প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আমাদের জীবন ধারার সূচকগুলো উন্নয়নের ধারার সাথে মিলছে না কেন?

ড. সা’দত হুসাইন : গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ ধনাত্মক প্রবৃদ্ধিতে ঋদ্ধ হচ্ছে। আমাদের মাথাপিছু আয় ধারাবাহিক ভাবে বাড়ছে। এর মধ্যে অবশ্য দুবার আয় গণনার ভিত্তি রেখা (ইধংব খরহব) পরিবর্তন করা হয়েছে। এসব শুভঙ্করি কৌশলের আলোচনায় না গিয়েও নিশ্চিত ভাবে বলা যায় যে সাধারণ ভাবে দেশের অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটছে। সামষ্টিক অর্থনীতির নামিক চলক (ঘড়সরহধষ ঠধৎরধনষবং ) সমূহের প্রায় সবগুলো চলক ঠিক পথে এগোচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে দেশ পর্যায়ক্রমে নামিক হিসাব মতে উন্নয়নের সিঁড়িগুলো একের পর এক অতিক্রম করবে। উন্নয়নের এসব গতি আমাদের জীবন ধারায় প্রতিফলিত হওয়ার কথা। আমাদের জীবনমান এবং জীবন-যাপনের পরিবেশ সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে উন্নত হবে এমনটি সকল সু-নাগরিক আশা করে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে সব ক্ষেত্রে তেমনটি ঘটছে না। যেমন, আমাদের রাজধানী ঢাকা পৃথিবীর দুই নম্বর নিকৃষ্টতম শহর। একটি উন্নয়নশীল দেশের রাজধানী শহরে যে ধরণের নাগরিক সুবিধা থাকা উচিত, আমাদের এখানে তেমনটি নেই। এখানে রাস্তায় বেরুলেই একজন নাগরিক হাড়ে হাড়ে টের পান তিনি কি অস্বস্তিকর পরিবেশে রয়েছেন। এ পরিবেশ তার স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর যানজটে তার বিপুল কর্মঘণ্টা হারিয়ে গেছে। নৈরাজ্যকর যান চলাচলে তার প্রাণ ওষ্ঠাগত। জীবন ঝুঁকিপূর্ণ।

এত উন্নয়নের মধ্যে উদ্ভাবনী কাজে আমাদের সফলতা ও তৎপরতা নিম্ন পর্যায়ের বলে জানা গেছে। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে উদ্ভাবনী কাজে বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্নে। উদ্ভাবনী কাজে এত নিচে অবস্থান করলে বড় উন্নয়ন তো সম্ভব নয়। উৎপাদনের গতি এবং উৎপাদনশীলতা (চৎড়ফঁপঃরারঃু ) নির্ভর করে কর্মদক্ষতা, প্রযুক্তি প্রয়োগ এবং উদ্ভাবন প্রদ্ধতি-প্রক্রিয়া বিকাশের ওপর। দীর্ঘদিন একই পদ্ধতি-প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হলে উৎপাদন এবং কর্মকা-ে স্থবিরতা আসে। সেক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির হার ধরে রাখা সম্ভব হবে না। সত্যি বলতে কি, উদ্ভাবনীর মাত্রা এত নিচু পর্যায়ের হলে প্রবৃদ্ধির হার এত উচু পর্যায়ের হতে পারে কিনা সে নিয়ে লোকজন প্রশ্ন তুলতে পারে।

দেশে যেভাবে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে তার সাথে কর্ম-সংস্থানের হিসাব সুন্দর ভাবে মিলে না। উৎপাদন, প্রবৃদ্ধি এত বাড়লে বেকারত্বের হার এতদিনে অনেক কমে আসত। তা কিন্তু হচ্ছেনা। বেকারত্বের হার উঁচু স্তরে রয়ে যাচ্ছে। শিক্ষিত বেকারের হার আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। মাত্র হাজার খানেক নিম্ন স্তরের পদে চাকরির জন্যে তের-চৌদ্দ লাখ প্রার্থী আবেদন করেছে। এরা সবাই শিক্ষিত। এদের মধ্যে হয়তো কয়েক লাখ স্নাতক এবং স্নাতাকোত্তর ডিগ্রিধারী রয়েছে। এদের মধ্যে অতি নগন্য এক অংশ চাকরি পাবে। বাকিরা বেকার থাকবে। প্রবৃদ্ধির গতি ও হারের সাথে বেকারত্বের এমন অবস্থা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তবে কি আমরা কর্মহীন প্রবৃদ্ধিতে (লড়নষবংং মৎড়ঃিয) ঘুরপাক খাচ্ছি? যদি তাই হয়, তবে এ ধরণের প্রবৃদ্ধি কতদূর কাম্য তা নতুনভাবে ভেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।

মানবসম্পদ উন্নয়ন ছাড়া প্রবৃদ্ধির হার একই সমতলে বজায় রাখা সম্ভব হয় না। আমরা দেশের মানব সম্পদ নিয়েই গর্ব করি। প্রতিবছর দেখাতে চেষ্টা করি আমাদের অবস্থানের উন্নতি হচ্ছে। মূল অবস্থান কোথায় তা আড়ালে-আবডালে রাখার চেষ্টা করি। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি সংবাদ প্রতিবেদনে দেখা যায় পৃথিবীর ১৯৫ দেশের মধ্যে মানবসম্পদ উন্নয়নে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬১ তম। মাত্র ৩৪ টি দেশের ওপরে আমাদের অবস্থান। তার চেয়ে হতাশাব্যঞ্জক তথ্য হলো দক্ষিণ এশিয়াতে একমাত্র পাকিস্তান ছাড়া প্রতিটি দেশের অবস্থান বাংলাদেশের ওপরে। যেখানে আমাদের প্রবৃদ্ধি এত ভালো, মাথাপিছু আয়ও দ্রুত বাড়ছে, সেখানে মানবসম্পদ উন্নয়নের সূচকে আমাদের অবস্থা এত করুণ কেন? শিক্ষা-প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে আমাদের এত পিছিয়ে থাকা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিষয়টি নির্মোহভাবে খতিয়ে দেখা দরকার।

অর্থনীতিতে এক সূচকের সাথে অন্য অনেক সূচক সু-সংগ্রহিত। যদি এদের মধ্যে অসঙ্গতি থাকে তবে বুঝতে হবে যে, এক বা একাধিক সূচকের গণনায় কোনো ভুল রয়েছে। এ ভুল শোধরানো দরকার। নইলে পরিসংখ্যানগত ভ্রান্তি আমাদেরকে শুধু বিভ্রান্ত করবে না, আমরা ভুল পথে পরিচালিত হয়ে শেষ পর্যন্ত বিপাকে পড়ব।

লেখক : সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত