প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

পাবলিক পরীক্ষার ফলের ওঠানামা শিক্ষার মানের প্রকৃত অবস্থা

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী: আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় পাবলিক পরীক্ষার অবস্থান ও গুরুত্ব সবচাইতে বেশি। পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসি আর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতক সম্মান, মাস্টার্স মাদ্রাসা ও কারিগরি সবই পাবলিক পরীক্ষার আওতায়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোথাও সেমিস্টার, কোথাও বছরওয়ারি নিজ নিজ তত্ত্বাবধায়নে। মৌখিক পরীক্ষা পদ্ধতি আমাদের এখানে নামমাত্র।

২০০১ সাল থেকে গ্রেডিং বা জিপিএ পদ্ধতিতে ফল প্রকাশের নিয়ম প্রবর্তিত হলেও ১০০ নম্বরের ভূত মাথা থেকে নামেনি। জিপিএ পদ্ধতিতে প্রথম ৪/৫ বছর পরীক্ষার ফল বিপর্যয় ঘটেছিল চূড়ান্তভাবে। এই পদ্ধতিতে মূল্যায়নের অভিজ্ঞতার অভাবের কারণেই তা ঘটেছিল। ফলে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হলে পরীক্ষকগণ জিপিএ বাড়িয়ে দিতে গিয়ে আরেক সর্বনাশ করলনে, তাতে আকাশের সব তারা বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নামিয়ে দিলেন। ফলে দেশে একটি প্রচার বেশ সম্প্রচারিত হলো যে, এরা জিপিএ-৫ এর জেনারেশন। অভিভাবকেরাও ঘরে গোল্ডেন জিপিএর ক্রেজে পড়ে গেলেন, বিদ্যালয়, কলেজগুলোয় প্রতিযোগিতায় চলতে শুরু করে। এমনকি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজসমূহ থেকে অনার্স এবং মাস্টার্সে অজপাড়া গাঁয়ের ছেলেমেয়েও ‘ফার্স্ট ক্লাস’ পেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিলেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও এককালে যেসব বিভাগ থেকে কদাচিৎ দুয়েকজন প্রথম শ্রেণি পেতেন, এখন সেখানে ডজন ডজন শিক্ষার্থী প্রতিবছর ‘ফার্স্ট ক্লাস’ পাচ্ছে। এদের ধারণ করার জায়গা কোথাও হচ্ছে না।

এখন চাকরির বাজারে যেসব আবেদনপত্র পড়তে দেখি তাতে মৌখিক পরীক্ষায় শেষ করা একেবারে অসম্ভব হয়ে গেছে। লিখিত পরীক্ষা ভালোভাবে নিলে অনেক গোমরই ফাঁস হয়ে যায়। আমাদের লাখ লাখ সনদধারী শিক্ষার্থী এখন জিপিএ-৫ বা প্রথম শ্রেণির পরিচিতি নিয়ে ধারে ধারে ঘুরছে একটি চাকরির জন্য। তদ্বির এবং উপঢৌকনের মোটা অংকের জোরে অনেকেই তা বাগিয়ে নিতে পারে। তবে মানহীন সনদধারীর সংখ্যা এককথায় বিপুল সংখ্যক।

জানি না এদের নিয়ে আমরা কি করব। ওদের মেধার বিকাশ ঘটানোর সর্বজনীন পদ্ধতির মূল্যায়ন পদ্ধতি বাদ দিয়ে যেভাবে পাবলিক পরীক্ষার জিপিএ পদ্ধতিতে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তাতে নতুন প্রজন্ম জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা থেকে ছিটকে পড়েছে। যে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় অংশই বাজারের গাইড বই, লেকচার শিট, বড় ভাইদের নোট পড়ে জিপিএ-৫ পেয়ে উচ্চশিক্ষতি হতে পারছে সে দেশে শিক্ষার সঙ্গে তামাশা বললে বাড়িয়ে বলা হবে না।

গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাই চলছে গাইড বই, কোচিং নির্ভর, সর্বনিম্ন পর্যায়ের পঠনপাঠনের দায়বদ্ধতা নিয়ে। দক্ষ জনগোষ্ঠী, মানবসম্পদ ইত্যাদি শ্রুতিমধুর শব্দগুলো কানে বাজলেও ওগুলো বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর জীবনে অধরাই থেকে যায়। অথচ ডিজিটাল যুগে অদক্ষ জনশক্তি দিয়ে কিছুই চলে না। সে কারণেই লাখ লাখ দক্ষ কর্মকর্তা বিদেশ থেকে এনে আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে চালাতে হচ্ছে। কবে জানি বিদেশ দেশ পরিচালনার জন্য যোগ্য, মেধাবী.., মিশনারি নেতা ভাড়া করে আনতে হবে সে কথাই ভাবতে হচ্ছে।

৩ লাখ আইসল্যান্ডবাসী, ৪৫ লাখ ত্রেুায়েট, বেলজিক, সুইস, সুইডিশসহ অনেক জাতিই শুধু বিশ্বকাপ ফুটবল খেলে আমাদেরকে তাক লাগিয়েছে তা নয়, জ্ঞান-বিজ্ঞানসহ জীবনের সব ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জনে এরা এমনিভাবে শীর্ষে অবস্থান করছে। আমরা কোথায় আছি, কেন আছি তা ভাববার সঙ্গে সঙ্গে উত্তরণের পথ খুঁজতে হবে প্রকৃত মানসম্মত শিক্ষা লাভের মধ্যেই, শুধু জিপিএ-৫ এর ওঠানামার মধ্যে নয়।
লেখক : অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, বাউবি

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত