প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সাইবার অপরাধীদের দৌরাত্ম্য : প্রতিনিয়তই হ্যাকড হচ্ছে ফেসবুক, ই-মেইল ও বিকাশ

ডেস্ক রিপোর্ট  : কাজী ওবাইদুল ইসলাম মুন্না। তিনি একজন গণমাধ্যমকর্মী। সম্প্রতি তার ফেসবুক ম্যাসেঞ্জার থেকে কয়েকজন পরিচিতজন ও ঘনিষ্ঠজনের কাছে বিভিন্ন সমস্যার কথা জানিয়ে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা সহায়তা চাওয়া হয়। এর মধ্যে সোমবার রাত ৮টা ৪২ মিনিটে পরিচিত একজনকে টাকা পাঠানোর জন্য মুন্নার আইডি থেকে ০১৯৫৮৪৯৮১২৫ বিকাশ পারসোনাল নম্বরটি দেওয়া হয়। কিন্তু অধিকাংশই ওই টাকা চাওয়ার বিষয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়েন। কেউ কেউ মুন্নাকে তার ব্যক্তিগত নম্বরে ফোনও করেন। আর তখনই জানা যায় যে, তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি হ্যাকড হয়েছে। তিনি কারও কাছেই টাকা চাওয়া বা কোনো কিছুই লেখেননি।

কেবল মুন্না নয়, এ রকম আরও অনেকেই সাইবার অপরাধী তথা হ্যাকারদের কবলে পড়েছেন। প্রতিনিয়ই এই সাইবার অপরাধীদের অপতৎপরতা ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। কোনোভাবেই যেন ঠেকানো যাচ্ছে না সাইবার অপরাধীদের তৎপরতা। তারা যেন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে। ভুয়া রেজিস্ট্রেশনের ফোন নম্বর ও বিশেষ কোড আবিষ্কার করাসহ নানা প্রযুক্তির মাধ্যমে একের পর এক ফেসবুক, মেইল এমনকি বিকাশ অ্যাকাউন্টও হ্যাকড করছে সাইবার অপরাধীরা। বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সিম নিবন্ধনের পরও এই মাধ্যমে হুমকি দিচ্ছে অপরাধীরা। এসব গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যক্তিগত মাধ্যমগুলো নিজ আয়ত্বে নিয়ে নানা ধরনের প্রতারণা ও জিম্মিসহ নানা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে এসব চক্রগুলো। এ ক্ষেত্রে সাইবার অপরাধীদের বেশি টার্গেটে পড়ছেন একশ্রেণির সুন্দরী নারী ও সমাজের অবস্থান সম্পন্ন ব্যক্তিরা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব সাইবার অপরাধীদের শনাক্ত করাও যাচ্ছে না।

পুলিশ বলছে, বিভিন্ন পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ও পুলিশের কঠোর অবস্থানের কারণে সাইবার অপরাধ আগের চেয়ে কমেছে। এ বিষয়ে যত সচেতনতা বাড়বে ততই সাইবার অপরাধ কমে আসবে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, সাইবার ঝুঁকি মোকাবেলায় সচেতনতার বিকল্প নেই। এখানে প্রত্যেক ব্যবহারকারী নিজেই নিজের রক্ষক। অর্থাৎ নিজে সচেতন না হলে সাইবার ঝুঁকি থেকে মুক্তি মিলবে না। এ জন্য নিজের অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বৃদ্ধিসহ এ বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে।

জানা গেছে, ১৮ জানুয়ারি বিকালে সাংবাদিক আবু আলীর ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি হ্যাকড হয়। এ ঘটনায় তিনি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় একটি জিডি করেছেন। জিডি নম্বর ৮০০। ওই ডিজিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, তার আইডি থেকে কে বা কারা ০১৯৫৮৪৯৮১২৫ বিকাশ পারসোনাল নম্বর বলে পরিচিত-স্বজনদের কাছ থেকে টাকা চাওয়া হচ্ছে। এই নম্বরটি মুন্নার আইডি থেকেও প্রকাশ করা হয়েছে। মঙ্গলবার পর্যন্ত আবু আলী তার ফেসবুক আইডির নিয়ন্ত্রণ পাননি বলে এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন।

শুধু ফেসবুক নয়, বিকাশের মতো আর্থিক লেনদেন মাধ্যমেও হানা দিয়েছে সাইবার প্রতারক-সন্ত্রাসীরা। ৬ জানুয়ারি রাত ১১টায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ইব্রাহিম খলিল তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে একটি পোস্ট দেন। এতে তিনি লেখেন, ‘সাবধান : বিকাশ হ্যাকার থেকে এবার রক্ষা পেলাম। কোনো ক্ষতি হয়নি। নাম্বারগুলো হ্যাকারদের ০১৩০৮-৬৮৭৩৮৮, ০১৮৭৭-৫১৯৩৯৩, ০১৮৯২-১৫৯৪০৩, +০০১৬২৪৭, +১৬২৪৭।

সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের ২০১৯ সালের গবেষণার তথ্য মতে দেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন হলেও এই আইনে আশ্রয় নেওয়ার প্রবণতা আশানুরূপ নয়। হয়রানির শিকার হয়েও আক্রান্তদের ৮০ দশমিক ৬ শতাংশ আইনের আশ্রয় নেন না। আর যারা নেন তাদের মধ্যে মাত্র ১৯ দশমিক ২ শতাংশ আইনি সহায়তা চেয়ে ‘আশানুরূপ ফল’ পেয়েছেন বলে জানান। তবে আশার কথা হলো ২০১৮ সালের প্রতিবেদনে এই হার ছিল ৭ শতাংশ। অন্যদিকে সাইবার অপরাধের প্রতিকার বিষয়ক আইন সম্পর্কে জানেন না ৬৩ শতাংশ ভুক্তভোগী।

সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের সভাপতি কাজী মোস্তাফিজ বলেন, সাইবার সচেতনতাই সাইবার সুরক্ষার অনন্য হাতিয়ার। এটি নিশ্চিত করা আমাদের সবার একটি সম্মিলিত দায়িত্ব। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব ছাড়া এই কাজ দুরূহ। তাই নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য যেমন ইন্টারন্যাশনাল গেটওয়েতে নজরদারি বসাতে হয়, তেমনি ঘরে ব্যবহৃত রাউটারের মাধ্যমেও আগামী প্রজন্ম সাইবার দুনিয়ার কোথায় পরিভ্রমণ করছে, কী করছে সে বিষয়ে অভিভাবক পর্যায়েও সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। যেহেতু তরুণরাই দেশে প্রযুক্তি ব্যবহারে এগিয়ে সে জন্য তাদের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তোলার প্রতি বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

তিনি বলেন, সাইবার ঝুঁকি মোকাবেলায় সচেতনতার বিকল্প নেই। ব্যক্তিজীবনে আমরা কোনো সমস্যার মুখোমুখি হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা পেতে পারি। কিন্তু সাইবার জগতে সেটির সুযোগ নেই। এখানে প্রত্যেক ব্যবহারকারী নিজেই নিজের রক্ষক। অর্থাৎ নিজে সচেতন না হলে সাইবার ঝুঁকি থেকে মুক্তি মিলবে না। তাই সাইবার সুরক্ষায় সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গবেষণা পর্যালোচনা করে জানা যায়, বর্তমানে ভার্চুয়াল জগতে বাংলাদেশের প্রযুক্তি ব্যবহারকারীদের মধ্যে ১১ ধাপে অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। এর মধ্যে চারটিই নতুন ধারার অপরাধ। তবে ভুক্তভোগীদের ৮০ দশমিক ৬ শতাংশই আক্রান্ত হওয়ার পরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করেন না।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সিটিটিসির ‘সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগের’ অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) নাজমুল ইসলাম  বলেন, সাইবার অপরাধ আগের চেয়ে কমেছে বলেই মনে হচ্ছে। এ বিষয়ে যত সচেতনতা বাড়বে ততই সাইবার অপরাধ কমে আসবে। এডিসি নাজমুল ইসলাম বলেন, ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের (্ইউজার) অজ্ঞতা, উদাসীনতা ও ফেসবুকসহ সংশ্লিষ্ট মাধ্যমগুলোর প্রযুক্তিগত দুর্বলতার কারণে সাইবার অপরাধীরা সুযোগ নিতে পারছে। এ বিষয়গুলোর দিকে সবাইকে নজর দিতে হবে।

সূত্র- সময়ের আলো

সর্বাধিক পঠিত