প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মেডিকেল কলেজ বাড়লেও তৈরি হচ্ছে না মানসম্মত চিকিৎসক

যায়যায়দিন : পূর্বের প্রস্তুতি ছাড়াই নতুন নতুন সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলেও সেসব প্রতিষ্ঠান বিএমডিসি ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা মানছে না। অভিজ্ঞ শিক্ষক এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে। আর এসব কারণে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান মানসম্মত চিকিৎসক তৈরি করতে পারছে না। এতে করে ভবিষ্যতে চিকিৎসাসেবার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

সম্প্রতি সরকার নতুন ৫টি মেডিকেল কলেজ অনুমোদন দিয়ে চলতি (২০১৮-১৯) শিক্ষাবষের্ শিক্ষাথীর্ ভতির্ নিদের্শ দিয়েছেন। চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ মুহ‚তের্ সরকারি-বেসরকারি পযাের্য় যতগুলো চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাযর্ক্রম চালু আছে সেখানে হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া অধিকাংশেরই শিক্ষক থেকে শুরু করে অবকাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। নতুন ৫টি সরকারি মেডিকেল কলেজে এ বছর শিক্ষাথীর্ ভতির্র কাযর্ক্রম শুরু হলেও কলেজগুলোর স্থায়ী ক্যাম্পাস, শিক্ষক নিয়োগ, উপযুক্ত ছাত্রাবাস, গ্রন্থাগার এবং আধুনিক সরঞ্জাম সমৃদ্ধ ল্যাবরেটরি সুবিধা তৈরি হয়নি।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পূবর্প্রস্তুতি ছাড়া ঘোষণা দিয়েই মেডিকেল শিক্ষার মতো টেকনিক্যাল বিষয়ে শিক্ষা কাযর্ক্রম চালু করতে গেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাথীর্রা মানসম্মত শিক্ষা অজের্ন পিছিয়ে পড়বে। এমনকি বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কতৃর্ক নিধাির্রত নীতিমালা ভঙ্গ হবে। নীতিমালা অনুসরণ না করতে পারলে সেবা দেয়াসহ সাবির্ক চিকিৎসা কাযর্ক্রমের গুণগত মান নিশ্চিতও হবে না।

জানা যায় সদ্যঘোষিত নীলফামারী, নওগঁা, নেত্রকোনা, মাগুরা ও চাঁদপুর মেডিকেল কলেজে ২০১৮-১৯ শিক্ষাবষের্ এমবিবিএস কোসের্ অতিরিক্ত ২৫০ জনসহ ৩৬টি সরকারি মেডিকেল কলেজে ৪ হাজার ৬৮ জন শিক্ষাথীর্ ভতির্র সুযোগ পাবেন। অপরদিকে বেসরকারি ৬৯টি মেডিকেল কলেজে ৫ হাজার ৭৫১ জন শিক্ষাথীর্ ভতির্ হতে পারবেন।

তবে নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষাথীের্দর গুণগত শিক্ষা দেয়ার জন্য যে সংখ্যক অভিজ্ঞ শিক্ষক, অনুশীলনের জন্য সহায়ক চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অবকাঠামো সুবিধা দরকার এখনো তা সরবরাহ করা হয়নি। শুধু একজন করে অধ্যক্ষ নিয়োগ ছাড়া চিকিৎসা শাখার ৭টি মৌলিক বিষয়- অ্যানাটমি, ফিজিওলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, মাইক্রোবায়োলজি, ফরেনসিক মেডিসিন, ফামাের্কালজি ও প্যাথলজির শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়নি। এছাড়া প্রয়োজনীয় মেডিকেল স্টাফ, চিকিৎসা যন্ত্রপাতিও প্রস্তুত করা হয়নি।

এ বিষয়ে নীলফামারী জেলা সিভিল সাজর্ন রনজিৎ কুমার বমের্ণর কাছে জানতে চাইলে তিনি যায়যায়দিনকে জানান, নীলফামারী মেডিকেল কলেজের জন্য ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ পদে খুলনা মেডিকেল কলেজের এনাটমি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. রবিউল ইসলাম শাহকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে যিনি এনাটমির ক্লাশও নেবেন। এখন এনাটমি ছাড়াও প্রথমবষের্ বায়োকেমিস্ট্রি ও ফিজিওলজি বিষয়ে পাঠদানে অন্তত ২ জন লেকচারার ও ২ জন করে অধ্যাপক ও অফিস স্টাফসহ অন্যান্য জনবল লাগবে। শিক্ষক খেঁাজা হচ্ছে আশা করছি ২০১৯ সালের ১০ জানুয়ারীতে ক্লাশ শুরুর আগেই নিয়োগ হয়ে যাবে।

কলেজের অবকাঠামো বিষয়ে নীলফামারী গণপূতর্ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নগরীর নটখানা এলাকায় সরকারি কুষ্ঠ হাসপাতালের পাশে ৫১ দশমিক ৩০ একর জমির ওপর মেডিকেল কলেজ নিমির্ত হবে। যা নিমাের্ণ প্রায় আটশ’ কোটি টাকার খসড়া প্রাক্কলন ও ডিপিপি গণপূতর্ অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। একনেকে অনুমোদন পাওয়ার পর অথর্ বরাদ্দ সাপেক্ষে নিমার্ণ কাজের প্রক্রিয়া শুরু হবে।

মাগুরা মেডিকেল কলেজের বিষয়ে মাগুরা সদর হাসপাতালের তত্ত¡াবধায়ক ডা. সুশান্ত কুমার বিশ্বাস বলেন, ডা. অলোক কুমার সাহা নামে একজন অধ্যক্ষ নিয়োগ দেয়া হলেও কোনো শিক্ষক বা মেডিকেলের কমর্কতার্-কমর্চারী নিয়োগ হয়নি। কলেজের জমি অধিগ্রহণ ও শিক্ষক-কমর্চারী নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন আছে। তবে সদর হাসপাতালের নতুন ভবন হওয়ায় পুরনো ভবনটিকে শিক্ষাথীের্দর ক্লাসরুম ও শিক্ষকদের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। হাসপাতাল কমর্চারীদের কোয়াটার্রকে সাময়িকভাবে ছেলেদের ও ডক্টর কোয়াটার্রটিকে মেয়েদের আবাসন হিসেবে দেয়া হবে।

এছাড়া নওগঁা জেলা সিভিল সাজর্ন ডা. মো. মামুনুল হক যায়যায়দিনকে জানিয়েছেন মেডিকেল কলেজে ৬ জন শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে বগুড়া শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজে সহযোগী অধ্যাপক অথোের্পডিকস সাজর্ন ডা. আব্দুল বারীকে অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। রাজশাহী মেডিকেল থেকে কিছু সংখ্যক স্টাফ ও এনাটমি, ফিজিওলোজি, বায়োকেমিস্ট্রির শিক্ষক চাওয়া হয়েছে। আর জমি অধিগ্রহণ করে স্থায়ী ভবন নিমার্ণ না হওয়া পযর্ন্ত সদর হাসপাতালের পুরনো ভবনের দ্বিতীয় তলায় শিক্ষাথীের্দর শ্রেণিকক্ষ এবং নাসির্ং কোয়াটাের্র আবাসনের করা হয়েছে।

নেত্রকোনা জেলা সিএস (সিভিল সাজর্ন) ডা. মো. তাজুল ইসলাম বলেন, প্রিন্সিপাল নিয়োগ দেয়া হলেও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক, অন্যান্য জনবল ও সরঞ্জাম দেয়া হয়নি। সবকিছু পেলেই কাযর্ক্রম শুরু হবে।

এদিকে মেডিকেল কলেজগুলোতে শিক্ষক সংখ্যা নিয়ে বিএমডিসির এক হিসাবে দেখা গেছে, দেশে সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর মোট শিক্ষক পদের প্রায় ৬৩ শতাংশই শূন্য। বিএমডিসির মানদÐ অনুযায়ী ৩১টি সরকারি মেডিকেল কলেজে কমপক্ষে ৮ হাজার ৩০০ শিক্ষক প্রয়োজন সেখানে রয়েছে ৩ হাজার ৪৬ জন। আর ৬৯টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের মধ্যে ৬২টি কলেজে শিক্ষক আছেন ৬ হাজার ৩৫৭ জন। অথচ নীতিমালা অনুযায়ী কমপক্ষে ১৭ হাজার ৫০০ জন থাকা দরকার।

এছাড়া ডবিøউএইচও ও বিএমডিসি এর নীতিমালা অনুযায়ী মেডিকেল শিক্ষার জন্য কোনো কলেজে প্রতিবছর ৫০ জন শিক্ষাথীর্ ভতির্ হলে সেখানে অন্তত ১৯৮ শিক্ষক প্রয়োজন। আর শিক্ষাথীর্ সংখ্যা ১০০ জন হলে শিক্ষক থাকতে হবে ২৯৩ জন ও ২০০ জন ভতির্ হলে প্রায় ৪০০ জন শিক্ষক থাকতে হবে।

মানসম্মত চিকিৎসক তৈরির ব্যাপারে রাজধানীর একাধিক মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক অভিযোগ করেছেন চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতো থিওরোটিক্যাল ও প্র্যাকটিক্যাল বিষয়ে পূণার্ঙ্গ জ্ঞানাজের্নর বিকল্প নেই। কারণ একজন চিকিৎসককে রোগীর জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে উপস্থিত থেকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, সেখানে কোয়ালিটি কম্প্রোমাইজ করার কোনো সুযোগ নেই। অথচ শুধু সুনাম ও ব্যবসায়িক লোকসানের ভয়ে এখানেও অনৈতিকতা চলছে। এ জন্য গত কয়েক বছরে বিএমডিসি ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা মানতে ব্যথর্ হওয়ায় ১০টি মেডিকেল কলেজের ভতির্ কাযর্ক্রম বন্ধ করে দেয়ার নজির রয়েছে।

বিষয়টি সম্পকের্ নাম না প্রকাশ করার শতের্ ‘ডক্টর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ (ড্যাব) এর এক চিকিৎসক নেতা বলেন, ১৯৯২ থেকে ২০০৮ সাল পযর্ন্ত ৪৯ এবং ২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পযর্ন্ত ৪৭টি সহ ৯৬টি মেডিকেল কলেজ অনুমোদন দেয়া হয়। বতর্মান সরকার প্রতি জেলায় একটি করে মেডিকেল কলেজ করার ঘোষণা দিয়েছেন। এই মুহূতের্ দেশে ১০৫টি মেডিকেল কলেজে প্রায় ৫২ হাজার শিক্ষাথীর্র রয়েছে। তিনি বলেন, সেবাদানের প্রয়োজনে মেডিকেল প্রতিষ্ঠা চিকিৎসার মত মৌলিক অধিকার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক দিক। কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠানেই হাতে-কলমে শিক্ষার জন্য অবকাঠামোগত সুবিধা, সহায়ক জনবল ও যন্ত্রপাতি সংকট রয়েছে। মানসম্মত শিক্ষা অজর্ন করতে না পারায় এসব শিক্ষাথীর্ বছরের পর বছর প্রপে (প্রফেশনাল এক্সাম) অকৃতকাযর্ হচ্ছে। তাই গুণগত মান বিবেচনা করলে বতর্মানে ৭৫ শতাংশ বেসরকারি মেডিকেল কলেজ বন্ধ করে দেয়া উচিত।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষা ও জনশক্তি উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. এমএ রশিদের কাছে জানতে চাইলে যায়যায়দিনকে বলেন, নতুন কলেজগুলোতে প্রিন্সিপাল নিয়োগ ও জায়গা নিবার্চন হয়ে গেছে। ভবন তৈরি হওয়া পযর্ন্ত পরিত্যক্ত সরকারি ভবনগুলোতে কাযর্ক্রম চলবে। এ লক্ষ্যে সবখানেই কিছু প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র পাঠানো হচ্ছে। আর শিক্ষক স্বল্পতার কারণে তাৎক্ষণিক নিয়োগ বিলম্বিত হলেও দ্রুত সমাধান করা হবে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ