প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মুসলিম রাষ্ট্রে সংখ্যালঘুদের অধিকার

আবুল কাশেম ইয়াছিন : মুসলমানদের রাষ্ট্রে বসবাসরত সংখ্যালঘুদের বিভিন্ন অধিকার থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ অনেক সময় শুনা যায়। অথচ ইসলামের শিক্ষা হচ্ছে, শত্রু-মিত্র সকলের সাথে ইনসাফপূর্ণ আচরণ করা। সকল নাগরিকের সমান সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা। এমনকি কোনো সম্প্রদায়ের লোক যদি বাড়াবাড়ি করে ফেলে, তা হলেও তাদের সঙ্গে অসৎ আচরণ করা ঠিক নয়।

আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘হে ইমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর (বিধি-বিধানের) পূর্ণ প্রতিষ্ঠাকারী ও ইনসাফের সঙ্গে সাক্ষ্যদানকারী হয়ে যাও। আর কোনো সম্প্রদায়ের শত্রুতা যেন তোমাদের সুবিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে। তোমরা সুবিচার কর, এই তাকওয়ার বেশি নিকটবর্তী এবং আল্লাহকে ভয় করতে থাক। নিশ্চয় তোমরা যা কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবগত।’ (সূরা মায়েদা: ৮)

জনৈক ইহুদি আলেম নবী করিম (সা.) এর নিকট কিছু টাকা পেত। একদা সে ঋন আদায়ের জন্য অনেক বেশি তাকিদ দিতে থাকে। সে নবী করিম (সা.)-কে বলতে থাকে, আমার পাওনা পরিশোধ না করলে তোমাকে ছাড়বো না। তাই যোহর থেকে পরদিন ফজর পর্যন্ত রাসূল (সা.) তার কাছে অবস্থান করেন। সাহাবাদের একদল ওই লোককে ধমকাতে থাকলেন এবং বিভিন্নভাবে ভয় দেখাতে থাকলেন। তখন হুজুর (সা.) বলেন, আমার রব আমাকে মুসলিম রাষ্ট্রে অবস্থানকারী কাফির-মুশরিক বা অন্য কাউকে জুলুম করতে নিষেধ করেছেন। (মেশকাত)

হজরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ (রাহ.) ছিলেন, একজন প্রতাপশালী খলিফা। তিনি জানতে পারলেন কুফা নগরীর রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তারা জনগণের ওপর অযৌক্তিক কর, কঠোর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছে। তিনি তাদের উদ্দেশ্যে চিঠিতে লেখেন, ‘দ্বীনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, মানুষের সঙ্গে ইনসাফ ও ইহসান অনুগ্রহ করা (মানুষের ওপর অযৌক্তিক কর, কঠোর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়া দীনের সঙ্গে যায় না)।’ (আহকামু আহলিজ জিম্মা, পৃষ্ঠা- ৩৪)

যে সকল অমুসলিম নাগরিক মুসলমানদের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধ বা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়নি তাদের সঙ্গে সদাচরণ করার কথা বলা হয়েছে। আল কোরআনে বলা হয়েছে- ‘আল্লাহ তায়ালা তোমাদের নিষেধ করেননি ওই সকল লোকদের সঙ্গে ভালো এবং ইনসাফের আচরণ করেত, যারা তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়নি এবং তোমাদেরকে তোমাদের ঘর থেকে রেব করে দেয়নি।’ (সূরা মুমতাহিনা: ৮)

জাগতিক ক্ষেত্রে তাদের ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য কোনো শাস্তি না দিয়ে ক্ষমা করে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। হাদিসের কিতাবসমূহে এসেছে, জিজিয়া আদায় না করার কারণে এক জিম্মিকে এক লোক শাস্তি দেয়। হজরত হিশাম ইবনে হাকিম ইবনে হিজাম (রা.) তা দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলেন। তিনি বলেন, এটা কী? আমি রাসূল (সা.)-কে বলতে শুনেছি- ‘নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা ওই সকল লোকদের শাস্তি দিবেন, যারা দুনিয়ার জন্য লোকদের শাস্তি দেয়।’ (আবু দাউদ-৩০৪৫)

তাই কোরআন ও হাদিসের আলোকে ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে, মৌলিকভাবে একজন অমুসলিম নাগরিকের নিম্মোক্ত বিষয়গুলো নিশ্চিত করা-

(এক) জীবনের নিরাপত্তা
একজন মুসলমানের জীবন যেমন সম্মানিত ও নিরাপত্তাযোগ্য, একজন অমুসলিম সংখ্যালঘুর জীবনও তেমন সম্মানিত ও নিরাপত্তাযোগ্য। ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে, রাষ্ট্রের অমুসলিম নাগরিকদেরকে অন্যদের জোর-জুলুম ও বাড়াবাড়ি থেকে নিরাপত্তা দেয়া। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তি কোনো জিম্মীকে হত্যা করলে সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। অথচ তার ঘ্রাণ চল্লিশ বছরের দূরত্ব থেকেও পাওয়া যাবে।’ (সহীহ বুখারী, কিতাবুল জিহাদ, অধ্যায়-অন্যায় ব্যতিত অমুসলিম জিম্মীকে হত্যা করার গুনাহ)

(দুই) সম্পদের নিরাপত্তা
ইসলামি রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে, অমুসলিম নাগরিকদের মাল-সম্পদের নিরাপত্তা দেয়া। তারা কোনো বস্তুর হকদার হলে, তাতে দখল না দেয়া। তাদের জমা-জমিন কখনো জবর দখল না করা। কোনো অমুসলিম নাগরিক যদি জিজয়া না দিয়ে মারা যায় তাহলে তার দায়িত্ব থেকে জিজয়ার হুকুম রহিত হয়ে যাবে; এর জন্য তার মাল নিলামে তোলা যাবে না। কেউ কোনো কারণে জিজয়া না দিলে তার সম্পদ ক্রোক করা যাবে না। হজরত আলী (রা.) এক প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে উদ্দেশ্য করে লেখেন, ‘খেরাজের জন্য তাদের গাধা, গরু ও কাপড় ইত্যাদিকে কখনো বিক্রি করা যাবে না।’ (আহকামু আহলিজ জিম্মা)

(তিন) পেশার স্বাধীনতা
অমুসলিম নাগরিক ক্রয়-বিক্রয়, কর্ম ও পেশা এবং জীবিকা উর্পাজনের সকল ক্ষেত্রে মুসলমানদের ন্যায় অধিকার ভোগ করবে। এর বাইরে তারা মদ ও শুকরও বিক্রি করতে পারবে। তবে মুসলমানদের বিচারক হিসেবে তাদের কোনো দায়িত্ব তাদের দেয়া যাবে না।

(চার) ইজ্জত-আবরুর নিরাপত্তা
তাদের ইজ্জত-আবরুর নিরাপত্তা দেয়া ইসলামি রাষ্ট্রের কর্তব্য। ইসলামি রাষ্ট্রের কোনো নাগরিককে বেইজ্জতি করা বা অপমানিত করা কোনোভাবেই সমর্থন যোগ্য নয়। একজন অমুসলিমের ইজ্জতে আঘাত করা, দোষচর্চা করা, তার ব্যক্তিগত বিষয়ে নাক গলানো ওই রকম নাজায়েজ যেমন একজন মুসলমানের বেলায় নাজায়েজ।

(পাঁচ) ন্যায় বিচার পাওয়ার অধিকার
ফৌজদারী ও দেওয়ানী অপরাধ, উভয়টার বিচার মুসলিম ও অমুসলিম উভয়ের জন্য সমান। এ ক্ষেত্রে মুসলমানের যে শাস্তি, অমুসলিমেরও তাই। চুরি, ধর্ষণ ও ধর্ষণের অপবাদের ক্ষেত্রে উভয়ের শাস্তি এক রকম। মুসলিম ও অমুসলিমের মাঝে কোনো বৈষম্য নেই। কিসাস (হত্যার বদলায় হত্যা) দিয়াত (রক্তপণ) ও ক্ষতিপূরন দেয়ার ক্ষেত্রেও উভয় সমান। মুসলমান কোনো অমুসলিমকে হত্যা করলে, এর বদলায় মুসলিমকে হত্যা করা হবে। কারণ ‘তাদের রক্তও আমাদের রক্তের ন্যায়।’

(ছয়) ধর্মীয় স্বাধীনতা
আকিদা-বিশ্বাস, উপাসনা ও ধর্মীয় উৎসব পালনে তাদের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা থাকবে। এ সকল বিষয়ে কোনোরূপ হস্তক্ষেপ করা হবে না। গির্জা, মন্দির নির্মাণে কোনো বাধা দেয়া বা নির্মিতগুলোকে গুড়িয়ে দেয়া যাবে না। আল-কোরআনে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, ‘দীনের ব্যাপারে কোনো জোর-জবরদস্তি নেই, হেদায়েত গোমরাহি থেকে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে’। (সূরা বাকারা)

তাই ইসলামি রাষ্ট্রে অমুসলিম সম্প্রদায়ের অধিকার নিশ্চিতে যে উদারতা দেখিয়েছে অন্যদের জন্যও তা অনুকরণীয় ও দৃষ্টান্ত হতে পারে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত