প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘কওমি শিক্ষাব্যবস্থাকে পরিকল্পিতভাবে অকেজো করতে চায় জামায়াত-শিবির’

আমিন মুনশি : ধর্মীয় ও আদর্শগত কারণে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও আলেমরা জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির বিরোধিতা করে আসছেন শুরু থেকেই। এমতাবস্থায় কওমি মাদ্রাসার নিয়মিত ছাত্র না হয়েও দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ‘মাওলানা’ ডিগ্রি পেয়েছেন শিবিরের সভাপতি ড. মোবারক হোসাইন। অথচ কওমি মাদ্রাসায় শিবিরের রাজনীতি একেবারেই নিষিদ্ধ বলে দাবি করা হয়। গত ৩ জুলাই দাওরায়ে হাদিসের (মাস্টার্স) ফলাফল প্রকাশের পর এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। দাবি উঠেছে, দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষায় অংশ নিতে শুধু মেশকাত জামাতের সনদই বাধ্যতামূলক নয়, বরং সব স্তরের সনদ ও কওমি মাদ্রাসার নিয়মমাফিক ছাত্র হতেই হবে।

জানা গেছে, শিবির সভাপতি ড. মোবারক হোসাইন আল জামিয়াতুল উসমানিয়া দারুল উলুম টঙ্গি (সাতাইশ) মাদ্রাসা থেকে পরীক্ষায় অংশ নেন। তার পরীক্ষার কেন্দ্র ছিলো টঙ্গীর চেরাগ আলীতে অবস্থিত দারুল উলুম মাদ্রাসা, রোল নম্বর ৬৯৪৫। তিনি দাওরায়ে হাদিস (তাকমিল)-এ ৬৯৬ নম্বর পেয়ে জায়্যিদ জিদ্দান (প্রথম বিভাগ) বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছেন। ‘আল হাইআতুল উলইয়া লিল-জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’-এর অধীনে অনুষ্ঠিত ১৪৪০ হিজরি শিক্ষাবর্ষের দাওরায়ে হাদিস (তাকমিল) পরীক্ষায় তিনি এ ফলাফল অর্জন করেন।

দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষায় অংশ নিয়ে প্রথম বিভাগ পাওয়ার খবর শিবির সভাপতি তার ফেসবুক পেজে পোস্ট করেন। তবে তিনি কোন মাদ্রাসা থেকে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন, সেটি উল্লেখ করেননি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এর পক্ষে-বিপক্ষে তুমুল বিতর্ক দেখা দিলে অনেকেই এটাকে কওমি মাদ্রাসার দেউলিয়াত্ব, অনৈতিকতা ও আদর্শচ্যুতি বলে মন্তব্য করেন। কওমি মাদ্রাসার সম্মিলিত শিক্ষাবোর্ড আল হাইআতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশের অধীনে দাওরায়ে হাদিসের সনদকে রাষ্ট্রীয়ভাবে মাস্টার্সের স্বীকৃতি দেওয়ার পর আলিয়া মাদ্রাসার প্রচুর ছাত্র গোপনে কওমি মাদ্রাসা থেকে পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। এরই ধারাবাহিকতায় শিবির সভাপতির বিষয়টি সামনে চলে আসে ব্যাপকভাবে।

কওমি মাদ্রাসার শিক্ষাবোর্ড ‘বেফাকুল মাদারিসিদ্দীনিয়া বাংলাদেশ’-এর চেয়ারম্যান ও ‘আল হাইআতুল উলইয়া লিল-জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’-এর সদস্য আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ বলেন, তিনি (শিবির সভাপতি ড. মোবারক হোসাইন) যদি কওমি মাদ্রাসায় পড়াশোনা না করে নিয়মিত পরীক্ষায় অংশ নিয়ে থাকেন, তাহলে এটা হাইয়াতুল উলয়া’র পরীক্ষার ক্ষেত্রে চরম অব্যবস্থাপনা। এটা কোনোভাবেই বৈধ হতে পারে না। এ ব্যাপারে আমি হাইয়াতুল উলয়াকে আহবান জানাবো। এটা আমাদের পরীক্ষা নীতির চরম লঙ্ঘন, মাদ্রাসা ব্যবস্থাপনারও চরম লঙ্ঘন। আর যদি তিনি নিয়মিত গিয়ে থাকেন তাহলে আমি বলবো, বর্তমানে আমার পর্যবেক্ষণ হলো- জামায়াত রাজনৈতিকভাবে মার খেলেও মৌলিকভাবে, সাংগঠনিকভাবে কিন্তু তারা মার খায়নি। তারা এখন আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেছে। এমনকি আন্ডারগ্রাউন্ডে তারা কৌশল করে অনেক জায়গায় বিভিন্ন পরিচয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দিচ্ছে, অনেক জায়গায় বিভিন্ন সংগঠন তৈরি করে আওয়ামী লীগ বা কোনো স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তির কাউকে সভাপতি বানিয়ে রাখছে, তারা হয়তো জানেও না যে, তারা জামায়াত-শিবিরের লোক।

‘জামায়াত-শিবিরের একটা অন্যতম কৌশল হলো, পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে নিজেকে গোপন করে ফেলা। নিজের মিথ্যা পরিচয় দেয়। এটাকে তাদের মওলানা মওদুদী বলেছেন ‘হেকমতে আমলি’ যেটা ইসলামে জায়েজ নেই। এভাবে তারা মাদ্রাসার পরিচয় ধারণ করে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখছে। আগামী ২৫ বছরের টার্গেট নিয়ে তারা এগোচ্ছে, যেন পুনরায় সাংগঠনিকভাবে দাঁড়াতে পারে।’

আল্লামা মাসঊদের দাবি, ‘কওমি মাদ্রাসার আইনের মধ্যে এ কথা স্পষ্ট উল্লেখ আছে- আমরা দেওবন্দের মাসলাকের অনুসারী। হাইয়াতুল উলয়ার আইনের মধ্যেও এটা বলা হয়েছে যে, এটা দারুল উলুম দেওবন্দের নীতিমালা অনুসারে চলবে। তো এখানে কীভাবে দেওবন্দের নীতিমালার বাইরের একটা লোককে সুযোগ দেয়া যাবে? ‘শিক্ষার অধিকার সবার আছে’ সেটা ঠিক। কিন্তু তারা তো ভবিষ্যতের জন্য হুমকি হয়ে উঠবে। কওমি মাদ্রাসার মূল দর্শনকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য তারা পরিকল্পিতভাবে এই শিক্ষাব্যবস্থাকে অকেজো করতে চায়। সুতরাং এটা শুধু হুমকির মুখেই নয়, বাস্তবতায়ও জামায়াত-শিবির কওমির ক্ষতি করছে। কারণ, দর্শন যখন থাকে না, তখন শিক্ষার মূল যে প্রাণ সেটাও ধ্বংসের মুখে পড়ে যায়। বিগত দিনে আলিয়া মাদ্রাসাগুলো সাধারণত তারা দখল করে ফেলেছে। এমনকি অনেক ইউনিভার্সিটি, কলেজকে তারা তাদের দখলে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে।’

আল্লামা মাসঊদ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘জামায়াত-শিবির তাদের আগামী ২৫ বছরের যে টার্গেট নিয়ে এগোচ্ছে, সেখানে তারা আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য স্বাধীনতার স্বপক্ষের সংগঠনগুলোর মধ্যে ঢুকে পড়ছে। এর আগে তারা বিভিন্ন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের মতাদর্শ ছড়িয়ে দিয়ে যেভাবে শিক্ষাব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, ঠিক সেভাবে এখন তারা কওমি মাদ্রাসার ভেতর পরিকল্পিতভাবে ঢুকে পড়ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘দাওরায়ে হাদিস পরীক্ষায় অংশ নিতে নিচের জামাতগুলো না পড়ে কেউ যেন দাওরায়ে হাদিসে পড়ার সুযোগ না পান, সে ব্যাপারে আমাদের বোর্ড অবশ্যই কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। এ ধরনের বিশৃঙ্খলা অবশ্যই নজদারিতে আনা হবে। আর সরকার তো তার আত্মরক্ষার্থে এখানে নজরদারি বাড়াবেই। মাদ্রাসাগুলোকে সতর্ক করবে। তবে সরকার যদি হস্তক্ষেপ করে, সেটা হবে আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক।’ সম্পাদনা: অশোকেশ রায়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত