের জীবনোপকরণের সংস্থান করা। আর মাবরুর বেচাকেনা হলো, যাতে ক্রেতা-বিক্রেতার পারস্পরিক সহযোগিতা ও কল্যাণ নিহিত থাকবে।

—লেখক :ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট

সূত্র : ইত্তেফাক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত