প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

যক্ষার জীবানু ফুসফুসে বংশবৃদ্ধি করলেও আক্রান্ত হওয়ার সম্ভবনা কম

শাহীন খন্দকার : “যক্ষ্মা” শব্দটা এসেছে “রাজক্ষয়” থেকে। ক্ষয় বলার কারণ এতে রোগীরা খুব শীর্ণ (রোগা) হয়ে পড়েন। যক্ষ্মা প্রায় যেকোনও অঙ্গে হতে পারে (ব্যতিক্রম কেবল হৃৎপিন্ড, অগ্ন্যাশয়, ঐচ্ছিক পেশী ও থাইরয়েডগ্রন্থি)। যক্ষ্মা সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ফুসফুসে। টিকা বা ভ্যাকসিনেশন-র মধ্যে দিয়ে যক্ষ্মা প্রতিরোধ করা যায়। তবে ফুসফুসে যক্ষ্মা হলে হাল্কা জ্বর ও কাশি হতে পারে। কাশির সঙ্গে গলার ভিতর থেকে থুতুতে রক্তও বেরোতে পারে। মুখ না ঢেকে কাশলে যক্ষ্মা সংক্রমণিত থুতুর ফোঁটা বাতাসে ছড়ায়।

আলো-বাতাসহীন অস্বাস্থ্যকর বদ্ধ পরিবেশে মাইকোব্যাক্টেরিয়াম অনেকক্ষণ বেঁচে থাকে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট হিসেবে ৫-৬ মাস জ্বর থাকার মূল কারণ এই টিবি। রাজধানীর শ্যামলী ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট যক্ষা হাসপাতালটির কার্যক্রম ২০১৭ সালে আনুষ্ঠানিক ভাবে শুরু হয়। যদিও ২৫০ শয্যার হলেও ১৫০ শয্যা বর্তমানে চালু রয়েছে বলে জানালেন প্রকল্প পরিচালক।

তিনি বলেন, যক্ষ্মা রোগের জীবাণু শরীরে প্রবেশ করলেও যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভবনা খুবই কম। অনেক সময় যক্ষ্মার জীবাণু ফুসফুসে বংশবৃদ্ধি করে। এর ফলে যক্ষ্মার সংক্রামক রোগ হতে পারে। তবে উপসর্গগুলো তেমন বোঝা যায় না। তবে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অপেক্ষাকৃত কম তাদের শরীরে যক্ষ্মার জীবাণু খুব দ্রুত ছড়িয়ে যেতে পারে। পরিচালক বলেন, শরীরের রাগ প্রতিরোধ ক্ষমতা রক্ষাকারী কোষগুলো পুরোপুরি ধ্বংস করে দিতে পারে। এভাবে যক্ষ্মা শনাক্তে ও চিকিৎসায় যক্ষ্মা শনাক্তকরণে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে শনাক্তের হার গতবারের চেয়ে কম।

বাংলাদেশে যক্ষ্মারোগীর সংখ্যা বর্তমানে ২ লাখ ২৩ হাজার ৯২২ জন। এরমধ্যে ওষুধ প্রতিরোধী (এমডিআর) যক্ষ্মারোগীর সংখ্যা ৯ হাজার ৭০০ জন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এ রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আরো বেশি। দেশের সব জায়গায় রোগ পরীক্ষার আধুনিক ব্যবস্থা না থাকায় অনেক রোগী জানেই না যে সে যক্ষ্মাক্রান্ত। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে শনাক্তহীন এ রোগীরা সবচেয়ে বড় বাধা বলে মনে করছেন পরিচালকের দায়িত্বে উপ-পরিচালক প্রকল্প পরিচালক ডা: মো: আবু রায়হান।
পরিচালক বলেন, দেশে যক্ষ্মারোগীর সংখ্যা বাড়ছে। ২০১৬ সালে ২ লাখ ২৩ হাজার ৯২২ জন, ২০১৫ সালে ২ লাখ ৬ হাজার ৯১৫ জন, ২০১৪ সালে ১ লাখ ৯৬ হাজার ৭৯৭ জন, ২০১৩ সালে ১ লাখ ৯০ হাজার ৮৯৩ জন, ২০১২ সালে ১ লাখ ৬৯ হাজার ৮০৭ জন এবং ২০১১ সালে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৫৫৭ জন যক্ষ্মারোগী শনাক্ত হয়।

২০১৫ সালে যেখানে শিশু যক্ষ্মারোগী ছিল ৭ হাজার ৯৮৪ জন, সেখানে ২০১৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ হাজার ২৯১ জন। মাঠ পর্যায়ের কর্মী ও এনটিপির কর্মকর্তাদের মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে। উপজেলা পর্যায়ে বিনামূল্যে এক্সরে চালু করা হলেই যক্ষ্মা শনাক্তের কাজ অনেকটাই এগিয়ে যেতে পাওে বলে তিনি মনে করেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ বৈশ্বিক টিবি প্রতিবেদন (২০১৬) এবং জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির (এনটিপি) সাম্প্রতিক জরিপের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে যক্ষ্মারোগী শনাক্তের পরিমাণ বাড়লেও এটি তেমন আশাব্যঞ্জক নয়। এ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ও সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি প্রতিবেশী দেশ ভারত। প্রকল্প পরিচালক বলেন, বিশ্বের মোট যক্ষ্মারোগীর ১৩ দশমিক ৭ শতাংশের বাস বাংলাদেশে। সার্বিকভাবে যক্ষ্মাক্রান্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি লাখে ৩৮২ জন যক্ষ্মাক্রান্ত। ফুসফুসে এ রোগের জীবাণুযুক্ত রোগীর সংখ্যা প্রতি লাখে ২৮৬ জন। এসডিজিতে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ যক্ষ্মা আক্রান্তের সংখ্যা প্রতি লাখে ১০ জনে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিচালক বললেন, যক্ষ্মা শনাক্তকরণ কার্যক্রম আরো গতিশীল ও বহুমুখীকরণ না হলে এ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়। পাশাপাশি ভারতের চেয়ে বাংলাদেশ যেন যক্ষারোগের সংক্রমণ হতে নিরাপদ থাকে সেই লক্ষ্যে কাজ কওে যাচ্ছে স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়সহ সংশ্লিষ্ট ডাক্তারগণ।

তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর লাখে যক্ষ্মার কারণে মৃত্যু হয় ৪৫ জনের। প্রতি বছর লাখে নতুন যক্ষ্মারোগী শনাক্ত হচ্ছে ২২৫ জন। বিপুলসংখ্যক যক্ষ্মারোগী চিকিৎসাসেবার বাইরে থাকায় তাদের সংস্পর্শে নতুন নতুন রোগী শনাক্ত করা যাচ্ছে না। দেশে যক্ষ্মা শনাক্তে উচ্চতর গবেষণা করছে ন্যাশনাল টিউবারকোলসিস রেফারেন্স ল্যাবরেটরি (এনটিআরএল)। এ গবেষণাগার সূত্র জানায়, ৫০ শতাংশ যক্ষ্মারোগীর কাশি হয় না। ফলে তারা পরীক্ষাও করান না। অন্য রোগের চিকিৎসা করানোর সময় এক্সরে বা মাইক্রোস্কোপিক নিরীক্ষণের সময় এদের যক্ষ্মা শনাক্ত হয়। ৫৬ শতাংশ জীবাণুযুক্ত রোগী অনুবীক্ষণ যন্ত্রে ধরা পড়ে। আবার অনেক সময় যক্ষ্মার জীবাণু এক্সরে বা অনুবীক্ষণ যন্ত্রেও ধরা পড়ে না। ফলে শনাক্ত না হলে অনেকেই ভুল চিকিৎসার শিকার হন।

যক্ষ্মার জীবাণু সঠিকভাবে শনাক্তে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য যন্ত্র ‘জিন এক্সপার্ট’। দেশের সব মিলিয়ে মাত্র ৩৯টি হাসপাতালে এ মেশিন থাকলেও বর্তমানে ১০টি মেশিন অকেজো রয়েছে। আবার অনেক জায়গায় এ মেশিন পরিচালনার জন্য দক্ষ ল্যাবকর্মী নেই। ফলে যক্ষ্মা শনাক্তকরণ কার্যক্রমে এক ধরনের ফাঁক রয়েই যায়। এছাড়া যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির কর্মকর্তা এবং মাঠ পর্যায়ে সেবাদাতাদের মধ্যেও দূরত্ব রয়েছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। ফলে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা, বাধাগ্রস্থ হচ্ছে যক্ষ্মা নির্মূলের লক্ষ্য অর্জনের পথ।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত