প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শ্যামসুন্দর সিকদার : ডিজিটাল না এনালগ?

অসীম সাহা : শিল্প কখনো সমান্তরাল পথে চলে না। সব সময়ই তাকে বাঁকা-চোরা পথে হাঁটতে হয়। আর সেই পথে হাঁটতে হাঁটতেই তাকে শিল্পঋদ্ধির দিগন্তে পৌঁছুতে হয়। যিনি তা পারেন, তিনি হয়ে ওঠেন স্রষ্টা। আর যিনি পারেন না, মহাকাল তাকে সময়ের ঘূর্ণিপাকের অতলে ডুবিয়ে দেয়। বিশেষত কবিতা যেহেতু সব সময় একটি সরু সময়ের সুতোর ওপর দিয়ে হাঁটতে বাধ্য করে, তাই তাকে হতে হয় সতর্ক ও অতিসাবধানী। তা না হলে এ জগৎ থেকে ছিটকে পড়ার সম্ভাবনাই থাকে বেশি! যেহেতু কবিতার কোনো একক কিংবা নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারিত হয়নি, তাই কবিতাকে নানা পরিপ্রেক্ষিত থেকে বিবেচনা করার সুযোগ থাকে।

কথাগুলো মনে হলো কবি শ্যামসুন্দর সিকদারের নতুন কবিতার বই ‘নীল খামে ডিজিটাল ভালবাসা’ পড়তে গিয়ে। নামের মধ্যেই একটি অতিআধুনিক ধারণার সূচনা করে তিনি তার কবিগুলোকে সেই ছাঁচে ফেলার চেষ্টা করেছেন! কিন্তু শিরোনামে তিনি যতোটা ডিজিটাল, অন্তর্গত অনুভবে কিন্তু ততোটা নন। সেখানে আধুনিক কবিতার মৌলিক প্রবাহকে তিনি ডিজিটালখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করলেও তার কবিতা কিন্তু বাংলা কবিতার ঐতিহ্যের পরম্পরায় প্রেম, বিরহ এবং বেদনা-মধুর আকুলতার প্রকাশেই এখনো অনেকটাই এনালগ হয়ে আছে। তার মানে এই নয় যে তিনি এনালগ প্রপঞ্চের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ করে রেখেছেন!! তিনি যখন বলেন :

শুধু তুমি আর আমি

দুজনে একান্তে উপভোগ করবো দিগন্তের জলসীমার সন্ধিস্থল

দুদিকে দেখবো কী চমৎকারভাবে সূর্য ছড়ায় জ্যোতি

সূর্যের তির্যক আলো হাসতে হাসতে পৃথিবীর হৃদযন্ত্রে

যন্ত্রণার দাগ দেয় মুছে।

[এক পশলা উর্বর বৃষ্টি]

তখন নির্মাণকলায় একজন আধুনিকতা কিংবা ডিজিটাল মানসিকতাসম্পন্ন কবির ঘনসন্নিবিষ্ট উচ্চারণ তার অক্ষুণ কাব্যকরণকুশলতার দক্ষতাকেই স্পষ্ট করে তোলে!!

শ্যামসুন্দর কবিতা লিখছেন অনেকদিন ধরেই। তার কবিতার ধারাবাহিকতা লক্ষ করলে বোঝা যাবে, তিনি ক্রমশ নিজেই নিজেকে অতিক্রম করার চেষ্টা করেছেন। প্রকৃতপক্ষে এটাই হওয়া উচিত কবির কাব্য-অভিসারের মূল লক্ষ্য। এতে কবির দিগভ্রষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। ফলে কবিতার মধ্যে যে বাঁকবদলের সুযোগ থাকে, তাকে কবি কখনো পরিপূর্ণভাবে, কখনো বা আংশিকভাবে কাজে লাগাতে পারলেও একটি কবিতা হয়ে উঠতে পারে শিল্পের অনুরাগে আবেগাপ্লুত। যখন শ্যামসুন্দর বলেন :

দেখি কপোত-কপোতী যায় অন্য পথে নীল গগনে গোপন বিলাসে

মলিন বদনে নির্ঝঞ্ঝাট সময়ের অপেক্ষায় থাকে জল আর

সমুদ্রের স্বাধীন বাতাস

[এক পশলা উর্বর বৃষ্টি]

তখন তার কবিতা বর্ণনা (Description) অবয়ব অতিক্রম করে এমন একটি ব্যঞ্জনা তৈরি করে, যা শিল্পের স্বাভাবিক শর্ত পূরণ করেও হয়ে ওঠে শিল্পমাধুরীর গভীরতর আধার!

শ্যামসুন্দরের এই গ্রন্থে ভালোবাসা প্রধান স্থান দখল করে আছে। সেই ভালোবাসা ডিজিটাল হতে গিয়েও প্রধানত হয়ে উঠেছে আর্ত-আকুলতার কিংবা বিরহ-ব্যাকুলতার ঘনীভূত আবেগে হিরণয়!!! কারণ যে কবির অন্তরে নিরন্তর আবেগের ঢেউ খেলা করে এবং সেই অন্তরকে তিনি এসিডে পুড়িয়ে খাটি সোনা বানাতে চান, তিনি তো তা হলে কবিতার শিল্পমান্যতাকে অক্ষুণ রেখেই তার সৃষ্টিকে মহিমান্বিত করার চেষ্টা করেন!

কবি ডিজিটাল ভালোবাসার স্বরূপ কী, কোথাও তা বলেননি। আমরা কি ধরে নেবো, তিনি চান এমন এক ভালোবাসা, যা সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকবে অনেক অনেক বেশি, যা কবিকে স্বপ্ন দেখাতে ভালোবাসবে এবং তার অনুসন্ধানে নিজেকে নিয়োজিত করবে দক্ষ শিকারির মতো? যার ফলে একসময় তার ভালাবাসা উচ্চতর প্রেমে পরিণত হয়ে তাকে পৌঁছে দেবে অমৃতলোকে? শীতের সময় অতিথি পাখিরা এসে বলবে, “এসো আমরা সুখের সঙ্গে দলবদল করি।”

কিন্তু কবির ‘সাইবার ক্রাইম’ কবিতায় তিনি যে সত্যটি উচ্চারণ করেন, তা শুধু তার কথা না হয়ে প্রেমিকের হৃদয়ের কথা হয়ে ওঠে। কমপিউটারের মুখগ্রন্থে প্রতিনিয়ত যুবক-যুবতীর মধ্যে যে সংযোগমূলক সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তা সব সময় প্রেমিকের পক্ষে প্রকাশ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। কারণ তার পেছনে থাকে সাইবার ক্রাইম অ্যাকটের ভয়, যার শাস্তি একেবারে ন্যূনতম নয়! ইচ্ছেকে চেপে রেখে “তাই সুবোধ বালকের মতো নিষ্পাপ” থাকতে হয়। ডিজিটাল ভালোবাসার পরিণাম বোধহয় এখানেই!

কিন্তু এ ধরনের কবিতায় কবির নিমগ্নতা যতোটা, তার চেয়ে অনেক বেশি শাশ্বত ভালোবাসায়। তাই প্রেম ও প্রকৃতি তার কবিতায় একীভূত হয়ে গিয়ে এক নতুন ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে। নারীর খোঁপায় কদমফুলের শোভা পাওয়ার মধ্য দিয়ে প্রকৃতি উঠে আসে মানুষের শরীরী রূপের মধ্যে। কিন্তু এ-কারণেই কি কবিকে কখনো কখনো ভালোবাসাকে মর্টগেজ দিতে হয়? এর মধ্য দিয়ে কি কবির সুখের মিলনের পথে অন্তরায় সৃষ্টি হয়? যান্ত্রিক হয়ে ওঠে কবির হৃদয়?

সে-জন্যেই কি কবির “মনের ভেতরে কর্মকা- হয় দৃশ্যত গোপনে/লেনদেন হয় অদৃশ্য অনলাইনে?” এখানে এসে কি কবি প্রমাণ করার চেষ্টা করেন তার ডিজিটাল ভালোবাসার সার্থকতা?

কিন্তু মন যেখানে অনুভূতির অনুগত, সেখানে চাইলেই কি মনকে মর্টগেজ দেয়া যায়? তা হলে স্নিগ্ধ ও সিক্ত মেঘের আড়ালে কেন লুকিয়ে থাকে প্রেম? কেন কবি আড়ালে থাকা প্রেমকে না দেখতে পেয়ে প্রশ্নকাতর আবেগে বলে ওঠেন “মাঝে মাঝে দেখি তোমায়, আবার কেন যে আড়ালে যাও?” কিন্তু প্রেমের প্রতিজ্ঞা যার হৃদয়ে আকুল, সে ফের দৃঢ়তার সঙ্গেই চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে পারে, “চাঁদের অলোর সাধ্য নেই তাকে দূর নিবাসে রাখে?” কিন্তু এই দৃঢ় উচ্চারণ আর দৃঢ় থাকে না। প্রেমিক বলেই শেষপর্যন্ত তার চ্যালেঞ্জ, চ্যালেঞ্জ না থেকে কোমল স্নিগ্ধতায় শুধুই প্রশ্ন হয়ে ওঠে! আর চাঁদ নিরবে দেখে সময়ের প্রবহমানতা। কিন্তু তাতে কি কবি থেমে যান? তা হলে কেন তিনি ভালাবাসার তীর্থভূমিতে দরোজা খুলে রাখার কখা দ্বিধাহীন চিত্তে প্রকাশ করেন? কেন বলেন :

খোলা আছে দুয়ার

ইচ্ছে হলে যেতে পারো লাল গোলাপের কাছে

কিংবা কৃষ্ণচূড়ার ছায়াতলে

ভালোবাসার তীর্থভূমিতে!

[ভালোবাসার তীর্থভূমিতে]

আসলে এইসব প্রশ্নের উত্তর কবি শ্যামসুন্দরের কবিতার অন্তর্নিহিত অনুভবের মধ্যেই শিকড় প্রোথিত করে আছে। কবির নির্মাণকাঠামোতে যেমন, তেমনি তার অন্তর্গত অনুভবে ভালোবাসাকেই জীবনের মূলীভূত সারাৎসার হিসেবে গ্রহণ করে নিবিড় আত্মমগ্নতায় পঙ্ক্তির পর পঙ্ক্তি রচনা করেছেন। কিন্তু সেই গতিপথে তিনি কি কখনো হোঁচট খেয়ে পড়েননি? পড়েছেন। বিশেষত অন্ত্যমিলযুক্ত কবিতায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে অসমমাত্রিক কিংবা অর্ধমাত্রিক বিভ্রমের কাছে পরাজিত হয়েছেন। অতিমাত্রায়া বানান ভুলের ঘেরাটোপে বন্দি হতে বাধ্য হয়েছেন! কবিতায় ছন্দোভ্রান্তি কিংবা বানান ভুল অনেক সময় কবিতার আত্মার ক্রন্দনকে তীব্র করে তোলে। এতে কবিকে ভুল বোঝার অবকাশ থাকে। কবি ভবিষ্যতে এদিকটায় সতর্ক নজরদারি রাখলে এই ভ্রান্তি নিশ্চয়ই দূর হবে।তবে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, এই দিকটি বাদ দিলে কবি শ্যামসুন্দর সিকদার একটি মৌলিক শর্ত পূরণ করার চেষ্টা করেছেন, যা একজন কবির জন্য জরুরি। আর তা হলো কবিতাকে মুখব্যাদান করতে না দিয়ে তাকে কখনো কখনো অন্তরালের রহস্যময়তার ঘেরাটোপে বন্দি করতে সক্ষম হয়েছেন। কবির কাজ কবিতার কংকাল প্রদর্শন নয়, রক্ত-মাংসসহ একটি রহস্যময় অবয়ব উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে পাঠকের মনোজগৎকে ঘনঘোর আবেশের মধ্যে রাখাই তার কাজ। এদিক থেকে কবি শ্যামসুন্দর সিকদার যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। ‘প্রশ্ন তোমার কাছে’, ‘জল চাই, আগুন কেন দাও’, ‘তোমার আমার পথচলা’, ‘সমুদ্রপারে ফিরে দেখা’, ‘বৃষ্টি এবং তুমি’ প্রভৃতি কবিতার সহজ প্রকাশের মধ্যেও একটি গূঢ় তাৎপর্য আমাদের আবিষ্ট করে। কবিতা দিয়ে পাঠককে আবিষ্ট করা সহজ কাজ নয়। সে-কাজে কবি হিসেবে শ্যামসুন্দর সিকদার সফল হয়েছেন, এটাও একজন কবির জন্যে কম কথা নয়।

বস্তুত সার্বিক বিবেচনায় নির্মাণকাঠামোতে অক্ষরমাত্রিক প্রবহমানতায় এবং শব্দব্যবহারের অসতর্কতা কিছুটা পীড়াদায়ক হলেও তিনি যে একজন কবি এবং শুধুই কবি, সে-ব্যাপারে আমার কোনো সংশয় নেই। আমি তার কবিতার অভিযাত্রায় সাহসী নাবিকের নির্ভীক পদচারণা কামনা করি।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত