প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নারীর দেহকেন্দ্রিক ট্যাবু, দেশে দেশে

মুসফেকা আলম ক্যামেলিয়া: ‘ইয়ে ভি কোই মাম্মি পাপা কি করনে কি চিজ হ্যায়?’ ‘বধাই হো’ সিনেমায় ৫০ পেরোনো মায়ের ফের সন্তানসম্ভবা হওয়ার খবর জানতে পেরে, মা বাবার যৌনতা নিয়ে এমনই হতভম্ব প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল ২৫ বছরের যুবক নকুল। নকুলের মতোন প্রায় ৯০ ভাগ মানুষের বেলায়ই তা আতকে উঠবার মতোন এক বাস্তবতা। আসলে বাস্তবতা কী? বাস্তবিক বিষয় নাকি ঘটে যাওয়া ঘটনাকে আমরা আমাদের জ্ঞান, অভ্যস্ততা দিয়ে ব্যাখ্যার চেষ্টা করি। যাকে আমরা সোজা কথায় বলি ট্যাবু। পলিনেশীয় শব্দ ট্যাবুর আভিধানিক অর্থ অলঙ্ঘনীয় বা নিষিদ্ধ, পবিত্র বা অপবিত্র বিবেচনা করে কোনো বস্তু বা ব্যক্তিকে আলাদা করে রাখা। আদিতে ভয়ংকর কোন প্রাণী বা অজানা কোন ভীতিকর বিষয়কে টোটেম হিসেবে গ্রহণ করে তার সন্তুষ্টি করার প্রক্রিয়াই ধীরে ধীরে ট্যাবুতে পরিণত হয়েছে।

ফলে বলা যায়, সমাজের প্রচলিত ধ্যান ধারণা বা কর্তৃত্বের উপর দিয়ে গড়া যে কোন নীতিই আদর্শ বা অনুসরণীয় হয়ে তা ধীরে ধীরে ট্যাবুতে পরিণত হয়। তেমনই এই সমাজে যৌণতা এক ট্যাবু। যৌণতার ট্যাবু টিকে আছে প্রায় সব দেশেই। একে ঘিরে অদ্ভুত কিছু নিয়মও চোখে পড়ে। তেমনই কয়েকটি বলি।

ওহিও দ্বীপে, কোন নারী কোন পুরুষের ছবির সামনে নগ্ন হওয়ায় নিষেধাজ্ঞা আছে। লেবাননে, স্ত্রী প্রাণীদের সাথে পুরুষরা সেক্স করলে তা বৈধ। কিন্তু পুরুষ প্রাণীদের সাথে সেক্স অবৈধ। হাঙ্গেরিতে সেক্স করতে গেলে লাইট অবশ্যই নেভাতে হবে। যা আইন আকারে আছে। হংকং এ কোনও নারী যদি বুঝতে পারেন স্বামী তাঁকে ঠকাচ্ছেন, তাহলে স্বামীকে খুন করতে পারেন। তবে কোন আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ। এমন আরও অসংখ্য ট্যাবু ঘিরে আছে প্রায় সব সমাজব্যবস্থাতেই।

এবার আসি নিজ দেশের কথায়। যৌনাচার যা শুধুমাত্র বিয়ের পরের বিষয় হিসেবে এক নিষিদ্ধ অনুচ্চারিত শব্দ হয়ে আমাদের রাষ্ট্র সমাজ আর পরিবারে টিকে আছে। আদিম সমাজ ব্যবস্থায় প্রজননে নারী পুরুষের ভূমিকা না বুঝে নারী লিঙ্গ তাদের পূজণীয় বিষয় ছিল। আজও ফকিরদের নানা তুকতাকের সরঞ্জামে কড়ির ব্যবহার দেখা যায়। যা মূলত নারীলিঙ্গের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সেই সময় নারী ছিল দেব সমতুল্য। প্রজননের মূল রহস্য উদঘাটন আর সাথে সম্পদের স্থায়ীত্বে নারীর হাত থেকে সমাজের কর্তৃত্ব চলে যায় পুরুষের হাতে। শুধু নারীই নয়, নারীর লিঙ্গের উপরেও কর্তৃত্ব স্থাপিত হয়, যা আমার প্রথা বিষয়ক লেখায় কিছুটা উল্লেখ করেছি। এই কর্তৃত্বই পুরুষতন্ত্রের জন্ম দিয়েছে। আর পুরুষতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে সমাজে একের পর এক নিয়মাচারের জন্ম। যৌণতার ট্যাবু যা গড়ে উঠে মূলত পুরুষতন্ত্রের হাত ধরেই। নারীর উপর কর্তৃত্বের এক অবশ্যম্ভাবী সত্য হয়ে। এই কর্তৃত্বকে পোক্ত করতে সমাজ থেকে যৌণতার মতোন স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে নিষিদ্ধ বস্তু হিসেবে মূল্যায়ণ করার প্রচেষ্টা চলে। অথচ সঙ্গম, সেক্স, মিলন, সহবাস, মৈথুন, কাম শব্দগুলো আমাদের জীবনের সাথে জড়িত। তা নিষিদ্ধ শব্দ বা অলঙ্ঘনীয় কোন বিষয় নয়, খুব স্বাভাবিক এক বায়োলজিক্যাল সত্য।

মজার বিষয়, এই তথ্যকে নানান চাপা হাসি, বিদ্রুপ, লজ্জা, সম্মান দিয়ে ঢেকে রাখায় বিষফোড়ার মতোন অবদমনের ফলাফল দাড়ায় সবার অলক্ষ্যে, অতি গোপনীয়তার সাথে যৌণতৃষ্ণা মেটাবার চেষ্টা। তখনই ভিকটিম হয় সমাজের দুর্বল অংশ। নানা অপসংস্কৃতি বাসা বাধে সমাজে। যার এক চরম রূপ ধর্ষণ। তবে ধর্ষণের এই চরম রূপ শুরু হয় খুব সাদামাটা কথার মধ্য দিয়ে। মেয়ে বড় হয়েছে, বুকে কাপড় দাও, এতো মেয়ে থাকতে তোমার গায়েই হাত পড়ে? তুমি মেয়ে, গলা চড়িয়ে কথা বল না, খিলখিলিয়ে হেসো না। তোমার শরীর ঢাকো, মুখ ঢাকো, হাত পা সব ঢাকো যাতে পুরুষগুলো উত্তেজিত না হয়ে যায়। আর ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে প্রথমেই বলা হয়, ওই মেয়েকে কেন ধর্ষণ করলো, নিশ্চয়ই বেলেল্লাপনা করে বেড়ায় বা যে খোলামেলা পোষাক পড়ে, ধর্ষণ তো হবেই। কোন মেয়ে রাতের অন্ধকারে ধর্ষণ হলো, বলা হল, রাত বিরেতে কোন ভদ্র মেয়ে ঘরের বাইরে থাকে? আর যদি কোন নাইট ক্লাব বা ছেলে বন্ধুদের সাথে হুল্লোড় করতে গিয়ে পরিস্থিতির শিকার হয় তাহলে তো আর কথাই নেই। একদিকে যৌণতাকে ঘিরে উপরিকাঠামোর সংস্কার, অন্যদিকে অবদমিত চাহিদার প্রকাশের দায়ভার দুর্বল অংশের উপর চাপিয়ে দিয়ে দিব্যি সমাজ ব্যবস্থায় ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অপরাধ টিকে থাকে। সমাজে প্রচলিত এই ভাষাগুলো যার মূল আশ্রয়।

তসলিমা নাসরীনের ট্যাবু বিষয়ক এক লেখায় পেয়েছিলাম, চার্লি নামের এক মেয়ে টুইট করেছিলেন, ‘মেয়েদের পিরিয়ডকে যেরকম ঘেন্না করে পুরুষেরা, ধর্ষণকেও যদি একইরকম ঘেন্না করতো!’ এই টুইট দেখে এলোনে নামে এক জার্মান শিল্পী এমনি উত্তেজিত হয়েছিলেন যে, চার্লির কথাগুলো চল্লিশটি স্যানিটারি ন্যাপকিনের ওপর লিখে তাঁর শহরের দেয়ালে দেয়ালে সেঁটে দিয়েছিলেন। এলোনে টের পেয়েছেন, পিরিয়ডকে ধর্ষণের সাথে মিলিয়ে দিলে লোকদের অস্বস্তি হয়। আর ওই অস্বস্তি দিতে পারাটাই সাকসেস।

ডার্টি পিকচার খ্যাত বিদ্যা বালানের এক মন্তব্য ২০১৭ সালে চ্যানেল আই অনলাইন পত্রিকায় দেখে বেশ ভালো লেগেছিল। মন্তব্যটি ছিল এমন, ভারতীয় সংস্কৃতিতে যৌণতাকে কখনই মানবিক অনুভ‚তি হিসেবে দেখা হয় না… ভারতে যৌণতাকে দেখা হয় শুধুই বিয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয় হিসেবে, বিয়ের পর যৌণক্রিয়ার মাধ্যমে সন্তান জন্ম নেবে। এর বাইরে যৌণতা নিয়ে কারও কোন কথা নেই। … বিদ্যার মতে, এমন এক অবস্থানে সবাইকে আসতে হবে যেন ঐতিহ্য ও আধুনিকতার ভারসাম্য রেখে চলা যায় আর যৌণতা নিয়ে কতিপয় মানুষের দ্বিমুখী ভন্ডামীকে সমাজ থেকে দূর করা যায়।

নতুন প্রজন্মকে জানতে হবে, যৌনতা একটি জৈবিক চাহিদা, এক ধরণের অনুভুতি। এটি কোন নিষিদ্ধ বিষয় নয়। দেশে শিশু ধর্ষণের ঘটনা অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে। আর খোদ পরিবারেই একেক ধর্ষক। বিষয়টি মর্মান্তিকই নয়, ভয়াবহ। আর এই ভয়াবহতার মূল কারণ সঠিক যৌন শিক্ষা বা সঠিক যৌনাভ্যাস। বয়োসন্ধিকাল থেকেই ইগনোর না করে সুস্থ জীবন চর্চার অভ্যাস গড়ে তোলাই হতে পারে এর সমাধান। এক্ষেত্রেও সমাধানের চেষ্টা স্বাভাবিক রূপে না গিয়ে থাকে ধর্ম, প্রথা, নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে আটকানো। অথচ ছেলে মেয়েদের এর স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক রূপ নিয়ে ধারণা অর্জন করতে দেয়াটাই সবচেয়ে কার্যকর দিক।

লেখক: প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, তেজগাঁও কলেজ, ঢাকা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত