প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

গণতন্ত্রে : ব্যালট না ইভিএম!

কাকলী সাহা : পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ভারতবর্ষের সম্মান অক্ষুণ রাখতে তারা গণতন্ত্রের প্রধান স্তম্ভ অর্থাৎ নির্বাচন-প্রক্রিয়া নিয়ে সর্বদাই পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে। ভারতে নির্বাচন কমিশন গঠিত হয় ২৫ শে জানুয়ারি ১৯৫০। এটি একটি স্বশাসিত সংস্থা, যা গোটা দেশের সকল নির্বাচন পরিচালনা করে থাকে। বর্তমানে ২৯টি রাজ্য ও ৭টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল নিয়ে গঠিত একটি যুক্তরাষ্ট্রিয় ব্যবস্থা রয়েছে এখানে। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে লোকসভা গঠিত হয় এবং লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে সহমত হয়ে কেন্দ্রে সরকার গড়ে কোনো একটি বা একাধিক দল। লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভার সদস্যেদের নিরিখে রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত হন। এই সদস্যরা সরাসরি জনগণের দ্বারা নির্বাচিত নন। রাজ্য বিধানসভাও পাঁচ বছর অন্তর গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ দলই রাজ্যসরকার গঠন করে থাকে।

স্বাধীনতার পর ১৯৫০ খ্রি. সংবিধান রচিত হয়। এরপর প্রথম লোকসভার জন্য সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২৫শে অক্টোবর ১৯৫১ ও ২৩শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালের মধ্যে। ৪৮৯টির মধ্যে ৩৬৪টি আসনে জয়ী হয়ে পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুর নেতৃতে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস সরকার গড়ে। তাদের প্রাপ্ত ভোট ছিলো মোট ভোটারের ৪৫%। যদিও সমগ্র দেশবাসীর ৪৪.৮% ভোটার এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলো। প্রথম সাধারণ নির্বাচনের প্রথম ভোট গৃহীত হয়েছিলো হিমাচল প্রদেশের তাহশিলে ২৫শে অক্টোবর ১৯৫১ সালে।

ব্যালট পেপারে সমস্ত প্রার্থীর বর্ণনাক্রমিক নামের তালিকা ও তার পাশে তার দল অথবা সেই ব্যক্তির প্রতীকচিহ্ন থাকতো। নির্বাচক স্বস্তিকা ছাপ দিয়ে ব্যালট পেপারটি বিধিমতো ভাঁজ করে ব্যালটবাক্সে ফেলতেন। তারপর সিল করা বাক্স কড়া পাহারায় রেখে নির্দিষ্ট দিনে খুলে গণনা করা হতো। এভাবেই প্রার্থীর ভাগ্যগণনা চলতো। একদিকে যেমন ব্যালট পেপারের ভাঁজ বা ছাপ-সংক্রান্ত কোনো ত্রুটি হলে ভোট বাতিল বলে গণ্য করা হতো, অন্যদিকে ব্যালট ব্যবহারের জন্য তার সুরক্ষাসংক্রান্ত নানা অসুবিধায় পড়তে হতো। যেমন ক্ষমতাশালী দলের প্ররোচনায় ব্যালটবাক্স ছিনতাই, বুথজ্যাম, বুথদখল, ছায়াভোট দেয়া বা রিগিং-এর অভিযোগের অভাব ছিলো না। তার সাথে ভোট নেয়া বা ভোটগণনা বেশ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার ছিলো। এমনকি ব্যালট পেপার ছাপানো ও সুরক্ষাবলয় সৃষ্টি করাও বেশ ব্যয়সাপেক্ষ ছিলো।

এসব অসুবিধার কথা মাথায় রেখে ভারতের নির্বাচন কমিশন ১৯৮২ সালে পরীক্ষামূলকভাবে কেরালার উত্তর পারাবার বিধানসভা নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করলেও মূলত ১৯৯৯ খ্রি. ভারতে ইভিএম-এর ব্যবহার প্রচলিত হয়। ২০০১ সালে সমস্ত ভোটেই ইভিএম ব্যবহারের চেষ্টা করা হয়। ভারতবর্ষে বর্তমানে সাধারণ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহৃত হলেও প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ক্ষেত্রে এখনো ব্যালট ব্যবহার অব্যাহত আছে।

তবে আধুনিকতার বিচারে ইভিএম-এর ব্যবহার বেশযুক্তিপূর্ণ। এখানে ব্যালট পেপারে ভোটের তুলনায় সময় অনেক বাঁচে। ঘটনার ক্ষেত্রেও খুব তাড়াতাড়ি ফল প্রকাশ করা যায়। আবহাওয়া বা আনুষঙ্গিক অন্যান্য  কারণে ব্যালট পেপার বা ব্যালটবক্সের তুলনায় অনেকাংশে নিরাপদ। ব্যালট পেপার ছিনতাই করে মুহূর্তের মধ্যে বুথজ্যাম ও বুথদখল করে ছাপ্পাভোট দেয়ার ঘটনা বিরল নয়। সেক্ষেত্রে ইভিএম-এ এমনভাবে প্রোগ্রামিং করা থাকে যে, মিনিটে পাঁচটার বেশি ভোট পড়া সম্ভব নয়। অর্থাৎ ইভিএম ছিনতাই করে ততোটা সুবিধা করা যায় না।

ইভিএম ব্যবহার নিয়ে নানা দেশের নানা বিচার লক্ষণীয়। যদিও ভারতের জন্য ইভিএম প্রস্তুতকারী জাপানী সংস্থা ‘মাইক্রো কনট্রোলারস ম্যানুফ্যাকচারড বাই রেনেসাসা’, তবু জাপান সে দেশের সাধারণ নির্বাচনে এখনো ব্যালট পেপারই ব্যবহার করে থাকে। বিশে^র ১২০টি দেশে যেখানে সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার গড়ে ওঠে, সেখানে মাত্র ২৫টি দেশে ইভিএম-এ ভোট নেয়ার প্রক্রিয়া চলে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম, ব্রাজিল, কানাডা, ইস্টোনিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি, ভারত, ইতালি, লাম্বারটা, নেদারল্যান্ড, ভেনিজুয়েল প্রভৃতি। অবশ্য এই দেশগুলোর মধ্যেও দুটি ভিন্নধর্মী প্রবণতা লক্ষ করা যায়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও উত্তর আমেরিকার মধ্যে যখন ইভিএম ব্যবহারে অনীহা বাড়তে থাকে, তখনই দক্ষিণ আমেরিকা ও এশিয়াতে এর ব্যবহার ক্রমবর্ধমান। যেমন জার্মানির ইস্টোনিয়ায় ২০০৭ সালে এভিএম-এ ভোট হলেও বর্তমানে জার্মানি, নেদারল্যান্ড, উত্তর আমেরিকা, আয়ারল্যান্ড প্রভৃতি দেশে ইভিএম ব্যান্ড করা হয়েছে। অবশ্য লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিল ও ভেনিজুয়েলায় ১৯৯৬ সাল থেকে সফলভাবে ইভিএম ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০০১ সাল থেকে ভারতের নির্বাচন কমিশন সব নির্বাচনেই ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০১৪-তে ৫৫.৩৫ কোটি ভারতীয় ভোটের ইভিএম-এ তাদের মত প্রকাশ করেছেন।

তবে ইভিএম-এ যে কারচুপি করা সম্ভব, তা এর প্রস্তুতকারী সংস্থাও গোপন করেনি। ‘মাইক্রোক্লিপ’ ইউএসএ-এর কোম্পানিও জাপানের ‘মাইক্রো কনট্রোলারস ম্যানফ্যাকচারড বাই রেনেসাঁস’ কোম্পানিই ইভিএম-এর প্রস্তুতকারী সংস্থা।

মাদারবোর্ডে পরিবর্তন এনে কোনো একজন প্রার্থীকে জেতানো সম্ভব। ঐ কোড প্রবেশ করিয়ে কোনো একজন ব্যক্তি অনায়াসেই ফলাফলে হেরফের ঘটাতে পারে। আর সেই হ্যাকারদের আয়াত্তাধীন ইভিএমও কয়েকটি সঠিক রেজাল্ট দেখাতে সক্ষম হয়। ভোটের প্রক্রিয়া চলাকালীন ও কোনো ইভিএম-কে রিসেট করা সম্ভব। আর এই সকল প্রক্রিয়া নব্বই সেকেন্ডের মধ্যেই কার্যকরী করা সম্ভব। অবশ্য ভারতীয় নির্বাচন কমিশন তাদের এই মতকে খ-ন করে ইভিএম-কেই মান্যতা দিয়েছেন। তাদের মতে, ডাবল লক সিস্টেম, যাকে পর্যায়ক্রমে পরীক্ষা করা হয়ে থাকে, তা সম্পূর্ণ নিরাপদ। তা ছাড়া নির্বাচন কমিশন মনে করে, প্রতিটি মেশিনের যে মাইক্রোচিপ থাকে, তার শনাক্তকরণ নম্বর ও ডিজিটাল স্বাক্ষর থাকে, যার পরির্বতন সম্ভব নয়। যদিও অনেক রাজনৈতিক দল ও তার নেতৃত্ব মনে করে, এই যুক্তি পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য নয়। উত্তর প্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনের পর বহুজন সমাজ পার্টির কুমারী মায়াবতী ও দিল্লিউপ-নির্বাচনের পর দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী শ্রীঅরবিন্দ কেজরীবাল ইভিএম  বাতিল করে পুনরায় ব্যালটে ভোট করার দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচন কমিশন তাদের দাবি নস্যাৎ করে দেন।

এরপরও কিন্তু বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। যদি কেউ মাইক্রোচিপের জায়গায় ঋঢ়-গঙগঝ সেট কওে, তবে মেশিনটি হ্যাক হয়েছে বলে ধরা যাবে। এছাড়া একটি ছোট চিপ ব্লু-টুথের সঙ্গে যুক্ত করলে ঐ চিপকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। তাদের যুক্তি,   একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট যদি হ্যাক হতে পাওে, তবে ইভিএম কেন নয়? যদি ইভিএমকে ইন্টারনেটে সংযুক্ত করা যায়, তবে হ্যাক করা সম্ভব, নয়তো নয়। তবে নির্বাচন কমিশনের দাবি,  অন্যদেশের তুলনায় ভারতের ইভিএম ইউনিক-এর সফটওয়ার ও ডাটা একবারের জন্য প্রোগ্রামিং করা থাকে। একবার ব্যবহারের পর তা নষ্ট হয়ে যায়। তবে ২০১৭ সালে মধ্যপ্রদেশের ছত্রপুর জেলায় রেজিস্টার্ড ভোটের তুলনায় ৪২৯টি ভোট  কম পড়ায় স্বাভাবিকভাই প্রশ্ন ওঠে, এই ৪২৯টি ভোট কোথায় গেলো? আর মেশিনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। তবে বিশ্বের কিছু কিছু দেশে ইভিএম-এর সঙ্গে ডচঅঞ  (ভোটার ভেরিফাইড পেপার অডিট ট্রায়াল) ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ভেনিজুয়েলার সাধারণ নির্বাচনে এর সার্থক ব্যবহার হয়েছে। এতে ভোটার যে বোতাম টিপে ভোট দেন, তার চিহ্নটি স্ক্রিনে ভেসে উঠে অতি অল্পক্ষণ স্থায়ী হয়, তাতে ভোটার তার প্রদত্ত ভোট সম্পর্কে আশ্বস্ত হন। এর ফলে নির্বাচন-প্রক্রিয়ার প্রতি নির্বাচকম-লির বিশ্বাসযোগ্যতা নিঃসন্দেহে বাড়ে।

অবশ্য কোনো কোনো রাজনৈতিক দল (বিশেষত কংগ্রেস ব্যতীত অন্য বিরোধী দলসমূহ) মনে কওে, ব্যালটের কারচুপি সি.সি.টিভি ব্যবহার করে বা পর্যাপ্ত প্রহরা যেমন আধাসামরিক বাহিনীকে কাজে লাগিয়ে বন্ধ করা যেতে পারে। তা ছাড়া ব্যালট ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইলেকট্রিসিটির প্রয়োজন নেই। তাই প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতেও এর ব্যবহার সম্ভব। অন্যদিকে ইভিএম ব্যবহারের আধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগানো হয়েছে, ফলে নির্বাচন-প্রক্রিয়া দ্রুততার সঙ্গে ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব বলে মনে করছেন নির্বাচন কমিশন, শাসকদল ও প্রধান বিরোধীদল। আবার অল্পদিন আগেই বিজেপি আইটি সেলের কর্মী শচীন রাঠোরকে সিমলা পুলিশ গ্রেফতার  করেছে ইভিএম-এর হ্যাকার হিসেবে।

তিনি অবশ্য পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন ইভিএম হ্যাক করে যাকে খুশি জেতানো যায়। যদি পাঁচ মিটার লম্বা কেবেল জুড়ে দিয়ে কন্ট্রোল ইউনিট ও ব্যালট বাক্সকে কোনোরকম স্পর্শ ছাড়াই নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তবে প্রযুক্তির উন্নতিতে দুহাত তুলে নাচতেও পারা যায়। তবে নিরপেক্ষ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পড়ে থাকে বিশ বাষ্পজলে। আসলে গণতন্ত্র যতোদিন আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার গোলাম হয়ে থাকবে, ততোদিন তার কাছে স্বচ্ছতা আশা করা কঠিন। দেশের সরকার বা নির্বাচন কমিশন উভয়েই ভারতবর্ষের বৃহত্তর নির্বাচকম-লির কাছে দায়বদ্ধ।

তার ফলে তাদেরই এই ৫ কোটি মানুষের কাছে স্বচ্ছতা প্রমাণের দায় রয়েছে। কেবল সংখ্যায় জোরে এটা তারা অস্বীকার করতে পাওে না। তাই ব্যালট সংরক্ষণের উপযুক্ত ব্যবস্থা করেই হোক বা ইভিএম-এ ডচঅঞ ব্যবহার করেই হোক, নির্বাচনকে স্বচ্ছতা দেয়া তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। নির্বাচন-প্রক্রিয়া দ্রুততার সঙ্গে সম্পাদন করাই একমাত্র কারণ হতে পারে না, যদি তাতে স্বচ্ছতার অভাব থাকে। উল্লেখ্য, ১৯৬০ সালে কার্ড পার্কিং সিস্টেম চালু হওয়ার পর ১৯৬৪ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচন ইভিএম-এর মাধ্যমে করা হয়। পরে তারা ব্যালটে প্রত্যাবর্তন করে। তাতে তাদের আধুনিকতা বা সত্যতার অগ্রগতি  নিয়ে কিন্তু এতটুকু সন্দিহান হয়নি বিশ্বের কোনো দেশ।

তাহলে বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতবর্ষের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতাই কি একমাত্র মাপকাঠি হওয়া উচিত নয়? এর সাথে কি  কখনো আপসো করা উচিত হবে? তাতে কি ভারতীয় সংবিধানের ওপর আর কেউ আস্থাশীল হতে পারবে? আধুনিক কালে আর একটি লাখ টাকার প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসছে। তা হলো, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা। অতি অল্পদিন আগে পাঁচ রাজ্যের  বিধানসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট প্রকাশের ক্ষেত্রেও এই প্রশ্ন আবার মাথাচাড়া দিয়ে উ]ঠেছে। তাই কেবল ব্যালট ও ইভিএম-বিতর্কে না গিয়ে গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বিচার করা উচিত।