প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

adv 468x65

তাঁর চোখে স্বপ্ন দেখে বাংলাদেশ

এম. নজরুল ইসলাম : বাংলাদেশকে স্বপ্ন দেখান তিনি। তাঁকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে বাংলাদেশ। তাঁর চোখে স্বপ্ন দেখে বাংলাদেশ। যে স্বপ্ন নিয়ে ১৯৭১ সালে স্বাধীন হয়েছিল বাংলাদেশ, সপরিবারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার মধ্য দিয়ে সেই স্বপ্নের সমাধি গড়তে চেয়েছিল প্রতিক্রিয়াশীল অপশক্তি। যাঁর নেতৃত্বে এই অপশক্তিকে রুখে দিয়ে ঘুর দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ, তিনি শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে সক্রিয় তিনি। তাঁর হাত ধরে বাংলাদেশের ইতিবাচক সব অর্জন। ১৯৮১ সালে, যখন জান্তার বুটের তলায় পিষ্ট প্রিয় স্বদেশ, তিনি এসেছিলেন অবরুদ্ধ গণতন্ত্রকে মুক্ত করতে। সেই থেকে জনকল্যাণের কঠোর ব্রত সাধনায় তাঁর দীর্ঘ পথচলা। বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়েছেন তিনি। পায়ে পায়ে পাথর সরিয়ে দেশের মানুষের জন্য তৈরি করেছেন গণতন্ত্রের এক শক্ত ভূমি। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টানা দ্বিতীয় মেয়াদে দেশ পরিচালনায় থেকে অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে নিয়ে গেছেন এমন এক উচ্চতায়, যেখানে সারা বিশ্ব অবাক তাকিয়ে দেখছে বাংলাদেশের সাফল্য।

বাংলাদেশে অনন্যসাধারণ কিছু অর্জনের দিকে এবার দৃষ্টি দেওয়া যাক। মাথাপিছু আয়, গড় আয়ুসহ বিভিন্ন মাপকাঠিতে উন্নতির ফলে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি-ইউএনডিপির মানব উন্নয়ন সূচকে (এইচডিআই) তিন ধাপ এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। ১৮৯টি দেশকে নিয়ে করা সূচকে বাংলাদেশ লাভ করেছে ১৩৬তম স্থান। প্রতিটি দেশের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আয় ও সম্পদের উৎস, বৈষম্য, লিঙ্গ সমতা, দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও আর্থিক প্রবাহ, যোগাযোগ, পরিবেশের ভারসাম্য ও জনমিতির তথ্য বিশ্লেষণ করে এই সূচক তৈরি করেছে ইউএনডিপি। এসবের মানদ-ে এবার বাংলাদেশের এইচডিআই মান দাঁড়িয়েছে ০.৬০৮। গত বছরের সূচকে এই মান ছিল ০.৫৭৯। অর্থাৎ স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বৈষম্য ও দারিদ্র্য দূরীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই উন্নতি হয়েছে বাংলাদেশের। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল-ইউএনএফপিএর কেন্দ্রীয় তথ্যসূত্র-ওয়ার্ল্ড পপুলেশন ড্যাসবোর্ড অনুসারে স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন ও চিকিৎসার নানামুখী অগ্রগতির প্রভাবে দেশে গত এক দশকে মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে তিন বছরের বেশি। বিশ্বে গড় আয়ুর সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান নবম আর সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে তৃতীয়। এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভূটান, মিয়ানমার ও আফগানিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বেশি। গড় আয়ু বৃদ্ধির বিষয়টিকে দেশের জন্য এক বড় অর্জন।

অনেক দুঃসংবাদের মধ্যেও অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অব্যাহত অগ্রযাত্রার খবরটি আমাদের মনে আশা জাগায়। ৪০ বছর আগে কল্পনাও করা যেত না যে অর্থনীতিতে শক্তিশালী দেশগুলোর সঙ্গে আমরা টক্কর দিতে পারব। মুম্বাইয়ের ব্যবসা-বাণিজ্যসম্পর্কিত ওয়েবসাইট বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর সূত্র বলছে, মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি, মাথাপিছু আয় ও মানবসম্পদ সূচকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবধান ধীরে ধীরে কমে আসছে। গড় আয়ুতে আমরা পাকিস্তান ও ভারতের চেয়ে এগিয়ে আছি। এ ছাড়া নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়ন এবং স্বাস্থ্যসেবায় বাংলাদেশের অগ্রগতিও চোখে পড়ার মতো। বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালসহ আগের তিন বছরে বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় বেড়েছে ১৪ শতাংশ। ওই বছর বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল ১ হাজার ৩৫৫ মার্কিন ডলার। এই ধারা চলতে থাকলে ২০২০ সাল নাগাদ মাথাপিছু আয়ে বাংলাদেশ ভারতকে ছাড়িয়ে যাবে।

বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে নিম্ন আয়ের দেশের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত দিয়েছিল আগেই। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বে এরই মধ্যে আমরা নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছি। অদূর ভবিষ্যতে মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ারও স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি জাতিসংঘ বলেছে, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় ঠাঁই করে নিয়েছে।

তলাবিহীন ঝুড়ি কিংবা টেস্ট কেস থেকে বাংলাদেশ এখন দারিদ্র্য বিমোচনে বিশ্বে রোল মডেল। ৮৫ শতাংশ দারিদ্র্য নিয়ে যাত্রা শুরু করা দেশটি দ্রুত এই হার কমানোর ক্ষেত্রে নজিরবিহীন সাফল্য অর্জন করেছে। ৭০ ডলার মাথাপিছু আয় নিয়ে যাত্রা করা বাংলাদেশ তিনটি শর্তই পূরণ করে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছে ২০২৪ সালেই। মাথাপিছু আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৭৫২ ডলার।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে দারিদ্র্য হ্রাস, উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিসহ টেকসই উন্নয়নে বাংলাদেশের বড় সাফল্য এসেছে গত ১০ বছরে। সরকারের ধারাবাহিকতার সঙ্গে উন্নয়ন নীতি-কৌশল বাস্তবায়নের ধারাবাহিতকায় এটি অর্জন সম্ভব হয়েছে। অবকাঠামো খাতে দৃশ্যমান উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক ও মানবসম্পদ উন্নয়ন সূচকেও এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। স্বাধীনতার ২৯ বছর পর ২০০০ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪৮.৯ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০ জনে পাঁচজনই দরিদ্র। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৬ সালের জরিপ বলছে, এখন এই হার কমে দাঁড়িয়েছে ২৪.৩ শতাংশ। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছর শেষে দেশে দারিদ্র্যের হার ২১ শতাংশ প্রক্ষেপণ করেছে। অর্থাৎ বর্তমানে প্রতি ১০ জনে দুজন দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়েছে।

২০২১ সালের মধ্যে সরকারের রূপকল্প বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। এ ছাড়া ২০২৪ সালের মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে সরকার। জাতিসংঘ ঘোষিত ১৫ বছর মেয়াদি (২০১৫-২০৩০) টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি বাস্তবায়ন হচ্ছে। পাশাপাশি ২০৪১ সালে বাংলাদেশকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে উন্নীত করারও স্বপ্ন দেখছে সরকার। এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে দরকার বিদ্যুৎ সুবিধা এবং তা হতে হবে নিরবচ্ছিন্ন। শিল্প-কারখানাসহ প্রতিটি ঘরে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা দিতে সারা দেশে এখন প্রায় শতাধিক প্রকল্প চলমান । ২০১০ সালে সারা দেশে বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইন ছিল আট হাজার সার্কিট কিলোমিটার। সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার কিলোমিটারে। আর বিতরণ লাইন ১০ বছর আগে ছিল এক লাখ ৯০ হাজার কিলোমিটার। সেটি এখন বেড়ে চার লাখ ৫০ হাজার কিলোমিটার হয়েছে।

আর এসব কারণেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি শতকরা ৬৬ ভাগ মানুষ সমর্থন প্রকাশ করেছেন। ওয়াশিংটনভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই) পরিচালিত এক জরিপের ফল থেকে এ তথ্য জানা গেছে। এতে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের অর্থনীতি আশানুরূপভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। ৬২ শতাংশ নাগরিক মনে করেন, অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় দেশ সঠিক পথে আছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন ৬৯ শতাংশ নাগরিক।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর ইনসাইট অ্যান্ড সার্ভের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা বেড়েছে। ৬৬ শতাংশ নাগরিকের কাছে জনপ্রিয় শেখ হাসিনা। ঐ গবেষণা প্রতিবেদনের নোটে বলা হয়েছে, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বর্তমান সরকার। আর সে কারণেই ৬৮ শতাংশ নাগরিক জননিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে সন্তুষ্ট। জরিপের ফলাফলে বলা হয়েছে, সরকারি বিভিন্ন সেবা প্রদানের ক্ষেত্রেও জনসন্তুষ্টির পরিমাণ বেড়েছে। জনস্বাস্থ্য খাতে সরকারি সেবায় সন্তুষ্ট ৬৭ শতাংশ মানুষ এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন ৬৪ শতাংশ নাগরিক। এ ছাড়া সড়ক ও ব্রিজের উন্নয়নের প্রভাব নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন ৬১ শতাংশ নাগরিক। দেশের বর্তমান গণতান্ত্রিক আবহ নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন ৫১ শতাংশ নাগরিক।

একজন শেখ হাসিনা, যিনি জনগণের আবেগ বুঝতে শিখেছেন, পড়তে পারেন তাদের মনের কথা, আর ঠিক সেভাবেই তিনি এগিয়ে নিয়ে যেতে চান এই দেশকে। দেশের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে স্বপ্নপূরণের যে অভিযাত্রা, তা সফল হবেই। আমরা দেখতে পাচ্ছি বাংলাদেশের উন্নয়নের রথে গতির সঞ্চার হয়েছে। এ স্বপ্নযাত্রার সারথি শেখ হাসিনার জন্মদিন। জন্মদিনে তাঁকে জানাই শ্রদ্ধা-শুভেচ্ছা। জয়তু শেখ হাসিনা।
লেখক: অস্ট্রিয়া প্রবাসী লেখক, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত