প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

এ সপ্তাহের সাক্ষাৎকার
ঋণখেলাপিদের বিচারে ইশতেহারে অঙ্গীকার চাই

প্রথম আলো: এবার নির্বাচনে বড় ঋণখেলাপিদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়নি। এ বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

মইনুল ইসলাম: নির্বাচনের বহু আগে থেকেই রাঘববোয়াল ঋণখেলাপিরা তাঁদের খেলাপি ঋণগুলো নিয়মিত করে নিয়েছেন। বছরের পর বছর তাঁরা উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়েছেন। আমরা দেখব যে বড় ঋণখেলাপিরাই কোনো না কোনো ব্যাংকের মালিক বা পরিচালক। তাঁরা অসীম প্রভাব খাটিয়ে তাঁদের ঋণগুলো নিয়মিত করে নিয়েছেন। ফলে ঋণখেলাপি হলে যে তাঁদের মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার কথা, সেই বাধা তাঁরা টপকে গেছেন। যাঁরা বড় বড় ঋণখেলাপি হিসেবে আমাদের কাছে পরিচিত, তাঁদের আটকানোর কোনো ক্ষমতা ব্যাংকগুলোর মোটেও নেই। অসীম আর্থিক ক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে তাঁরা একদিকে অর্থঋণ আদালতের রায়গুলোকে উচ্চতর আদালতে রিট করে আটকে দিচ্ছেন, অন্যদিকে বছরের পর বছর খেলাপি ঋণের ওপর স্থগিতাদেশ নিয়ে তা শোধ করছেন না। ফলে নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বড় ও চিহ্নিত ঋণখেলাপিদের আটকানো যাচ্ছে না।

প্রথম আলো: এমনিতে মামলা করেও খেলাপি ঋণ আদায় করা যাচ্ছে না। নির্বাচনের আগেও এখন সেই সুযোগ মিলছে না। তাহলে খেলাপি ঋণ আদায়ে আর কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে বলে মনে করেন?

মইনুল ইসলাম: নির্বাচনের সময় ঋণখেলাপিদের ঋণ আদায়কে সুযোগ মনে করি না। কারণ, বড় বড় ঋণখেলাপির সবাই খুব ধুরন্ধর ব্যক্তি। তাঁরা জানেন কোন কায়দা অবলম্বন করলে ঋণ শোধ না করেও খেলাপি ঋণ থেকে পার পাওয়া যাবে। সত্যিকারভাবে যদি তাঁদের কাছ থেকে ঋণ আদায় করতে হয়, তাহলে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। রতিটি ব্যাংকের শীর্ষ দশ খেলাপির বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার করে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ঋণখেলাপিদের দেশে-বিদেশে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নজির তৈরি করতে হবে। এ রকম শাস্তির দৃষ্টান্ত স্থাপন করা না হলে কোনোভাবেই খেলাপি ঋণ আদায় করা যাবে না।

প্রথম আলো: রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কোনো সরকার ট্রাইব্যুনাল গঠন করবে বলে আপনার বিশ্বাস হয়?

মইনুল ইসলাম: সরকার চাইলে অধ্যাদেশ জারি করতে পারে।  বর্তমান সরকার করেনি, আগের সরকারগুলোরও করেনি।  কারণ, তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা ইচ্ছাকৃত খেলাপি হয়ে আছেন। তাঁরা ব্যাংকের ঋণ শোধ করবেন না। ঋণের অর্থ তাঁরা বিদেশে পাচার করেছেন। বাংলাদেশে আমরা যেটাকে খেলাপি ঋণ বলি, সেটা পুঁজি হিসেবে পাচার হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চলে যাচ্ছে। এ সমস্যার সমাধানে রাজনৈতিক দলগুলোর  নির্বাচনী ইশতেহারে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার চাই।  দলগুলো যদি সুস্পষ্টভাবে অঙ্গীকার করে যে প্রতিটি ব্যাংকের শীর্ষ দশ ঋণখেলাপিকে বিচারের আওতায় আনতে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হবে, তাহলে আমরা বুঝে নেব এ বিষয়ে দলগুলোর সদিচ্ছা আছে।

প্রথম আলো: প্রার্থীদের হলফনামায় স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের যেসব তথ্য প্রকাশিত হচ্ছে, তার সঙ্গে সাধারণ মানুষের অনুমানের মিল নেই। হলফনামার তথ্য যাচাই করলে আসল তথ্য বেরিয়ে আসবে?

মইনুল ইসলাম: হলফনামায় কোনো দিন প্রার্থীরা কালোটাকার কোনো হিসাব প্রদর্শন করবেন না। ফলে হলফনামার মাধ্যমে প্রার্থীদের প্রকৃত সম্পদের হদিস পাওয়া যাবে না। দেশে যেসব ধনাঢ্য ব্যক্তি আছেন, তাঁদের বেশির ভাগের অর্থ হলো কালোটাকা। তাঁদের ধরার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী না করলে এই কালোটাকার সন্ধান পাওয়া যাবে না।

প্রথম আলো: নির্বাচনের বছরে দেশ থেকে অর্থ পাচার বেড়ে যায়। সেটি কেন?

মইনুল ইসলাম: শুধু নির্বাচনের বছরে নয়, বাংলাদেশ থেকে সব সময় পুঁজি পাচার হচ্ছে। হুন্ডি ব্যবস্থায় প্রবাসীরা দেশে টাকা পাঠানোর কারণে পুঁজি পাচার এখন সহজ। যে পরিমাণ টাকা হুন্ডির মাধ্যমে পাঠানো হয়, সেই পরিমাণ টাকা পাচার হচ্ছে। প্রবাসীরা বিদেশে হুন্ডির অর্থ পরিশোধ করছেন। দেশে হুন্ডি ব্যবসায়ীরা সেই টাকা প্রবাসীদের পরিবারের হাতে তুলে দিচ্ছেন। দেশে যে টাকা তুলে দেওয়া হচ্ছে, তা ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত কালোটাকা। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হিসাবে, প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে ৯০০ কোটি ডলার পুঁজি পাচার হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতি প্রতিবছর ৯০০ কোটি ডলার বৈদেশিক মুদ্রা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই অর্থ যদি দেশে থাকত তাহলে বিনিয়োগে গতিশীলতা বাড়ত। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার দেড় থেকে দুই শতাংশ বাড়ত। প্রথম আলো: নির্বাচনের বছরে অস্থিতিশীলতার আশঙ্কায় দেশে বিনিয়োগ কমে যায়। এটা কেন হয় বলে মনে করেন আপনি?

মইনুল ইসলাম: বাংলাদেশের মতো দেশে নির্বাচনের বছরে নির্বাচনকে ঘিরে একটা অনিশ্চয়তা থাকে। এ কারণেই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার আশঙ্কায় নির্বাচনের আগে-পরে বিনিয়োগ কম হয়। তবে এবার রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তা দূরীভূত হয়েছে। এবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে। তবে সত্যিকারভাবে যদি জনগণ উৎসাহের সঙ্গে ভোট দিতে পারে, তাহলে পেশিশক্তির মাধ্যমে কোনো এক পক্ষ নির্বাচনে জালিয়াতি করবে—সেই আশঙ্কাও কমে যাবে। রাজনৈতিক সংঘাত না হলে বিনিয়োগে অনিশ্চয়তাও কেটে যাবে। তখন বৈদেশিক বিনিয়োগের গতিধারা আরও জোরালো হবে। নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতিতে সংঘাত না হলে বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।

প্রথম আলো: নির্বাচনে অংশগ্রহণে আগ্রহী প্রার্থীদের হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, রাজনীতিবিদেরা এখন মাছ চাষ ছেড়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ দেখাচ্ছেন। এটা কেন করছেন তাঁরা?

মইনুল ইসলাম: মাছ চাষে রাজনীতিবিদদের বিনিয়োগের যে চেষ্টা শুরু হয়েছিল, তা ছিল মূলত কালোটাকা লুকানোর হাস্যকর চেষ্টা। মৎস্য খাত বেছে নেওয়ার কারণ হলো, পানির নিচে কত মাছ আছে সেটা তো আর কেউ পরীক্ষা করতে পারবে না। তবে কর সুবিধা তুলে নেওয়ার পর তাঁরা এখন শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ বাড়িয়েছেন। কারণ, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে যে মূলধনি মুনাফা, তা এখনো করমুক্ত। এবারও রাজনীতিবিদদের মধ্যে অনেক মৎস্য ব্যবসায়ী আছেন। তবে অনেকের আয় এত বেড়ে গেছে যে মৎস্য ব্যবসা দিয়ে পুরোটা দেখানো যাচ্ছে না। এ জন্যই শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ দেখানো হয়েছে। শেয়ারবাজারে রাজনীতিবিদদের প্রকৃত বিনিয়োগ কত, তাও জানার পদ্ধতি বা সুযোগ নেই বললেই চলে।