প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শুদ্ধি অভিযান ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় পরিস্থিতি

বদরুদ্দীন উমর : আওয়ামী লীগ সরকারের শুদ্ধি অভিযান এবং ছাত্রলীগের সন্ত্রাস সমান্তরালভাবে চলছে। শুদ্ধি অভিযান শুরু হওয়ার পর, তাদের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে সংগঠন থেকে বের করে দেয়ার পরও এই সন্ত্রাস বন্ধ হয়নি, অব্যাহত আছে।

এটাই স্বাভাবিক, কারণ দীর্ঘদিন থেকে এখন পর্যন্ত ছাত্রলীগ, যুবলীগ, কৃষক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ইত্যাদি অঙ্গসংগঠন জনগণের বিভিন্ন অংশের ওপর শক্তি প্রয়োগের জন্য আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অস্ত্র।

বেশ কিছুদিন থেকেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ও শিক্ষকরা উপাচার্য ফারজানা ইসলামের দুর্নীতির অভিযোগের বিরুদ্ধে নানাভাবে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ করে আসছেন। ৫ নভেম্বর ছাত্ররা উপাচার্যের বাসভবন ঘেরাও করে রাখে এবং উপাচার্য পদত্যাগ না করা পর্যন্ত ঘেরাও বজায় রাখার কথা ঘোষণা করে।

এ অবস্থায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাদের ওপর হামলা করে। এ সময় সেখানে পুলিশ বাহিনী উপস্থিত থাকলেও তারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এসব দেখে। ১৫০ জনের মতো ছাত্রলীগ নেতাকর্মী হামলায় অংশগ্রহণ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতির নেতৃত্বে। এর ফলে ৯ জন শিক্ষক ও ৪ জন সাংবাদিকসহ ৩৫ জনের মতো আহত হন।

এর মধ্যে ছিলেন ২ জন অধ্যাপিকা এবং ৪ জন ছাত্রী। আহতদের মধ্যে ১২ জনকে সাভার হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়। ওই দিন বিকেলের দিকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে অনির্দিষ্টকালের জন্য। তারা ক্যাম্পাসে মিছিল ও সমাবেশ নিষিদ্ধ করে। ছাত্রছাত্রীদেরকে সন্ধ্যার আগেই হল ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়।

কিন্তু ছাত্রদের অধিকাংশই ক্যাম্পাস ত্যাগ না করে আশপাশের লোকজনদের বাড়িতে এবং অন্যত্র থেকে যায়। ছাত্রদের ওপর এসব নিষেধাজ্ঞা জারির প্রতিবাদে চারজন শিক্ষক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি থেকে পদত্যাগ করেন, যাদের মধ্যে আছেন শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক (ডেইলি স্টার, ০৮.১১.২০১৯)।

ছাত্রলীগের এই হামলায় আন্দোলনকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ার পর উপাচার্য তার বাসভবন থেকে বের হয়ে অফিসে যান। এ সময় উপাচার্য আন্দোলনকারীদেরকে তাড়িয়ে দেয়ার জন্য ছাত্রলীগকে ধন্যবাদ জানান! তিনি বলেন, ‘আমি ছাত্রদের প্রতি, বিশেষত ছাত্রলীগের সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞ।’

আন্দোলনকারী ছাত্রদেরকে তিনি ছাত্রশিবিরের সদস্য বলে অভিহিত করেন!! এটা যে এক ইচ্ছাকৃত মিথ্যা এতে আর কী সন্দেহ থাকতে পারে? কিন্তু এভাবে ছাত্রদেরকে আখ্যায়িত করে উপাচার্য যে নিজেকেই বিড়ম্বিত ও খেলো করেছেন এতেও কোনো সন্দেহ নেই।

ওই দিন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা এবং ছাত্রদের হল ত্যাগের নির্দেশ দেয়ার পর বহুসংখ্যক ছাত্র সন্ধ্যার পর আবার উপাচার্যের বাসভবন ঘেরাও করে এবং অনেক রাত পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করে। তারা উপাচার্যের পদত্যাগের দাবি জানিয়ে স্লোগান দিতে থাকে।

পরে তারা স্থান ত্যাগ করে কিন্তু সেখানে ঘোষণা করে যে, পরদিন সকালে তারা আবার ফেরত আসবে। উপাচার্যের মতো ছাত্রলীগের নেতারাও আন্দোলনকারীদের শিবির সদস্য বলে উল্লেখ করে।

আন্দোলনকারীরা এর জবাবে বলে, প্রতিবাদকারীদেরকে সবসময়েই শিবির কর্মী হিসেবে আখ্যায়িত করা হল একটি পুরনো কৌশল। দর্শনের অধ্যাপক রায়হান রাইন প্রতিবাদ মঞ্চের একজন মুখপাত্র হিসেবে বলেন, আন্দোলনকারীরা হল বামপন্থী ছাত্রসংগঠনসমূহের সদস্য।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস উন্নয়ন প্রকল্পের ১৪৪৫ কোটি টাকা থেকে উপাচার্যের তহবিল তসরুফের অভিযোগ এনে, এজন্য বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবিতে বিগত আগস্ট মাসে ছাত্ররা আন্দোলন শুরু করে।

শুধু তাই নয়, তারা আরও অভিযোগ করে যে, তারা দুর্নীতি ক্ষেত্রে যাতে কোনো বাধা সৃষ্টি না হয় এজন্য তিনি জাহাঙ্গীরনগর ছাত্রলীগ নেতাদেরকে ‘ঈদ সেলামি’র নাম করে এক কোটি টাকা প্রদান করেন (ডেইলি স্টার, ০৬.১১.২০১৯)। এখানে উল্লেখ্য, মাত্র কিছুদিন আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ থেকে তাদের ‘অংশ’ দাবি করার বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অপসারণ করেন।

বিস্ময়ের ব্যাপার যে, ৯ আগস্ট তারিখে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ শাখা প্রকাশ্যে স্বীকার করে, তারা উপাচার্যের বাসভবনে এক বৈঠকে উপাচার্যের কাছ থেকে ২৫ লাখ টাকা গ্রহণ করে (ডেইলি স্টার, ০৬.১১.২০১৯)।

এরপর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা যে উপাচার্যের অপসারণের জন্য আন্দোলন করবে, এটাই স্বাভাবিক। কাজেই ৬ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা এবং ছাত্রদের হল ছাড়ার নির্দেশ দেয়া সত্ত্বেও তারা আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে। ৬ তারিখে বিকেল থেকে ছাত্ররা হটে না গিয়ে বিক্ষোভ মিছিলসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছে।

এই বিক্ষোভে সাধারণ ছাত্রছাত্রীরাও সমর্থন দিয়েছে। কর্তৃপক্ষ তাদেরকে হল ছাড়ার নির্দেশ দিলেও এবং নির্দেশ না মানলে শাস্তির ব্যবস্থা হবে এই হুমকি সত্ত্বেও ছাত্রছাত্রীরা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে এবং তারা আন্দোলন এরপর চালিয়ে যাচ্ছে। তারা বলেছে, উপাচার্য পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবে।

ছাত্রদের এই ঘোষণার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ক্যাম্পাসের বাইরে অবস্থানরত ছাত্রদের ক্যাম্পাসে এসে সভা-সমাবেশ, মিছিলে অংশগ্রহণ এবং অফিস বা আবাসিক এলাকায় অবস্থান নিষিদ্ধ করেছে।

ছাত্রদের অভিযোগ ও বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষা উপমন্ত্রী বলেছেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। আন্দোলনকারীদেরকে উপাচার্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণসহ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রীও শিক্ষক ও ছাত্রদের উদ্দেশ করে বলেছেন, উপাচার্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাদেরকে প্রমাণ করতে হবে। অন্যথায় তাদের জন্য উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা হবে। শিক্ষামন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী একথা বলার পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৬ জন শিক্ষক উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি করেছেন এবং তার দুর্নীতির বিরুদ্ধে তারা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ৮ তারিখে ৬ পৃষ্ঠার লিখিত অভিযোগ এবং প্রায় ৭০ পৃষ্ঠার লিখিত তথ্য-প্রমাণ দাখিল করেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৬ জন শিক্ষক এক প্রেস বিবৃতি দিয়ে অবিলম্বে উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি করেছেন। দুর্নীতির অভিযোগ সম্পর্কে উপাচার্যের একটি তদন্ত কমিটির মাধ্যমে এ বিষয়ে তদন্তেরও দাবি জানিয়েছেন।

৯ নভেম্বর আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন জাতীয় শ্রমিক লীগের কাউন্সিলের বক্তৃতার সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যদি তাদের উত্তেজনাপূর্ণ কাজ বন্ধ না করেন, তাহলে সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থ দেয়া বন্ধ করবে। সরকার কেন অর্থ দেবে? তারা স্বায়ত্তশাসিত (autonomous)।

এখন তোমাদেরকে ভাবতে হবে তোমরা কী করবে। ছাত্রদেরকে বিপথে চালনা করা এবং কুৎসিত শব্দ ব্যবহার কেউই মেনে নেবে না। এটা যদি করা হয় তাহলে নিজেদের অর্থসংস্থান নিজেদেরকেই করতে হবে, নিজেদের বেতনের ব্যবস্থা করতে হবে, সেই সঙ্গে শিক্ষার ব্যয়ও বহন করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যান্টস কমিশনের মাধ্যমে সরকার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অর্থ প্রদান করে, যাতে ছাত্ররা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। ছাত্ররা অল্প খরচে শিক্ষা লাভ করছে, কিন্তু এর ব্যয়ভার কে বহন করছে? এটা করছে সরকার। সরকার শিক্ষকদের বেতন ও ভাতা দেয়।

ছাত্রদের টিউশন ফি দেয়। সব রকম উন্নয়নের জন্য সরকার ঋণ দেয়। এরপর সরকার তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারবে না, এটা গ্রহণযোগ্য নয় (ডেইলি স্টার, ১০.১১.২০১৯)।

তাহলে অবস্থা দাঁড়াল কী রকম? সরকার যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়কে অর্থ দেয়, সেই অর্থ থেকে শিক্ষকরা বেতন পান এবং ছাত্ররা লেখাপড়া করে। কাজেই সরকার মনোনীত উপাচার্য এবং অন্যরা যতই দুর্নীতি করুক এবং সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠন যতই দুর্নীতি ও সন্ত্রাস করুক, তার বিরুদ্ধে শিক্ষক ও ছাত্ররা কিছু করতে পারবে না!

কোনো প্রতিবাদ ও আন্দোলন করতে পারবে না!! এটা কী ধরনের কথা? বাংলাদেশ তো কোনো জমিদারি নয়। সরকার তো কোনো জামিদার নয়। উপরন্তু সরকারকে জনগণ ক্ষমতায় বসায় তাদের সেবা করার জন্য। এ অবস্থায় জনগণ সরকারের সবকিছু মান্য করে বিনীতভাবে বসে থাকবে কেন? জনগণ কি সরকারের প্রজা?

এই দৃষ্টিভঙ্গি যে সঠিক নয়, এটা বলাই বাহুল্য। সরকারকে তার সবরকম কাজের জন্য জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। সরকারকে দেখতে হবে যাতে তাদের দ্বারা জনগণের ওপর কোনো নির্যাতন না হয়, যাতে তাদের লোকরা সৎভাবে সরকারকে দেয়া অর্থের হেফাজত করেন।

এর বরখেলাপ হলে জনগণের অধিকার অবশ্যই আছে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করার। এক্ষেত্রে জনগণের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধকে জমিদারের বিরুদ্ধে প্রজা বিদ্রোহ হিসেবে দেখা ঠিক নয়।

বাংলাদেশে বেশ কিছুদিন থেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বড় আকারে দুর্নীতি হচ্ছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের দুর্নীতি এবং সেই সঙ্গে সন্ত্রাস-অবরোধ চলছে। এ মুহূর্তেও পাবনা, বরিশাল যা ঘটছে তার বিরুদ্ধে ছাত্ররা আন্দোলন করছে।

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা তার একক কর্তৃত্বে এখন দেশে তাদের অঙ্গসংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ইত্যাদির বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান করছেন।

কিন্তু এখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও ছাত্রলীগ যে দুর্নীতি ও সন্ত্রাস করছে, তাতে সরকারের চলমান শুদ্ধি অভিযানের সাফল্য যে কতদূর সম্ভব, এ বিষয়ে সন্দেহের যৌক্তিকতা কি অস্বীকার করা যায়?

১০.১১.২০১৯

বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

সর্বাধিক পঠিত