প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

পিইসি পরীক্ষা নিয়ে যা চলছে

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : ২০০৯ সালে পঞ্চম শ্রেণি থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) পরীক্ষা চালু হয়েছে। সরকারের উদ্দেশ্য মহৎ ছিলো। কেননা দীর্ঘদিন থেকে দেশে পঞ্চম শ্রেণি শেষে শিক্ষার্থীরা বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার সুযোগ পেতো। এতে স্কুলগুলো অপেক্ষাকৃত মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি লাভের জন্য বিশেষভাবে মনোযোগ দিতো। ফলে বাকি শিক্ষার্থীরা এই সুযোগটি পেতো না। স্কুলগুলো বৃত্তি লাভের আশায় যে কয়েকজনকে তৈরি করতো তার পেছনে স্কুলের সুনাম বৃদ্ধি এবং প্রশাসনের সুদৃষ্টি আকর্ষণ করার প্রবণতা ছিলো। কিছু কিছু স্কুল হয়তো কিছু শিক্ষার্থীকে বিশেষভাবে প্রস্তুত করার মাধ্যমে বৃত্তি লাভে সফল হতো, কিন্তু অধিকাংশ শিক্ষার্থী বছরজুড়ে শিক্ষকদের মনোযোগ বঞ্চিত হওয়ার কারণে লেখাপড়ায় পিছিয়ে পড়তো।

এই সমস্যাটি মোটেও কাম্য ছিলো না। আবার বৃত্তির সংখ্যা যে খুব বেশি ছিলো তাও নয়। এক একটি থানা বা উপজেলা থেকে গুটি কতক শিক্ষার্থী বৃত্তি পেতো। এই ধারা থেকে বের হওয়ার জন্য বর্তমান সরকার পিএসসি পরীক্ষা চালু করে যাতে সব শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করার সুযোগ লাভ করে এবং ভালো ফলাফলের মাধ্যমে বৃত্তি লাভের সুযোগ পায়। অধিকন্তু শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক শিক্ষা শেষে একটি সনদও লাভ করার সুযোগ পায়। বিষয়টি ইতিবাচক দিক থেকে দেখলে সমর্থন করার মতো। সরকার এ পর্যায়ে প্রতিবছর বৃত্তির সংখ্যাও বাড়িয়ে দেওয়ার ফলে প্রচুর শিক্ষার্থী পিএসপি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে বৃত্তিলাভ করার সুযোগ পায়। এতে অনেক শিক্ষার্থী মাধ্যমিক স্কুলে পড়াশোনা করার ক্ষেত্রে আর্থিকভাবে একধরনের সহযোগিতা লাভ করে এবং ভালো ফলাফল করার প্রণোদনাও পায়। পিইসি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে প্রাথমিক পর্যায়ে ফলাফল ভালো করার একটি সুযোগ সৃষ্টি হয়- যা তাদের মধ্যে একটি প্রতিযোগিতার মনোভাব তৈরি করারও সুযোগ করে দেয়।

প্রথমদিকে বিষয়টি ভালোই চলছিলো। কিন্তু অচিরেই এর মধ্যে নানারকম অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং সামাজিক অনভিপ্রেত প্রবণতাও বাসা বাধতে থাকে। প্রথমতো, নোটবই-গাইডবইয়ের মালিকরা পিইসি পরীক্ষাকে কেন্দ্র সব বিষয়ে গাইড বই স্কুলগুলোতে উচ্চমূল্যে বিক্রয় করার একটি বড় ধরনের ‘সিস্টেম’ তৈরি করে। এই সিস্টেমে শিক্ষকদেরকে কমবেশি প্ররোচিত করা হয়। দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের মধ্যে অনেকেই প্রতিষ্ঠানগতভাবেই পিইসির নাম করে শিক্ষার্থীদের কোচিং, মডেল টেস্ট, পরীক্ষার কেন্দ্র ফি, এডমিট কার্ড ফি ইত্যাদি নামে বেশ বড় অংকের টাকা আদায় করার একটি ‘সিস্টেম’ চালু করে ফেলেছেন। এর ফলে অধিকাংশ অভিভাবক পিইসি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে তাদের সন্তানদের জন্য বেশ বড় অংকের অর্থই ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছে। তৃতীয়ত, অভিভাবকদের মধ্যেও পিইসি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে একধরনের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির মনোবৃত্তি প্রবল হয়ে ওঠে। এর খেসারত দিতে হচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের। বেশির ভাগ অভিভাবকেই শিক্ষার্থীদের খাওয়া দাওয়া, খেলাধুলা, বিশ্রাম ইত্যাদি প্রয়োজনীয় দিকগুলো বাদ দিয়ে তাদেরকে সার্বক্ষণিকভাবে পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বছরজুড়ে ব্যস্ত রাখার চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। এর ফলে শিক্ষার্থীরা লেখাপড়ার একধরনের যান্ত্রিকতার মধ্যে পড়ে গেছে যা তাদের মনোজগতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আসলে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় এত চাপের কোনো প্রয়োজন নেই, পরীক্ষাকেও খুব বেশি কঠিন প্রতিযোগিতামূলক ভাবার কিছু নেই। কিন্তু আমাদের শিক্ষক, অভিভাবক এবং গাইড বইয়ের মালিকরা এটিকে এখন ব্যবসা ও সামাজিক মর্যাদার বিষয়ে যেভাবে পরিণত করেছে তাতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন মোটেও আর আনন্দের বা শেখার রইলো না, সবটাই চাপিয়ে দেওয়ার বা গিলে খাওয়ার মতো হয়ে উঠেছে। সরকারকে এ ব্যাপারে অচিরেই নতুনভাবে চিন্তাভাবনা করতে হবে। ১০-১১ বছরের শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া ও পরীক্ষা নিয়ে এতো চাপাচাপি করার কিছু নেই। কিন্তু আমরা ভালো একটি চিন্তাকে কীভাবে নষ্ট করে ফেলেছি, সেটিই ভাববার বিষয়।

লেখক : অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, বাউবি

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ