প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ষোলো ডিসেম্বর বিজয়ের আগে-পরে

ড. অনুপম সেন : ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করে যৌথবাহিনীর কাছে। বাংলাদেশ বিজয় লাভ করে। কিন্তু তখনো একজন পাকিস্তানের কারাগারে। স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৬ ডিসেম্বর বিজয়োল্লাস করলেও সবাই তখন ভীষণ উদ্বিগ্ন, চিন্তিত নেতাকে নিয়ে, কী অবস্থা জাতির জনকের কে জানে। তিনি আদৌ ফিরতে পারবেন কি না আমাদের মাঝে এমন শঙ্কা ও হাজারো প্রশ্ন সবার মনে।

বঙ্গবন্ধু দেশে না ফিরলে তো দেশ থাকবে না, ধ্বংস হয়ে যাবে। কারণ দেশ তখন যুদ্ধবিধ্বস্ত। কিন্তু যখন থেকে বাংলাদেশের মানুষ জেনে যায় যে, জাতির জনক পাকিস্তান থেকে ৮ জানুয়ারি মুক্তি পেয়ে লন্ডন থেকে দিল্লি হয়ে স্বদেশে ফিরছেন তখন থেকেই সবাই অধীর অপেক্ষা করছিলো তার জন্য। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বঙ্গবন্ধু সশরীরে উপস্থিত ছিলেন না। কিন্তু যুদ্ধ হয়েছে তার নামেই। বঙ্গবন্ধুকে ফিরে পেতে তখন সারাবিশ্বই উদগ্রীব ছিলো। বাংলাদেশের কোটি মানুষের উদগ্রিব, শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীসহ বিশ্বনেতাদের পাকিস্তানের উপর প্রবল চাপ ও আন্তরিক প্রচেষ্টার ফলে পাকিস্তানিরা বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। জনক ফিরে আসেন তার আপন ঠিকানায়। জনতা ফিরে পায় তার প্রিয় নেতাকে।

যখন তাকে আমরা পেলাম স্বাধীন দেশে, তিনি ফিরলেন তার প্রিয়মাতৃভূমিতে উল্লাস সবার, সে কি আনন্দ-অশ্রু জনতার চোখে। যে যার মতো তখন আনন্দ করছিলো। উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছিলো। স্বস্তিপ্রকাশ করছিলো। তখন জনতার সবচেয়ে আপন, প্রিয় নেতা তো একজনই, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাকে ফিরে পাওয়া তো বিরাট স্বস্তি। আনন্দ। ভালোলাগার ছিলো।

বঙ্গবন্ধু যখন দেশে ফিরছিলেন, তখনই কোনো এক জায়গায় শ্রীমতি ইন্ধিরা গান্ধীর কাছ থেকে এই প্রতিশ্রুতি আদায় করে নিয়েছিলেন যে, মিত্রবাহিনী ৩ মাসের মধ্যে ফিরে যাবে। এটি কিন্তু বিশ্ব ইতিহাসে খুব দুর্লভ, সাধারণত এমনটি হয় না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকা জাপান দখল করেছিলো, এখনো কিন্তু জাপানে আমেরিকার সৈন্য রয়েছে। এমনকি জার্মানি ও ইউরোপের বিভিন্ন জায়গায় এমনটি দেখা যায়।

যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদের সবার হাতে তখন অস্ত্র। তিনি মিটিং করে যাদের কাছে অস্ত্র ছিল সেগুলো উদ্ধার করেছিলেন। সবাইকে বলা হয়েছিল অস্ত্র সমর্পণ করার। অতি অল্প সময়েই তারা অস্ত্র সমর্পণ করেছিলো। কাদের সিদ্দিকী থেকে শুরু করে এমন কেউ নেই যে তিনি বঙ্গবন্ধুর কাছে অস্ত্র সমর্পণ করেননি। যারা এটি করেননি, ধারণা করা হয়েছিলো তারা দেশদ্রোহী।

পাকিস্তান সৃষ্টির পর দেশটির সংবিধান রচনার ক্ষেত্রে প্রায় ৯ বছর সময় নিয়েছিলো। সেজন্য পাকিস্তানের ভিত্তিটিই আলগা হয়ে গিয়েছিল। সেখানে মাত্র ১০ মাসের মধ্যে বঙ্গবন্ধু একটি অসাধারণ সংবিধান রচনা করেছিলেন। উপহার দিয়েছিলেন দেশকে, গণপরিষদ থেকে পাস করিয়ে নিয়ে। এটি তো একটি অসাধারণ কাজ। তিনি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। সেই পরিকল্পনার মাধ্যমে অর্থনীতি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য এগিয়ে নেওয়ার জন্য তিনি তাৎক্ষণিক অনেক উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা তখন একটি বিরাট ব্যাপার। এই পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে অনেক দেশ অনেক সময় নিয়েছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু কোনো সময়ই নেননি। তিনি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশকে অগ্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।

বঙ্গবন্ধু যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ পেয়েছিলেন। যুদ্ধে এই দেশটির বিরুদ্ধে পাকিস্তান পোড়ামাটি নীতি গ্রহণ করেছিলো, যাতে এদেশের মানুষ খেতে না পায়, অভাব-অনটনে থাকে, দারিদ্র্যের চাপে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যায়। এজন্যই তৎকালীন আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। কারণ এটি হলো একটি তলাবিহীন ঝুড়ি।’ কেন কিসিঞ্জনার এমনটি বলেছিলেন, কারণ তখন এখানে আসলে কিছুই ছিল না। সেই ‘কিছু ছিল না’দেশটিকে বঙ্গবন্ধু গড়ে তোলার কাজ শুরু করলেন। পঁচাত্তরের যখন তিনি সপরিবারে নিহত হন, তখন বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রায় দাঁড়িয়ে গেছে। কৃষিতেও স্বয়ংসম্পন্নের পথে ছিল। শিল্পে অসাধারণ উন্নয়ন ঘটেছিলো। তিনি কি না করেছিলেন তখন। সম্ভাবন্য প্রায় সবকিছু করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। ভয়ানক রকম চক্রান্ত করেই তো তাকে হত্যা করা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, আমি এদেশের মানুষের জন্য সব কিছু করছি, কিন্তু কেউ ভাবেনি এভাবে তাকে হত্যা করতে পারে।

জাতির জনক এখন আমাদের মধ্যে সশরীরে নেই, আছেন আদর্শে, চিন্তা-চেতনায়, কাজকর্মে, সিদ্ধান্তে। তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন রাষ্ট্রপরিচালনা করছেন। এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। তার স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ এখন খুব কাছে। বাংলাদেশকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা আগেও করেছিলো দুষ্টচক্র, এখনো করছে, কিন্তু দমাতে পারেনি, পারবেও না। বাংলাদেশ এগিয়েছে, বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে তার কাক্সিক্ষত গন্তব্যে। জয় বাংলারই হবে, জয় এদেশের জনতারই হবে, জয়ী হবে বঙ্গবন্ধুর ‘স্বপ্নের সোনা’ সোনার মানুষেরাই। জয়তু বাংলাদেশ, জয়তু জনতা, জয়তু জাতির জনক। পরিচিতি : শিক্ষাবিদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত