প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কো-এডুকেশন অ্যান্ড অ্যাডজাস্টমেন্ট

আকতার বানু আলপনা : আমরা প্রায় সবাই মনে করি যে, ছোটবেলা থেকে আমাদের ছেলেদের ক্লাসে, খেলার মাঠে, পাড়ায় অন্য মানুষের মেয়ে বাচ্চাদের কাছ থেকে (বা মেয়েবাচ্চাদের অন্য মানুষদের ছেলে বাচ্চাদের কাছ থেকে) আলাদা রাখলেই তাদের মধ্যে দূরত্ব থাকবে। ফলে তাদের মধ্যে প্রেম-ভালোবাসা, শারীরিক সম্পর্ক বা ধর্ষণ হওয়ার সুযোগ ও সম্ভাবনা কমে যাবে। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা হলো ছোটবেলা থেকেই ছেলে এবং মেয়েদের ভাইবোন বা সহপাঠীর মতো ক্লাসে একসঙ্গে পাশাপাশি বসতে, পড়তে, খেলতে, খেতে, বেড়াতে, মিশতে দিলেই বরং তাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়। একে অন্যের প্রতি আন্তরিকতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও মানবিকতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠে। ফলে তারা একে অন্যের মন-মানসিকতা, অভ্যাস, প্রয়োজন, স্বভাব ইত্যাদি ভালোভাবে বুঝতে পারে। ছেলেদের প্রতি মেয়েদের বা মেয়েদের প্রতি ছেলেদের আলাদা কোনো অনুভূতি তৈরি হয় না।

ছেলেরা মেয়েদের তাদের নিজেদের মতোই একজন ‘মানুষ’ হিসেবে ভাবতে শেখে। ‘মেয়েমানুষ’ বা শুধু ভোগ্যপণ্য হিসেবে ভাবতে শেখে না। ফলে যেকোনো মেয়ে দেখলেই তাদের প্রতি ছেলেদের অহেতুক তীব্র যৌন আকর্ষণ তৈরি হয় না।
বাংলাদেশে সম্প্রতি ধর্ষণের হার আশঙ্কাজনকহারে বেড়েছে। এর মূল কারণ আমাদের দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি। এর আরেকটি অন্যতম কারণ হলো আমাদের স্কুল-কলেজগুলোতে কো-এডুকেশন না থাকা। যেসব স্কুল-কলেজগুলোতে কো-এডুকেশন আছে, সেখানেও ছেলেমেয়েরা আলাদা হয়েই বসে। ছেলেরা একদিকে, মেয়েরা আরেকদিকে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ শিক্ষকও মনে করেন যে, ক্লাসে ছেলেমেয়েদের আলাদা বসাই উচিত। তার মানে নামে কো-এডুকেশন বললেও আসলে বাংলাদেশের প্রায় কোথাও প্রকৃত কো-এডুকেশন নেই। ছেলেমেয়েদের আলাদা রাখার আরও একটি ভয়াবহ দিক আছে, যেটি সম্পর্কে আমরা সবাই একেবারেই উদাসীন। সেটি হলো ছেলেমেয়েরা আলাদা আলাদা বড় হলে পরবর্তী সময়ে সংসার জীবনে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে তাদের একে-অন্যকে বোঝা এবং অ্যাডজাস্টমেন্টের ক্ষেত্রে বিরাট সমস্যা হয়।

কারণ মেলামেশার সুযোগ না থাকায় ছেলেরা মেয়েদের হীন ভাবে। তাদের অধীনস্ত ভাবে। মেয়েদের মন-মানসিকতা বুঝতে পারে না। ফলে মেয়েদের প্রতি ছেলেরা নানা সহিংস আচরণ করতে দ্বিধা করে না। ফলে পারিবারিক কলহ হয়, সন্তানদের সঠিক মানসিক বিকাশ বিঘিœত হয়, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক খারাপ হয়, অনেকে পরকীয়া করে এবং এ সবের কারণে আমাদের দেশে ইদানীং ডিভোর্সের হার বাড়ছে। আমরা আমাদের বাচ্চাদের শুধু লেখাপড়াই শেখাই। কিন্তু পরিবারের সদস্যদের বাইরে কীভাবে অন্য মানুষদের সঙ্গে মিলেমিশে বা অ্যাডজাস্ট করে চলতে হয়, অন্যের জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, তা শেখাই না। সহপাঠী, বন্ধু-বান্ধবী বা অন্য মানুষদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা করে চলতে পারাও একটি বিশেষ এবং জরুরি যোগ্যতা। সহপাঠী, বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা করে চলতে পারার অর্থ হলো অন্য যে কারও সঙ্গে অ্যাডজাস্টমেন্ট করতে শেখা বা অ্যাডজাস্টমেন্ট করতে পারার যোগ্যতা অর্জন করা। যারা সহপাঠী, বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা করে চলতে পারার সুযোগ পায়নি বা যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি, তারা যতোই লেখাপড়া জানুক, তারা সংসার জীবনে অ্যাডজাস্টমেন্ট করতে পারবে না। কারণ আপনি যা শেখেননি, তা আপনি পারবেন কীভাবে? কেন পারবেন?
তাই আপনার বাচ্চাকে পড়াশোনার পাশাপাশি অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে (ছেলেবাচ্চা এবং মেয়েবাচ্চা উভয়ের সঙ্গে) মিশতে শেখান। তাদের আপনার বাসায় আসার সুযোগ দিন। অর্থাৎ বাসায় আপনাদের বাচ্চাদের ছেলে বন্ধু এবং মেয়ে বন্ধুÑ উভয়কেই আসতে দিন। এতে ছেলেমেয়েদের মধ্যে গোপনে, লুকিয়ে বা জোর করে কোনো সম্পর্ক তৈরি করা, ধর্ষণ করা, ড্রাগ নেওয়াÑ এসব নেতিবাচক আচরণ করার সম্ভাবনা থাকবে না।

স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়াকালীন সময়ে আমার ছেলে এবং মেয়ে সহপাঠীরা নিয়মিত (কখনো দলবেঁধে, কখনো একা) আমার বাসায় এসেছে। আমার আব্বা-আম্মা কখনো আপত্তি করেননি। ফলে আমি খুব সহজে যে কারও সঙ্গে মিশতে এবং অ্যাডজাস্ট করতে শিখেছি। আমি আত্মকেন্দ্রিক হইনি। বাচ্চারা একা একা বড় হলে আত্মকেন্দ্রিক হয়, যেটি সবার জন্য খারাপ। কারণ আত্মকেন্দ্রিক মানুষ নিজের এবং তার আশপাশের মানুষদের জন্য অসুবিধাজনক। কখনো কখনো ক্ষতিকরও বটে। কারণ তারা নিজের ছাড়া অন্যের সুবিধা-অসুবিধা, ভালোমন্দ নিয়ে ভাবে না।

অন্যদিকে যারা সহজে সবার সঙ্গে মিশতে পারে, তারা যেকোনো মানুষ, পরিবেশ-পরিস্থিতির সঙ্গে সহজেই অ্যাডজাস্ট করতে পারে। তারা আত্মকেন্দ্রিক হয় না। সুতরাং আপনার বাচ্চাদের বন্ধু, আত্মীয়, প্রতিবেশী ইত্যাদি সবার সঙ্গে মিশতে দিন। তাহলে বড় হয়ে সে মেয়েদের অপমান, ইভটিজিং, নির্যাতন বা ধর্ষণ করবে না। সবার সঙ্গে মিলেমিশে চলবে। কারও ক্ষতি করবে না। নিজের এবং অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হবে। আর মিশতে দিলে ছেলেমেয়েরা প্রেম-ভালোবাসায় জড়াবে, এমন কথা যদি বলেন, তাহলে বলতে হবে তারা প্রেম-ভালোবাসায় জড়াবেই। এটি বয়সের বা জীবনের ধর্ম। তা আপনি বাচ্চাকে মিশতে দিন বা না দিন। এখন যেসব ছেলেমেয়েরা সহপাঠীদের সঙ্গে মেশে না, ক্লাসে আলাদা হয়ে বসে, তারা কী প্রেম-ভালোবাসায় জড়ায় না? ফেসবুক থেকে

সর্বাধিক পঠিত