শিরোনাম
◈ বোমা নয়, মানুষকে অর্থায়ন করুন: ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদ ◈ নতুন শিক্ষাক্রমে বড় পরিবর্তনের উদ্যোগ: প্রযুক্তিনির্ভর ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষায় জোর, তিন ধাপে বাস্তবায়ন পরিকল্পনা ◈ বাবা ও ভাইয়ের প্রাণনাশের হুমকিতে মিথ্যা বলতে বাধ্য হয়েছি: প্রকাশ্যে এসে সত্য প্রকাশ করলেন সেই ইমামের মেয়ে ◈ ৪৭ বছরে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জাতীয় সম্পদের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আটকে রেখেছে ◈ অ‌নেক লড়াই ক‌রে চেলসিকে হারা‌লো ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড  ◈ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলবেন মেসি! আর্জেন্টিনার সঙ্গে আলোচনা পাকিস্তান ফুটবল কর্তাদের  ◈ একঝাঁক তারকা ছিটকে গেলেন বিশ্বকাপের আগেই! ◈ অবিশ্বাস অনাস্থায় সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে বাড়ছে দূরত্ব ◈ বিশ্বকাপের আসর শুরুর আগেই যুক্তরাষ্ট্রে ১২ গুণ বেড়ে গেলো যাতায়াত খরচ ◈ বিশ্বকাপের আগে নয়া বিতর্ক, এবার প্যালেস্টাইনের ফুটবল কর্তাকে ভিসা দেয়‌নি কানাডা

প্রকাশিত : ১২ জুলাই, ২০১৯, ১১:০৪ দুপুর
আপডেট : ১২ জুলাই, ২০১৯, ১১:০৪ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

মশা নিধনে কার্যকর ওষুধ পাচ্ছে না সিটি করপোরেশন

নিউজ ডেস্ক : মশা নিয়ন্ত্রণে এ যাবৎকালে নেওয়া কোনো উদ্যোগ সুফল বয়ে আনেনি। মশার উৎপাতে এমনিতেই মানুষ নাকাল। তার ওপর এডিস মশার বিস্তারে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় বিশেষ করে রাজধানীতে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। ফলে মশা নিধনে গৃহীত কর্মসূচির ব্যর্থতার বিষয়টি আবারও আলোচনায়। ব্যবহার করা কীটনাশক বা ওষুধ অকার্যকর ও মানহীন—খোদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমন তথ্যের পর নড়েচড়ে বসেছে সিটি করপোরেশন। কিন্তু তারা সেই অকার্যকর ওষুধেই কার্যক্রম চালানোর কথা বলছে। তারা বলছে, নতুন কার্যকর ওষুধের সন্ধান এখনো তারা পায়নি। ফলে নতুন সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত পুরনো ওষুধেই ভরসা রাখছে সিটি করপোরেশন। কালের কণ্ঠ

দীর্ঘদিন ধরেই ঘুরেফিরে একই চক্রের কাছ থেকে মশার ওষুধ সংগ্রহ করতে গিয়ে বারবারই বিপাকে পড়ছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। দেশের অন্য কয়েকটি সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায় একই ধরনের ওষুধ সরবরাহ করে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান। তারাও এখন তাকিয়ে আছে ঢাকায় কী সুরাহা হয় সেদিকে।

দুই সিটি করপোরেশন সূত্র থেকেই জানা যায়, অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশন থাকার সময় লিমিট নামের যে গ্রুপটি কমপক্ষে তিন দফা ভেজাল ও মানহীন ওষুধ সরবরাহ করে ধরা খাওয়ার পর তা ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিল, সেই একই গ্রুপের ওষুধ নিয়েছিল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও। সেখানেও দুইবার লিমিটের ওষুধ মানহীন প্রমাণ মেলায় তাদের কালো তালিকাভুক্ত করে উত্তর সিটি করপোরেশন। অন্যদিকে এর বিকল্প হিসেবে নোকন নামের একটি পাকিস্তানি মালিকানাধীন কম্পানির কাছ থেকে ওষুধ নেয় উত্তর সিটি করপোরেশন, কিন্তু সম্প্রতি পরীক্ষা করতে গিয়ে ওই কম্পানির ওষুধও মানহীন ও অকার্যকর বলে প্রমাণ মেলে। এর পর থেকেই ডেঙ্গু প্রতিরোধে ও এডিশ মশা নিয়ন্ত্রণে নতুন ওষুধের খোঁজে নামে সিটি করপোরেশন। এ জন্য জরুরি বৈঠকও করা হয়। বৈঠকে উপস্থিত টেকনিক্যাল বিশেষজ্ঞরা একদিকে অকার্যকর ওষুধ অন্যদিকে মানহীন ও ভেজাল ওষুধের পরিবর্তে জরুরি ভিত্তিতে নতুন ওষুধ সংগ্রহ করার পরামর্শ দেন, কিন্তু সেই সভায় কোনো নির্দিষ্ট ওষুধের নাম কেউ প্রস্তাব করেনি। ফলে সিটি করপোরেশন কোনো ওষুধ সংগ্রহের উদ্যোগ নিতে পারেনি। এমন পরিস্থিতির মুখে আগামী ১৫ জুলাই আরেক দফা টেকনিক্যাল কমিটির সভা ডাকা হয়েছে।

জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মোমিনুর রহমান মামুন  বলেন, ‘লিমিট নামের কম্পানিকে আমরা কালো তালিকাভুক্ত করেছি। তারা আমাদের এখানে আর কাজ করতে পারবে না। পাশাপাশি নোকনের কাছ থেকে নেওয়া তিনটি উপাদানের কম্বাইন্ড একটি ওষুধ এখন আমাদের হাতে আছে, যেটা পুরোপুরি অকার্যকর বা মানহীন বলা না গেলেও আংশিক ত্রুটিপূর্ণ বলতে হবে। কারণ তাদেরও ওই ওষুধের তিনটি উপাদানের মধ্যে একটি নিয়ে (পারমেথ্রিন) আপত্তি আছে, বাকি দুটি উপাদান টেট্রামেথ্রিন ও বায়োলেথ্রিন কার্যকর আছে। তবে আমাদের হাতে অন্য কোনো ওষুধ না থাকায় ওই ওষুধ ব্যবহার বন্ধও করতে পারছি না। আমরা নোকনের ওষুধ এখন স্প্রে করছি, এটা যা মজুদ আছে তাতে আরো মাসখানেক কাজ চলবে। পরে নতুন ওষুধ সংগ্রহ করব।’

এদিকে গতকাল আইসিডিডিআর,বির পক্ষ থেকে আরেকটি পরামর্শমূলক চিঠি পেয়েছে উত্তর সিটি করপোরেশন। ওই চিঠিতে আইসিডিডিআর,বি আপৎকালীন বিকল্প ওষুধ হিসেবে ডেল্টামেথ্রিন বা মেলানিয়ন উপাদানের ওষুধ ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

তবে এ বিষয়ে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মোমিনুর রহমান মামুন বলেন, ‘আপৎকালীন বা স্বল্প সময়ের জন্য ওষুধ কেনা আমাদের জন্য সমস্যা। এ ছাড়া রাজধানীর কোথাও কোথাও ওই কীটনাশকও রেজিস্ট্যান্ট তৈরি করতে পেরেছে। তাই আমরা নতুন ওষুধের জন্যই অপেক্ষা করতে চাই। তবু ১৫ জুলাইয়ের সভার সিদ্ধান্তের ওপরই সব কিছু নির্ভর করবে। এ ছাড়া তিনি অ্যাডাল্টিসাইডের (উড়ন্ত মশা নিধনে ব্যবহার করা হয়) চেয়ে লার্ভিসাইডের (লার্ভা অবস্থায় নিধনে ব্যবহার করা হয়) ওপরই বেশি নজর দিতে চান বলে জানান। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শরীফ আহম্মেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত কোনো সংস্থা অফিশিয়ালি জানায়নি যে মশার কীটনাশক অকার্যকর হয়ে পড়েছে। তবু আমরা মিডিয়ায় শুনে ও দেখে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তাদের বলেছি কোন ওষুধ ব্যবহার করব, সেটা আমাদের জানানোর জন্য। তারা যেটি বলবে আমরা সেটি নেব। তবে এর আগে পর্যন্ত আগে থেকে ব্যবহার হয়ে আসা কীটনাশক বাতিল বা ব্যবহার বন্ধ রাখার উপায় নেই।’

এদিকে মশার ওষুধ নিয়ে সিটি করপোরেশনের এমন অবস্থানই বলে দিচ্ছে মশার উৎপাত থেকে খুব শিগগির রেহাই মিলছে না নগরবাসীর। নগরবাসী চায় মশার উপদ্রব যেকোনো উপায়েই বন্ধ করতে হবে, ডেঙ্গু থেকে সুরক্ষা দিতে হবে মানুষকে। এমনকি সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণের মেয়রের কথায়ও বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে অনেকের মধ্যে। রাজধানীর মোহাম্মদপুর কাটাসুরের বাসিন্দা আতাউর রহমান বলেন, ‘১০ তলায় বাসা; মশা তাড়াতে মাসে বড় বড় তিন ক্যান স্প্রে শেষ করি, খরচ যায় এক হাজার টাকার ওপরে। তার ওপর মাঝেমধ্যে বাচ্চাদের জন্য বিশেষ ধরনের লোশনও ব্যবহার করি। তবু শান্তিতে একটু বসতে পারি না।’ বাসাবো এলাকার হরনাথ রায় নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘মাঝেমধ্যে সিটি করপোরেশন থেকে ওষুধ ছিটাতে দেখি, কিন্তু তাতেও তো মশা কমে না। বছরের পর বছর একই অবস্থা দেখছি। তাহলে মশার উপদ্রব থেকে রক্ষায় কী উপায় আছে? এত হৈচৈ, পরিকল্পনা, অভিযান ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে কেন?’

কীটতত্ত্ববিজ্ঞানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাহাবুবুর রহমান বলেন, ‘আমাদের দেশে সাধারণত ৪৩ থেকে ৪৫ প্রজাতির মশার অস্তিত্ব রয়েছে। আর এখানে তাপমাত্রা ২৭-৩২ ডিগ্রিতে পৌঁছলেই তা মশা-মাছি বা অন্যান্য পোকা-মাকড়ের জন্য প্রজননবান্ধব হয়ে ওঠে। এটা বর্ষা থাক বা অন্য কোনো ঝতু। তবে বর্ষা থাকলে মশার প্রজননের মাত্রা অনেক বেড়ে যায়। আর বর্ষার ধরন অস্বাভাবিক হলে তা ভয়াবহ আকার পায়, কিন্তু আমাদের সমস্যা হচ্ছে মশা নিয়ন্ত্রণে দক্ষতা ও পরিকল্পনার অভাব। শুধু ওষুধ ছিটালেই মশা নিয়ন্ত্রণ হবে না। কখন কোথায় কিভাবে এসব ওষুধ ঠিকমতো প্রয়োগ করতে হবে সেই ব্যাপারে যথেষ্ট দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল প্রয়োজন। মশার প্রজননক্ষেত্র এবং এর পরিবেশ-প্রতিবেশ বুঝে, সেই অনুযায়ী কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে। নয়তো ওষুধে ওষুধ যাবে, টাকার গচ্চা হবে, মশা না মরলেও ওই কীটনাশকের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মানুষের ক্ষতি বয়ে আনবে।’

বিশেষজ্ঞরা জানান, দেশে মশা নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিন ধরেই ঘরে ঘরে যে স্প্রে বা কয়েল ব্যবহার করা হয় সেগুলোতে সাধারণত পারমেথ্রিন, বায়ো-অ্যালোথ্রিন, ডি-ট্রান্স অ্যালোথ্রিন, টেট্রাথ্রিন, ডেল্টামেথ্রিন, বায়োলেথ্রিন, মেটোফ্লুথ্রিন, সাইপারমেথ্রিন, ইমিপোথ্রিন, ডায়াজনিনসহ আরো কিছু উপাদানই বেশি। এগুলো মূলত উড়ন্ত মশার ক্ষেত্রে কাজ করে, কিন্তু মশার প্রজনন রোধে কিংবা লার্ভা নিরোধে তো এর কোনো ভূমিকা নেই। অধ্যাপক ড. মাহাবুবুর রহমান বলেন, ‘মশা যে কোনো কোনো কীটনাশক প্রতিরোধী হয়ে উঠছে সেটা আগে থেকেই বলে আসছিলাম। ২০১৭ সাল থেকেই একটি সংস্থার গবেষণায়ও এটি উঠে এসেছে। কিন্তু সেটা সংশ্লিষ্টরা আমলে নেয়নি। এ ছাড়া এলোমেলোভাবে কিংবা যেখানে-সেখানে এডাল্টিসাইড বা লার্ভিসাইড প্রয়োগ করলেই হবে না। তাই পরিকল্পনার সময় অবশ্যই এ কাজে কর্মী বা স্বেচ্ছাসেবক যারাই কাজ করবে তাদের প্রশিক্ষণের দিকটিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এ ছাড়া সিটি করপোরেশনে আরো কীটতত্ত্ববিদ নিয়োগেরও প্রয়োজনও আছে। বাসাবাড়িতে স্প্রের ক্ষেত্রে মানুষের আরো সচেতন হওয়া জরুরি।’

অন্যদিকে দেশে কীটনাশকের অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্লান্ট প্রটেকশন ইউংয়ের অতিরিক্ত পরিচালক (মাননিয়ন্ত্রণ) মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি এই দায়িত্বে নতুন এসেছি। আমি আসার পরে দুই সিটির কোনোটির কোনো ওষুধের পরীক্ষা হয়নি। মশার ওষুধের রেজিস্ট্যান্ট হয়েছে কী, না হলে কী করণীয়, সে ব্যাপারে আগামী রবিবার আমরা একটি বৈঠক করব। প্রয়োজনে ওষুধের স্যাম্পল এনে পরীক্ষা করব। তারপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়