প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘মদ, নারী, ভাস্কর্য সবই দারুণ’, তিন পণ্যের বিজ্ঞাপন!

কাকন রেজা: বিশ্বকাপকে ঘিরে রাশিয়া নিয়ে খবর করেছে বিবিসি বাংলা। খবরের শিরোনামটি ছিলো, ‘রাশিয়ার নারী, মদ, ভাস্কর্য সবই দারুণ’। চমকে যাবার মতন শিরোনাম। নারীর সাথে মদ আর ভাস্কর্য, চমকে যাবারই কথা। প্রশ্ন উঠতে পারে নারী, মদ, ভাস্কর্য কি প্যারালাল? নারী কি মদের মতন ভোগ্য কিংবা ভাস্কর্যের মতন উপভোগ্য, নারী কি পণ্য? আমাদের প্রগতিশীল নারীবাদীরা এ ব্যাপারে কী বলেন? না-কী তারা সৌদি আরবের বিষয় হলে বলতেন, প্রগতির সূতিকাগারের বিরুদ্ধে কিছু বলা মানা। হয়তো ওখানের বেশ্যাবৃত্তি, ভাটিখানাও প্রগতিশীল! বলতে পারেন, পোলার নামই তো গুনধর, গুনের খোঁজের আর কী দরকার! বিবিসি খবরটি ফেসবুকে শেয়ার করার সময় লিখলো, ‘রাশিয়া নিয়ে মানুষের মধ্যে বিভিন্ন মিথ আছে, এই বিশ্বকাপে সেটা ভেঙেছে, রাশিয়া উন্মুক্ত দেশ।’ উন্মুক্ত দেশের সংজ্ঞাটা তাহলে এই রকম, ‘যেখানে মদ, নারী সহজলভ্য, যেখানে মদ ও নারী দুটোই পণ্য, যেখানে মদ ও নারী দুটোই ভোগের জিনিস, সেই দেশই উন্মুক্ত।’ কী বলেন নারীবাদীরা?
দেশের তথাকথিত নারীবাদীদের ব্যাপারে প্রথম থেকেই অনেকের ‘নোট’ ছিল স্বার্থকামীতার। তারা বিশেষ স্বার্থে সরব থাকে কিন্তু সত্যিকার প্রয়োজনে নিরব। এই যে, ছাত্রী শুরু করে গৃহিনী, আট মাসের শিশু ষাট বছরের বৃদ্ধা নির্যাতিতা হচ্ছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের সন্তানরা ‘মলেস্ট’ হচ্ছেন। কাগজে তাদের বিপর্যস্ত ছবি দেখছি, টিভিতে, ভার্চ্যুয়াল পর্দায় তাদের হেঁচকি উঠা কান্নারত বক্তব্য শুনছি-দেখছি, এসময় কোথায় সেই সব দুর্দান্ত নারীবাদীরা!
সামাজিক মাধ্যমে একজন লিখলেন, ‘যারা সময়ে অসময়ে এক সময়ের এক ইয়াসমিনের কথা মনে করিয়ে দেয়, তারা কই! আমরা ইয়াসমিনকে ভুলিনি, আর সে কারণেই এখনের হাজারো ইয়াসমিনকে ভোলার প্রশ্নই আসে না।’ যিনি লিখেছেন তার উদ্দেশ্যে বলাই যায়, কার্য-কারণ ছাড়া কিছুই ঘটে না। বিষয়টি জীবন-জীবিকার, এক সময় মানুষ ‘ভাঁড়’ হতো জীবিকার তাগিদেই।
আশার কথা হলো, আমাদের তরুণ প্রজন্মের মোহভঙ্গ হতে শুরু করেছে। তারা ক্রমেই বুঝতে পারছেন তাদের মাথায় যা ঢোকানো হয়েছিল তা সম্ভবত ভুল। বিবিসি’র খবরটির নিচে কমেন্টের জায়গার লেখাগুলো পড়লেই বোঝা যায়, একটা জাগরণ অন্তত তরুণদের মধ্যে ঘটেছে।
গৌরাঙ্গ দেব নামে একজন লিখেছেন, ‘নারীবাদীরা কোথায়? একদম পণ্য করে দিলো এই মিডিয়া’। শুভ্র সরকার নামে একজন ব্যাঙ্গ করে রাশিয়ায় যাবার কারণ হিসাবে লিখলেন, ‘নারী, মদ, ভাস্কর্য সবই দারুণ- এই জন্যে’। আরেকজন লিখলেন, নারী কী পণ্য? বিশ্ব নাকি আধুনিক হয়েছে!’ আরেকজন বললেন, ‘তথাকথিত নারাবাদীরা কিছু বলুন প্লিজ’। চারিদিকে কান পাতলে এভাবেই তরুণদের পুনর্জাগরণের আওয়াজ শোনা যায়। দক্ষিণ এশিয়ার তরুণদের মধ্যে মোহভঙ্গের এই জাগরণ ‘রেনেসাঁ’র সম্ভাবনা জাগিয়ে তোলে। আমাদের দেশেও সেই ‘রেনেসাঁ’র আলোকচ্ছটা ক্রমেই চোখে পড়ছে। ভোগ-বিলাস আর বিভিন্ন ইজমের নামে তরুণদের যেভাবে মোহগ্রস্ত রাখা হয়েছিল, যেভাবে ভাগ করে দেয়া হয়েছিল, সেই বিষয়গুলো ক্রমেই অতিক্রম করে যাচ্ছে আজকের তরুণরা। ক্রমেই তারা বুঝতে শুরু করেছে, তাদের ভাগ করা হয়েছিল, অন্যদের ভোগের সুবিধা দিতে। শ্রেণি সংগ্রামের নামে, ধর্মের নামে, বিভাজনের রাজনৈতিক কূটচালে তাদের বিভ্রান্ত করা হয়েছে, আর সেই বিভ্রান্তির সুযোগ নিয়েছে বিশেষ শ্রেণি।
তবে জাগরণের পথটি সবসময়ই বন্ধুর, এ কথা মনে রাখতে হবে। আর এই বন্ধুর পথে হাঁটতে গিয়ে দেখা হবে বন্ধু বেশি শত্রুর, অভিভাবক বেশি দুরাচারের। দেখা হবে মজলুমের সাথে, হাত পেতে দেবে প্রকৃত বন্ধুজন। আর এই পথই শুদ্ধতার, এই পথই রেনেসাঁ’র।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট/সম্পাদনা: মোহাম্মদ আবদুল অদুদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ