প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ট্যানারি বর্জ্যে পোল্ট্রি ফিড তৈরি চলছেই

নিউজ ডেস্ক : কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না ট্যানারির বর্জ্য থেকে পোল্ট্রি ও মাছের বিষাক্ত খাদ্য তৈরি। হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্তে¡ও অসাধু কারবারিরা কখনও গোপনে আবার কখনও প্রকাশ্যেই ট্যানারির বর্জ্য জ্বালিয়ে বিষাক্ত পোল্ট্রি ফিড তৈরি করে দেশের বিভিন্ন এলাকার পোল্ট্রি ও মৎস্য খামারে সরবরাহ করছে। এসব ফিডে থাকছে ট্যানারির চামড়ায় ব্যবহৃত বিষাক্ত কেমিক্যাল ক্রমিয়াম, সালফিউরিক অ্যাসিড, সোডিয়াম, লাইম, এলডি, সোডা, ফরমিকা, ক্লোরাইড, সালফেট, অ্যালুমিনিয়াম সালফেটসহ নানা রকম কেমিক্যাল। এসব বিষাক্ত উপাদান মুরগি ও মাছের মাধ্যমে যাচ্ছে মানবশরীরে। ফলে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে ক্যানসার, কিডনি, লিভারের মতো জটিল রোগে এবং ব্রেন ও নার্ভাস সিস্টেম অচল হয়ে যাচ্ছে বলে জানান বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। সময়ের আলো।

গতকাল রাজধানীর হজারীবাগে এ রকম ছয়টি ট্যানারির বিষাক্ত পোল্ট্রি ও মৎস্য ফিড তৈরির কারখানার সন্ধান পান র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) ভ্রাম্যমাণ আদালত। মঙ্গলবার রাত ১০টা থেকে বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত হাজারীবাগে অভিযান চালিয়ে ছয়টি কারখানা থেকে ২ হাজার ৮০০ টন বিষাক্ত পোল্ট্রি খাদ্য ধ্বংস করা হয়। এ সময় ১০ জনকে দু’বছর করে কারাদন্ড ও ২৪ লাখ টাকা জরিমানা করেছেন র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। দন্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে সেলিম মিয়া, জুয়েল মিয়া ও জাহিদ হাওলাদার নামে তিন প্রতিষ্ঠানের তিন মালিক রয়েছে। বাকি সাতজন কর্মচারী। র্যাব-২, প্রাণিসম্পদ অধিদফতর ও মৎস্য অধিদফতরের সহযোগিতায় হাজারীবাগ এলাকায় এই অভিযান চলে বলে সময়ের আলোকে জানান র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম।

এদিকে গত মার্চে ট্যানারির বর্জ্য দিয়ে পোল্ট্রি ও মৎস্য ফিড তৈরির ওপর বিভিন্ন পত্রিকায় সিরিজ রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ট্যানারির বর্জ্য ব্যবহার করে মাছ ও মুরগির খাবার তৈরির কারখানার কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে যারা এ কাজের সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। এ ছাড়া হাইকোর্টের রায় পালন না করায় এ সংক্রান্ত রিট মামলার ছয় বিবাদীর বিরুদ্ধে কেন আদালত অবমাননার অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না সে বিষয়ে ৯ এপ্রিলের মধ্যে ব্যাখ্যা জানতে চান আদালত। ছয় বিবাদী ছিলেন শিল্প সচিব, বাণিজ্য সচিব, খাদ্য সচিব, স্বাস্থ্য সচিব, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সচিব ও পুলিশ মহাপরিদর্শক।

হাইকোর্ট সূত্রে জানা গেছে, নির্দেশনার পর আড়াই মাস পার হলেও ওই পাঁচ সচিব এবং পুলিশের আইজি এতদিন কোনো প্রতিবেদন দাখিল করেননি। তবে বুধবার কেবল মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব রইছুল আলম মন্ডল হাইকোর্টে প্রতিবেদন দাখিল করেন। এ বিষয়ে হাইকোর্টে রিটকারী আইনজীবী ও হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ গতকাল সময়ের আলোকে বলেন, এতদিন ছয়জনের কেউ প্রতিবেদন দেননি, কিন্তু বুধবার (গতকাল) মৎস্য সচিব প্রতিবেদন দিয়েছেন। প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেছেন, ট্যানারির বিষাক্ত বর্জ্য দিয় পোল্ট্রি ও মৎস্য ফিড তৈরির খামার বন্ধে এ পর্যন্ত কতটা অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে, কতজনকে জরিমানা করা হয়েছে এবং কতটা কারখানা বন্ধ করা হয়েছে। মনজিল মোরসেদ আরও জানান, বাকি চার সচিব ও পুলিশের আইজি এখনও তাদের প্রতিবেদন দাখিল করেননি, তারা আরও সময় চেয়েছেন।

দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর হাজারীবাগের ট্যানারি শিল্পকে ঘিরে এর আশপাশে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য বিষাক্ত পোল্ট্রি ফিড তৈরির কারখানা। কিন্তু হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি শিল্প সাভারের হেমায়েতপুরে স্থানান্তর হয়েছে। হেমায়েতপুরের তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের হরিণধরা গ্রামে গড়ে ওঠা চামড়া শিল্প নগরীর একেবারে উত্তর প্রান্ত ঘেঁষে এখন গড়ে উঠেছে ট্যানারির বর্জ্য জ্বালানোর বেশ কয়েকটি খামার। এখানে প্রায় ৪০টির মতো চুলা রয়েছে ট্যানারির বর্জ্য পোড়ানোর জন্য। এখানেই তৈরি হচ্ছে সাবানে ব্যবহারের জন্য ট্যানারির বর্জ্যরে চর্বি, পোল্ট্রি ও মাছের ফিড এবং মশার কয়ল তৈরির কাঁচামাল।
ট্যানারি শিল্প সাভারে সরে যাওয়ায় সবার ধারণা ছিল হাজারীবাগে হয়তো আর এসব বিষাক্ত খাবার তৈরির কারখানা আর নেই। কিন্তু গতকাল র্যাবের অভিযানে সেখানে ছয়টি কারখানার সন্ধান মিলল। এ বিষয়ে র্যাবের ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম সময়ের আলোকে আরও জানান, ‘আমাদেরও ধারণা ছিল না যে, হাজারীবাগে এখনও এসব কারখানা রয়েছে। কিন্তু গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আমরা এখানে কারখানা থাকার বিষয়টি জানতে পারি। জানার পরই অভিযানে এসেছি। হাজারীবাগে ট্যানারি কারখানা না থাকলেও এসব কারখানার মালিকরা সাভার থেকে ট্যানারির বর্জ্য এনে কারখানা চালাত। আমরা এই অভিযানে ২ হাজার ৮০০ টন বিষাক্ত পোল্ট্রি ফিড জব্দ করে সেগুলো গভীর গর্তে পুঁতে ফেলেছি।

উল্লেখ্য, গত ২ এপ্রিল ট্যানারির বর্জ্য দিয়ে মাছ ও পোল্ট্রির খাবার তৈরির সব কারখানা বন্ধের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। সে সঙ্গে যারা ট্যানারির বর্জ্য দিয়ে এসব খাবার তৈরি ও বিপণন করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে এক মাসের মধ্যে একটি প্রতিবেদন দিতে সংশ্লিষ্ট পাঁচ মন্ত্রণালয়ের সচিব ও পুলিশপ্রধানকে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত