প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মোয়া বিক্রেতা কামরুলের ‘মুখমিঠা’ কথা

বিভুরঞ্জন সরকার : ছোটবেলায় দেখতাম গ্রামে প্রায় সব বাড়িতে মোয়া তৈরি হয়। ঘরে বানানো মুড়ি বা চিড়ার মোয়া ছেলে-বুড়ো সবারই প্রিয় খাবার ছিল । বাড়িতে অতিথি এলে আপ্যায়নের সহজ উপকরণ ছিল মোয়া। বাচ্চা-কাচ্চা কান্নাকাটি করলে হাতে ধরিয়ে দেওয়া হতো মোয়া। বাড়িতেই মুড়ি ভাজা হতো, চিড়া কোটা হতো, তারপর গুড় জ্বাল দিয়ে ঘন সিরা তৈরি করে মুড়ি বা চিড়ায় মাখিয়ে হাতের দুই তালুতে নিয়ে বিশেষভাবে তৈরি হতো গোল গোল মোয়া। মা-দিদারাই এটা করতেন। অতি সহজে সুন্দর এই ‘জলখাবার’টি তৈরি করা যেতো বলে ঘরে ঘরে এর কদর ছিলো । মোয়ার সহজ লভ্যতার কারণেই হয়তো বাংলা ভাষায় ‘ছেলের হাতের মোয়া’ বাগধারাটি চালু হয়েছে।

না, এখন মোয়া আর সহজলভ্য নেই। গ্রামের বাড়িতেও অতিথির হাতে এখন আর সেভাবে মোয়া কিংবা বাতাসা তুলে দেওয়া হয় না। পূজা-পার্বণ বা বিশেষ উপলক্ষ ছাড়া সেভাবে মোয়া তৈরি হয় না। নানা ধরনের প্যাকেটজাত তৈরি খাবার এখন প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পৌঁছে গেছে। তাই বলে মোয়া একেবারে ওঠে গেছে তা নয়। ঢাকায় এখন মোয়া বিক্রি হয়। বাণিজ্যিকভাবে মোয়া তৈরি করে এবং তা বিক্রি করে অনেকে জীবিকা নির্বাহ করেন। মোয়া এখন আর হাতে বানানো হয় না। ঢাকার মুগদাসহ কয়েকটি এলাকায় মোয়া তৈরির ‘কারখানা’ হয়েছে। মুড়ি ও চিড়ার মোয়া তৈরির ডাইস আছে।

বড় বড় দোকানে যেমন ডজন হিসেবে মোয়া কিনতে পাওয়া যায়, তেমনি ফেরি করেও অনেকে মোয়া বিক্রি করে। আমার সঙ্গে একজন মোয়া বিক্রেতার পরিচয় হয়েছে রমনা পার্কে হাঁটতে গিয়ে। রমনা পার্কের বাইরে প্রাতঃভ্রমণকারীদের সুবিধার জন্য নানা পণ্যের রীতিমতো বাজার বসে। সবজি, ফলমূল, মাছ, কাপড়, পিঠা, ডাব ইত্যাদি হরেকরকম জিনিসপত্র কিছুটা সস্তা দামেই পাওয়া যায়। পূর্ব দিকের প্রবেশ পথের বাইরে মোয়া নিয়ে বসেন একজন। দুটি প্লাস্টিকের বড় বস্তায় মোয়া নিয়ে ভোরের আলো ফোটার আগেই এসে বসেন কামরুল। এক বস্তায় মুড়ির মোয়া, এক বস্তায় চিড়ার। প্রতি ডজন মোয়ার দাম ৪০ টাকা। কেউ পরিমাণে একটু বেশি কিনলে ৩৫ টাকা ডজনও দেন। স্থায়ী দোকানে নাকি ৬০ ডজন।

কামরুলের বাড়ি হবিগঞ্জে। পরিবার সেখানেই থাকেন। একবারে ছোট পরিবার নয়। মোট আট সদস্যের সংসার। কামরুল কয়েক মাস গ্রামে কৃষিকাজ করেন। যখন কৃষিকাজ থাকে না তখন ঢাকায় এসে মোয়া বিক্রি করেন। হঠাৎ অন্য কিছু না করে মোয়া বিক্রির ‘আইডিয়া’ মাথায় এলো কীভাবে? এই প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে কামরুল একটু ইতস্তত করেন। বলেন, দেখলাম ঢাকা শহরে সব কিছুই বিক্রি হয়। আমি মানুষের মুখ মিঠা করার একটি জিনিস বিক্রি করি, আর কি!

কত টাকা আয় হয় প্রতিদিন? আমার এই প্রশ্নের জবাব দেওয়ার আগে কামরুল আমাকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। বলেন, ‘ভাই কি পুলিশের লোক? যদি হইয়া থাকেন তাইলে ‘কিছু’ নিয়া আমারে মাফ কইরা দ্যান’। আমি জানতে চাই, পুলিশকে নিয়মিত ‘কিছু’ দিতে হয়? হ, মাঝেমধ্যে হাতে কিছু ‘গুইজা’ না দিলে বইতে দেয় না। দাবড়ায় বলে জানালেন কামরুল।

আমি আমার উদ্দেশ্যের কথা বলি। তাকে নিয়ে, তার মোয়া ব্যবসা নিয়ে পত্রিকায় কিছু লিখতে চাই শুনে তিনি কী বুঝলেন তা আমি বুঝলেন না। তবে তার মুখ থেকে যে বাক্যটি বের হলো সেটা আমি স্পষ্ট শুনলাম। ‘কতো মাইনষের যে কতো ‘ধান্দা’। তার কথা গা না মেখে আমি জানতে চাই, বলেন না, কেমন আয় রোজগার হয় প্রতিদিন।

তিনি আমার গোবেচারা ভাব দেখে একটু সদয় হন এবং বলেন, ভাই, সত্য কথাই কই। আপনি তো আমার ‘হক’ কাইড়া নিবেন না। দিনে ৪-৬শ টাকা লাভ থাকে।

সারাদিন মোয়া বিক্রি করেন না কামরুল। দুপুরের পর অন্য ‘কাম’ করেন। কী কাম জানতে চাইলে বললেন, সব ‘গুমর’ কইতে নাই। আমিও আর পীড়াপীড়ি করি না। শেষে বলি আপনার একটি ছবি নেই? একটু সলজ্জ হাসি দিয়ে কামরুল বলেন, আমার চেহারা বালা না।
আমি মেবাইলে ক্লিক করি আর বলি, আপনি জানেন, আমাদের দেশের খাদ্যমন্ত্রীর নাম কি?
তিনি মাথা নেড়ে বলেন, জানি না।
আমি বলি কামরুল ইসলাম।
তিনি হাসেন। বলেন, শরম দিলেন। কই মন্ত্রী আর কই আমি?
আমি মনে মনে ভাবি, কারো কারো জন্য মন্ত্রিত্বও তো ছেলের হাতের মোয়া। নয় কি?

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ