প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ঈদ-উল আযহা উদযাপন ও বাংলাদেশের অর্থনীতি

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ: ঈদ উল আযহা উদযাপনে অর্থনীতিতে ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহ, শিল্প উপাদন ও ব্যবসা বাণিজ্যসহ নানান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের  প্রসার ঘটে। এ উৎসবে প্রধানত পাঁচটি খাতে ব্যাপক আর্থিক লেনদেনসহ বহুমুখি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়, যা গোটা অর্থনীতি তথা দেশজ উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় সনাক্তযোগ্য প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

পশু কোরবানি উপলক্ষে জাতীয় অর্থনীতিতে এক ব্যাপক আর্থিক কর্মকা- পরিচালিত হয়ে হয়ে থাকে। গত বছরের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৭৮ লাখ লাখ গরু ও খাসি কোরবানি হয়েছিল। বাংলাদেশ ট্যানার্স এসোসিয়েশনের ( বি টি এ) ধারণা এবার ৩০ লাখ গরু ও ৫৫ লাখ খাসি কোরবানি হবে । গরু প্রতি গড় মূল্য ৩০ হাজার টাকা দাম ধরলে এই ৩০ লাখ গরু বাবদ লেনদেন হবে ৯ হাজার কোটি টাকা এবং ৫৫ লাখ খাসি ( গড়ে ১৫০০ টাকা দরে ) ৮২৫ কোটি টাকা অর্থাৎ পশু কোরবানিতে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হবে। ৮৫ লাখ কোরবানির পশুর মধ্যে প্রায় ৪৫ লাখ পশু (গরু ২০ লাখ, খাসি-ভেড়া ২৫ লাখ) আমদানি হবে প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে। ভারতীয় সূত্র থেকেই জানা গেছে প্রায় ৪৭০০ কোটি টাকার রপ্তানি তাদের এবারের প্রত্যাশা। এর একটা বড় অবশ অবশ্য চোরাই পথে বা পদ্ধতিতে আদান প্রদান হবে, পশুর সংখ্যা ও টাকার পরিমান অবশ্যই অনুমাণ নির্ভর। যে পদ্ধদিতেই হোক না কেন বাংলাদেশের প্রায় ৫০০০ কোটির টাকার বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হবে এ খাতে। ২০ লাখ গরু আমদানির জন্য বাংলাদেশের শুল্ক রাজস্ব (গরু প্রতি ৫০০ টাকা হিসেবে ) ১০০ কোটি টাকা অর্জিত হওয়ার কথা। কোরবানিকৃত পশুর সরবরাহ ও কেনাবেচার শুমার ও পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায় চাদা, টোল , বখশিশ, চোরাকারবার, ফড়িয়া, দালাল, হাশিল,পশুর হাট ইজারা , চাদিয়া, বাঁশ খুটির ব্যবসা, পশুর খাবার , পশু কোরবানি ও বানানো এমনকি পশুর সাজগোজ বাবদও এক বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতবদল হয়ে থাকে অর্থাৎ অর্থনীতিতে ফর্মাল ইনফর্মাল ওয়েতে আর্থিক লেনদেন বা মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে যায়।

কোরবানিকৃত পশুর চামড়া আমাদের অর্থনীতিতে রপ্তানি বাণিজ্যে, পাদুকা শিল্পে পোশাক, হস্তশিল্পে এক অন্যতম উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এই চামড়া সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ, বিক্রয় ও ব্যবহার উপলক্ষে উল্লেযোগ্য সংখ্যক মানুষের ও প্রতিষ্ঠানের কর্মযোজনা সৃষ্টি হয়। এই চামড়া সংগ্রহ সংরক্ষণ প্রক্রিয়া করণের সঙ্গে ১০০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ ও ব্যবসা জড়িত। রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকগুলো প্রতি বছর প্রায় ৫০০ কোটি বিশেষ ঋণ দিয়ে থাকে, বেসরকারি ব্যাংকগুলো ৮০-১০০ কোটি টাকা । চামড়া নিম্ন দামে পাচার হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি মোকাবিলার বিষযটি গুরুত্বপূর্ণ। দেশি বিদেশি সিন্ডিকেটের কবল থেকে চামড়া ব্যবসাকে উদ্ধারের কোনো বিকল্প নেই। পত্রিকান্তরে প্রতিবেদনে প্রকাশ প্রতিবেশী দেশ থেকে বাকিতে গরু সরবরাহ করা হয় কম দামে কাচা চামড়া পাচারের প্রত্যাশায়। সেই চামড়া প্রক্রিয়াকরণ করে বেশি দামে বিদেশে রপ্তানির মুনাফা অর্জন করে তারা। দেশে নিজেদের চামড়া প্রক্রিয়া করণ এবং উপযুক্ত মূল্যে তা রপ্তানির প্রণোদনা সৃষ্টি করেই এ পরিস্থিতি থেকে নিষ্কৃতি লাভ ঘটতে পারে। লবন চামড়া সংরক্ষণের একটি অন্যতম উপাদান । সরকারকে ৪০ হাজার টন লবন শুলকমুক্ত আমদানির উদ্যোগ নিতে হয়েছে যাতে সিন্ডিকেট করে লবনের কৃত্রিম সংকট তৈরি না হয় ।

কোরবানির পশুর মাংশ আমিষ জাতীয় খাদ্যের উপাদান এবং এই মাংশের বিলি বন্টন প্রক্রিয়ায় রয়েছে আর্থসামাজিক তাৎপর্য-ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে বৎসরের একটি সময়ে সকলে আমিষ প্রধান এই খাদ্যের সন্ধান/সরবরাহ লাভ করে থাকে। মাংশ রান্নার কাজে ব্যবহৃত মশলা বাবদ প্রায় ৪০০০ কোটি টাকার ব্যবসা হয়ে থাকে এ সময়ে। মশলার দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেয়ে ঈদ উদয়াপনের ব্যয় ব্যবস্থাপনাকে বেচাইন পরিস্থিতির সামনে দাড় করায়। সংবাদ মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে শুধু মায়ানমার থেকে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার মসলা অবৈধভাবে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশে।

হজ্ব পালন ঈদুল আযহা উৎসবের একটি বিশেষ অংশ। হজ পালন উপলক্ষ্যে বৈদেশিক মুদ্রাসহ বিপুল সংখ্যক অর্থ লেনদেন হয়ে থাকে। এ বছর বাংলাদেশ থেকে ১ লাখ ১০ হাজার ৫৭৬ জন হজে গিয়েছেন। প্রতিজনে গড়ে ৫ লাখ টাকা ব্যয় নির্বাহ করলে এখাতে মোট অর্থ ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ হাজার ৫২৮ কোটি টাকা, বৈদেশিক মুদ্রায় ৬৬৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। হাজীদের যাতায়াতসহ সেখানকার ব্যয় বৈদেশিক মুদ্রাতেই নির্বাহ হবে। এর সঙ্গে এই হজের ব্যবস্থাপনা ব্যয়েও উল্লেযোগ্য পরিমাণ বাংলাদেশি টাকা ও বিদেশি মুদ্রা ব্যয়ের সংশ্লেষ রয়েছে। ব্যাংকিং সেক্টরে এ উপলক্ষে লেনদেন ও সেবা সূত্রে ব্যয় বেড়েছে। গোটা সৌদি আরবের অর্থনীতি সেই প্রাচীন কাল থেকেই হজ্জ মৌসুমের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড  বা ব্যবসা-বাণিজ্যকে ঘিরে বা অবলম্বন করে আবর্তিত হত এবং বর্তমানেও তার ব্যাপ্তি বাড়ছে বৈ কমছেনা।

চামড়া ঋণ থেকে শুরু করে ঈদের বোনাস বাবদ বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে যায়। এ সময়ে অবধারিতভাবে রেমিটেন্স বৃদ্ধি পায়। কোরবানির পশু আমদানি ব্যয় হয় – চামড়া রপ্তানি সূত্রেও। ঈদ উপলক্ষে পরিবহন ব্যবস্থায় বা ব্যবসায় ব্যাপক কর্মতৎপরতা বেড়ে যায়। শহরের মানুষ আপনজনের সাথে ঈদ উদযাপনের জন্য গ্রামে ছুটে। একমাস আগে থেকে ট্রেন বাস লঞ্চের টিকিট বিক্রির তোড়জোড় দেখে বোঝা যায় – এর প্রসার ও প্রকৃতি। নির্ধারিত ভাড়ার চাইতে দ্বিগুণ দামে ফর্মাল টিকিট আর ইনফর্মাল টাউট দালাল ও বিবিধ উপায়ে টিকিট বিক্রির সার্বিক ব্যবস্থা বোঝা যায় এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় পরিবহন খাতে সাকুল্যে ২০০০ কোটি টাকার বাড়তি ব্যবসা বা লেনদেন হয়ে থাকে। এটিও অর্থনীতিতে প্রাণপাঞ্জল্য সৃষ্টি করে।

এটি প্রণিধানযোগ্য যে অর্থনীতিতে মুদ্রা সরবরাহ মুদ্রা লেনদেন, আর্থিক কর্মকাণ্ডের প্রসারই অর্থনীতির জন্য আয়। কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মুদ্রা সরবরাহ গতিশীলতা আনয়ন। ঘুর্ণায়মান অর্থনীতির গতিপ্রবাহে যেকোনো ব্যয় অর্থনীতির জন্য আয়। এখানে বিচ্যুতি বিভ্রান্তি ও বিপত্তি সৃষ্টি হলে একটা স্বাভাবিক সিস্টেম লস এর সাফল্যকে ম্লান করে দিতে পারে। হজ্জ ব্যবস্থাপনায় নিজেদের সক্ষমতা বাড়িয়ে (পরিবহন ও আবাসনে নিজেমের অবকাঠামো গড়ে উঠলে এবং কার্যকর ভূমিকায় পাওয়া গেলে, বর্ডার ট্রেডে বাঞ্ছিত নিয়ন্ত্রণ ও পরিবীক্ষণ জোরদার করে, ঘাটে ঘাটে চাঁদা , দুর্নীতি ও দালালি, সকল প্রকার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে, চামড়া পাচার রোধ কল্পে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে উৎসবের অর্থনীতিকে জিডিপিতে যোগ্য অবদান রাখার অবকাশ নিশ্চিত হতে পারে।
লেখক : সাবেক চেয়ারম্যান, এনবিআর