প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নওগাঁয় মজুরি কম হওয়ায় পেশা বদলাচ্ছে চালকল শ্রমিকরা

নওগাঁ প্রতিনিধি: উত্তরাঞ্চলের মধ্যে শষ্য ভান্ডার হিসেবে খ্যাত নওগাঁ। ব্যাপক ধান উৎপাদন জেলা হিসেবে পরিচিত। জেলায় ধান উৎপাদন হওয়ায় এটিকে কেন্দ্র করে এক সময় ব্যাপক চালকল গড়ে উঠেছিল। আর এসব চালকলে প্রচুর শ্রমিক কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে আজ কমছে চালকলের সংখ্যা। শ্রমিকরাও ভিন্ন পেশা বেছে নিচ্ছেন। চালকল বন্ধ হওয়ার পেছনেও বেশ কিছু কারণও রয়েছে বলে জানিয়েছেন চালকল মালিকরা।

নওগাঁ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয় ও চালকল মালিকদের সূত্রে জানা গেছে, খাদ্যে উদ্বৃত্ত জেলা হওয়ায় প্রতি বছর প্রায় ১৬ লাখ মেট্রিকটন খাদ্য উৎপাদন হয়ে থাকে। এরমধ্যে ১২ লাখ মেট্রিকটন রাজধানী, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। জেলায় ১ হাজার ২৮০টি চালকল রয়েছে। এর মধ্যে ৫৫টি অটোরাইচ মিল এবং বাঁকিগুলো হাসকিং মিল। হাসকিং মিলগুলো সারা বছর চাল উৎপাদন করতে পারে না। শুধু মাত্র ধান কাটা মাড়াইয়ের সময় মাত্র তিন/চার মাস চালু থাকে। বাঁকি সময় এই মিলগুলো বন্ধ থাকে।

জানাগেছে, লাভের আশায় চালকল তৈরী করেছিলেন চালকল মালিকরা। বিগত কয়েক বছর থেকে লোকসান গুনতে গুনতে চালকল মালিকরা এখন ঋণগ্রস্থ হয়ে পড়েছেন। বাধ্য হয়ে তারা চালকল বন্ধ করে দিচ্ছেন। অপরদিকে বাজার থেকে বেশি দামে ধান কিনে চাল উৎপাদনের পর চাল বিক্রি করতে গিয়ে লোকসানে পড়তে হচ্ছে। তবে সরকারি খাদ্য গুদামে চাল সরবরাহ করায় কিছুটা লাভের মুখ দেখলেও সব চালকল মালিকের পক্ষে সারা বছর চাতাল চালু রাখা সম্ভব হয়না। অনেক চালকল মালিক তাদের চাতাল বিক্রি করে দিয়েছেন। অনেকে আবার চাতাল ভাড়া দিয়েছেন। সেসব চাতালে এখন প্লাস্টিক ফ্যাক্টরি ও গো-খাদ্য উৎপাদন করা হচ্ছে।

আবার হাসকিং চালকল মালিকরা অটো রাইচ মিলের সাথে প্রতিযোগীতায় টিকতে পারেন না। অটো রাইচ মিলে স্বল্প সময়ে ও কম শ্রমিক দিয়ে ভাল মানের অধিক চাল উৎপাদন করতে পারে। কিন্তু হাসকিং মিলের শ্রমিকের সংখ্যা ও সময় বেশি এবং ভাল মানের চাল উৎপাদন সম্ভব হয়না। হাসকিং মিলে বিশেষ করে চাতালে ধান শুকানো আবহাওয়ার উপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। তাই একদিকে বাড়ছে অটো রাইচ মিল। অপরদিকে কমছে হাসকিং মিল। আর যেসব হাসকিং মিল চালু আছে খুব কষ্ট করে ধরে রাখা হয়েছে।

চালকল গুলোতে নারী শ্রমিকদের সংখ্যাই বেশি। নারী শ্রমিকদের মজুরি কম হওয়ায় চালকল মালিকদের আগ্রহও থাকে বেশি। এসব শ্রমিকদের মাসিক নির্দিষ্ট কোন বেতন থাকেনা। কাজের উপর মজুরি। বিগত ৮-১০ বছর আগে প্রতি চাতালে ২০০ মণ ধান শুকানো ও ভাঙার পর প্রতি কেজিতে ১ টাকা এবং খুদ (ভাঙা চাল) ৬০ কেজি করে দেয়া হতো। এতে শ্রমিকরা যে টাকা পেতেন তা দিয়ে দিব্যি সংসারের খরচ চালাতে পারতেন। বর্তমানে ওই পরিমাণ ধান শুকানো ও ভাঙার পর ৫০০ টাকা ও ৫০ কেজি চাল দেয়া হয়। কিন্তু বর্তমানে নিত্যপন্যের জিনিসপত্রের দাম বেশি হওয়ায় আগের মতো আর সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছেনা। ২০০ মণ ধারণ ক্ষমতার একটি চাতালে ৫/৬ জন নারী ও ১/২ জন পুরুষ শ্রমিক কাজ করেন।

চাতাল শ্রমিকদের ঈদ-উল-ফিতরে মহিলাদের দেয়া হয় একটি শাড়ি ও ব্লাউজ পিচ। দুই ঈদে ছুটি দেয়া হয় ১৬ দিন। বছর শেষে ১ হাজার ৫শ’ টাকা করে হাতে ধরিয়ে দেয়া হয় শর্তসাপেক্ষে। যদি কেউ পুনরায় চাতালে কাজ করতে চান তাকে এ টাকা দেয়া হয়। চৈত্র ও ফাল্গুন মাসে চাতাল শ্রমিকদের তেমন কাজ না থাকায় বাড়িতে তাদের বসে বসে সময় পার করতে হয়। আর এ সময়টা তাদের কষ্ট করে পার করতে হয় পরিবার পরিজন নিয়ে।

চালকলে নারী শ্রমিকরা অধিকাংশ স্বামী পরিত্যক্তা ও বিধবা। তাই নিরুপায় হয়ে চালকলে তারা কাজ করে থাকেন। তবে এসব শ্রমিকরা চালকলে কাজ করতে গিয়ে ছোট ঘরে (খুপড়ি) আলো-বাতাস কম, প্রচন্ড গরমে কষ্ট করে থাকতে হয়। ফলে অধিকাংশ শ্রমিকরা অসুস্থতায় ভোগেন। আবার খাবারও স্বাস্থ্য সম্মত না।

মান্দার শহরবাড়ি শাহেরা বিবি। গত ১০ বছর আগে স্বামী ডায়রিয়া হয়ে মারা যান। দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছিলেন। স্বামীর বড় ভাই (ভাসুর) এর পরামর্শে চালকলে কাজ শুরু করেন। তিনি বলেন, চালকলে কাজ করে ও প্রতিবেশীদের সহযোগীতায় দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। চাতালে কষ্ট করে কাজ করতে হয়। সারা বছর চাতাল চলে না। কাজ করলে টাকা পাওয়া যায়। বৈশাখ ও জৈষ্ঠ্য মাসে ৩/৪ দিনে চাতাল উঠে। আশ্বিন ও কার্তিক মাসে ৬/৮ দিন, অগ্রহায়ণ ও পৌষ ১০/১২ দিন সময় লাগে চাতাল উঠতে। বর্ষা মৌসুমে চাতাল দেরীতে উঠে। সময় বেশি লাগে।

সদর উপজেলার উল্লাসপুর গ্রামের মরিয়ম বেওয়া বলেন, গত ১০/১২ বছর থেকে চাতালে কাজ করছি। তখন ২০০ মন ধান শুকানো ও ভাঙতে ১ টাকা মন এবং চাউল ৬০ কেজি চাউল পাওয়া যেত। ১০০ টাকার বাজার করলে এক সপ্তাহ চলে যেতো। আর এখন ২০০ মন ধান ভাঙলে ৫০০ টাকা ও ৫০ কেজি চাউল পাওয়া যায়। এছাড়া নারী শ্রমিকদের দামও কম। অপরদিকে বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেশি হওয়ায় কুলাতে পারিনা। চাতালে ছোট ঘরগুলোতে থাকতেও কষ্ট হয়। অন্যকোন কাজ থাকায় চাতালে কাজ করি। আর চাতালে কাজ করলে ভাতের কস্ট থাকে না।

গত ২০ বছর থেকে চাতালে কাজ করছেন সদর উপজেলার মশরপুর গ্রামের শ্রমিক ইয়াসিন আলী (৫০)। তিনি বলেন, আগে দেড় হাজার টাকা মাসিক বেতনে চাতালে কাজ করতাম। কোন সমস্যা হতোনা। আর এখন ৬ হাজার টাকা মাসে বেতন পাই। তারপরও হচ্ছে না। বাজারের জিনিসপত্রের দাম এতোটাই বেশি যা আমাদের মতো দিনমজুরের সাধ্যের বাহিরে। আগে বহু মানুষ চাতালে কাজ করত। কিন্তু এখন অনেক কমে গেছে। অন্য পেশায় চলে গেছে এবং আরো যাচ্ছে। নেহায়েত বাধ্য হয়ে অনেকে চাতালে কাজ করছে।

নওগাঁ জেলা ধান্য বয়লার ও অটোশার্টার শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মোজাফ্ফর হোসেন বলেন, জেলায় চাউল কলে শ্রমিকের সংখ্যা ৪৫ হাজার ৮৬৬ জন। এরমধ্যে মহিলা ২৭ হাজার ২২০ জন এবং পুরুষ ১৮ হাজার ৬৪৬ জন। শ্রমিকদের মজুরি কম। কিন্তু কাজ বেশি। ফলে তাদের স্বল্প টাকায় পোশায় না। এছাড়া অনেক চাউল কল এখন বন্ধের পথে। প্রয়োজনীয় তুলনায় মজুরি কম হওয়ায় শ্রমিকরাও এখন ভিন্ন পেশা বেছে নিচ্ছে।

নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারন সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, জেলার প্রায় সাড়ে ৯শ চালকলের উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। চাল উৎপাদন বন্ধ থাকায় ব্যাংক থেকে নেয়া প্রায় ৫শ’ কোটি টাকা ঋণের বোঝা চেপেছে ব্যবসায়ীদের কাঁধে। ফলে ব্যাংকঋণ পরিশোধ করা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ ধান চালের মজুত থাকার পরও বাইরে থেকে চাল আমদানীর কারণে দেশের চালকলগুলো এখন লোকসান গুনছে। সেই সাথে কৃষকরাও ধানের নায্যমুল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। কৃষিভিত্তিক শিল্প কলকারখানাকে রক্ষা করতে চাল আমদানি বন্ধ ও ব্যাংক ঋণের সুদের হার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ করা প্রয়োজন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ