প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ভারতে নির্বাচন : মাত্র একজন ভোটারের জন্য এতো আয়োজন!

চিররঞ্জন সরকার

ভোট দেওয়া সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার। প্রত্যেকটি মানুষেরই সংবিধানবলে এই ক্ষমতার অধিকারী। ভোটের সবচেয়ে বড় গুণ হচ্ছে ভোট ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু, জাত-পাত সবকিছু ঘুচিয়ে দেয়। উদ্ধত মাস্তান, অহঙ্কারী বুদ্ধিজীবী সাবেক মন্ত্রী, হোমরা-চোমরা প্রভাবশালী, সহায়-সম্বলহীন দীনভিখারি সবার পরিচয় কেবল ভোটার। বুদ্ধিজীবীর ভোট, মন্ত্রীর ভোট, ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসীর ভোট আর একজন সাধারণ ভিখারির ভোটের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। সবারই একটি মাত্র ভোট। সবাই ভোটার এবং সবার ভোটের সমান দাম। ভোট ভোটারদের মহিমান্বিত করে। ভোটারের এই মহিমাকে আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে ভারতের চলমান লোকসভা নির্বাচন।

ভারতের লোকসভা নির্বাচনে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। ভোটার মাত্র একজন! আর তার ভোট নিতে ৪৮৩ কিলোমিটার পার্বত্য দুর্গম পথ উজিয়ে বুথ তৈরি করে ভোটগ্রহণ করেছে নির্বাচন কমিশন। চীনের সীমানা সংলগ্ন অরুণাচল প্রদেশের মালোগাঁয়ে এই ঘটনাটি ঘটেছে। এই ভোটারের নাম সোকেলা তাওয়াং। স্বামী সন্তানদের নিয়ে মালোগামেই থাকেন তিনি। সোকেলা ছাড়া মালোগামের প্রত্যকেই নিজেদের নাম অন্য বুথে সরিয়ে নিয়েছেন। টানা চারদিনের চড়াই-উতরাই যাত্রা শেষে সেই অস্থায়ী বুথে সোকেলা তাওয়াংয়ের ভোট নিয়ে উচ্ছ্বসিত ভোটকর্মী থেকে নিরাপত্তারক্ষীরা। বললেন, ‘সোকেলার ভোটদান নিশ্চিত করতে পেরে দুঃসাহসিক অভিযানের ক্লান্তি ভুলেছি’।

ভারতে ৯০ কোটি ভোটারের মধ্যে সোকেলা একজন। পার্বত্য অরুণাচলের দুর্গম এলাকা মালোগাঁওর একটি ছোট্ট জনপদে বাস তার। ওই জনপদে সাকুল্যে পাঁচটি পরিবারের বসবাস। তাদের মধ্যে ভোটদানের অধিকার পেয়েছেন একমাত্র সোকেলা। পেয়েছেন কমিশন প্রদত্ত সচিত্র পরিচয়পত্রও। ওই পাঁচ পরিবারের অনেকেই বলেছিলেন, সোকেলার জন্য এতোটা দুর্গম পথ ভেঙে আসার প্রয়োজন নেই ভোটকর্মীদের। বরং অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক জায়গায় বুথ  তৈরি হোক। সোকেলাকে নিয়ে সেখানেই ভোট দেওয়াবেন তারা।

গ্রামবাসীদের ওই প্রস্তাব পত্রপাঠ খারিজ করে দিয়েছিলেন মালোগাঁওয়ে ভোটগ্রহণের দায়িত্বে থাকা অফিসার গাম্মার বাম। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, জীবন বাজি রেখেই ভোটারের উঠানেই তৈরি হবে বুথ। সেই মতো দলবল নিয়ে প্রস্তুতিও শুরু করে দেন তিনি। কারণ কমিশনের নিয়মই হল দুই কিলোমিটারের বেশি পথ পেরিয়ে ভোটকেন্দ্রে যাবেন না ভোটাররা। গত ১১ এপ্রিল ছিলো প্রথম পর্যায়ের ভোট। গোটা দেশের গণতন্ত্রের উৎসবে সোকেলাকে শামিল করাতে চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলেন নির্বাচন কমিশনের ওই কর্মকর্তা। কমিশনের নির্ঘণ্ট মেনে ঠিক সাতটায় মালোগাঁওয়ে বুথ খুলে বসেছিলেন তিনি। বুথ বলতে পার্বত্য ঢালে নড়বড়ে টিনের ছাউনি। চারদিকে ঝোপঝাড়। সেই ছাউনির এক কোনে ইভিএম রাখা। প্লাইউড দিয়ে যতœ করে ঘেরা সেটি। এই বুথে ধীর গতিতে ঢুকেছেন সোকেলা। প্রিসাইডিং অফিসার বামকে নিজের সচিত্র পরিচয়পত্র দেখিয়েছেন। তার পর বামের নির্দেশমতো ইভিএমে বোতাম টিপে একগাল হাসি হেসে বুথ থেকে বের হয়ে আসেন সোকেলা। ভোট দিতে পেরে তিনি খুশি। আর সোকেলার ভোট নিতে পেরে দুঃসাহসিক অভিযাত্রীদের মুখে তখন বিজয়ীর হাসি। ঘড়ির কাঁটা মেনে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত খোলা থাকল সেই বুথ। এভাবেও ভারতে এখনও ভোট হয়!

দেশের নাগরিকদের ভোটের মূল্য যে কত অপরিসীম-তারই দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো মালোগাঁওয়ে। খাড়া পাহাড় ভেঙে ভেঙে সীমান্ত ঘেঁষা ওই জনপদে যাওয়াটা অত্যন্ত কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ। একটাই পথ। এবং একলা চলাই পথের দাবি। একসঙ্গে দুজনে যাওয়াই মানে মৃত্যুর হাতছানি। কেমন ছিলো সেই অভিযান? অরুণাচলের পার্বত্য শহর ৩ হাজার ৬০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত হাওয়াই থেকে যাত্রা শুরু করেন ভোটকর্মীরা। নেতৃত্বে অরুণাচলের সরকারি ইঞ্জিনিয়ার বাম। সঙ্গে নিরাপত্তারক্ষীরা। তাদের হাতে ইভিএমসহ ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া ব্যবহৃত ৬৭টি সামগ্রী। দুর্গম পথে সেই অভিযানের কথা বলতে গিয়ে বারবার শিউরে উঠছিলেন অভিজ্ঞ পর্বতারোহী বাম। বলছিলেন, যাত্রা শুরুর দিন থেকেই ট্রেকিং করতে করতে পাহাড়ি পথ ভেঙেছি। কখনও সেই পথে ডিঙোতে হয়েছে খর¯্রােতা নদী। ঝুলন্ত রুটব্রিজ। একটু অন্যমনস্ক হলেই কয়েক হাজার ফুট গভীর খাদে। নীচের দিকে তাকালেই হিম হয়ে যায় গোটা শরীর। মালোগাঁয়ের হাতছানি পেয়েও স্বস্তি ছিলো না বামেদের। চার দিনের মাথায় আট ঘণ্টার পথ পেরিয়ে প্রায় মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মালোগাঁওয়ের। তবুও সেটা ছিলো দীর্ঘ চড়াই পথ! আর তখনই সূর্য ঢলে পড়ে পশ্চিম আকাশে। ভোটকর্মী রূপক তামাংয়ের ভাষ্য মতে, ‘চারিদিকে জঙ্গল। ক্রমেই ঘন হচ্ছে অন্ধকার। খর¯্রােতা নদীর ভয়ঙ্কর গর্জন। বড্ড নার্ভাস লাগছিলো আমাদের। কিন্তু থেমে থাকার কোনও উপায় ছিল না। তাই অন্ধকার ভেদ করেই ট্রেকিং করছিলেন বামেরা। ভোর পাঁচটার মধ্যেই যে সম্পূর্ণ তৈরি করে ফেলতে হবে সোকেলার জন্য বুথ!

আমাদের দেশে অনেক মানুষ ভোট দেন না। অনেকে ভোটকেন্দ্রে গিয়েও ভোট দিতে পারেন না। ভোট দিতে গেলে দেখা যায়, অন্য কেউ ভোট দিয়ে গেছে। অথচ আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে একজন মাত্র ভোটারের জন্য অনন্য আয়োজন করা হয়। যে দেশে ভোট ও ভোটারের মূল্যকে এতো বড় করে দেখা হয়, গণতন্ত্রের দেবীর তো সেখানেই আসন গ্রহণ করার কথা! আমাদের দেশে ভোট ও ভোটারের মূল্য আমরা কবে বুঝতে শিখবো? লেখক : কলামিস্ট

 

 

 

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত