প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শাস্তির অভাবে কমছে না সড়ক দুর্ঘটনা

ডেস্ক রিপোর্ট : রাজধানীর বনানীতে ২০ এপ্রিল বিআরটিসির একটি বাস গৃহকর্মী রোজিনা আক্তারকে ধাক্কা দেয়। রোজিনা পড়ে গেলে বাসটি তার ডান পায়ের ওপর দিয়ে চলে যায়।

এতে তার পা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। রোববার সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের মাত্র চারদিন পরই জামিনে ছাড়া পেয়েছেন বিআরটিসির সেই চালক।
এর আগে ৩ এপ্রিল পান্থকুঞ্জে দুই বাসের চাপায় তিতুমীর কলেজের স্নাতকের শিক্ষার্থী রাজীব হোসেনের ডান হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তিনিও একই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এভাবে প্রতিনিয়তই দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যানুযায়ী, সঠিক মনিটরিংয়ের অভাব ও বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোসহ প্রায় ১১৫টি কারণে এসব দুর্ঘটনা ঘটছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিনিয়ত বিপুলসংখ্যক মানুষ মারা গেলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চালক বা মালিকের উপযুক্ত শাস্তি হয় না। এ কারণেই সড়ক দুর্ঘটনা কমছে না।

জানতে চাইলে বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের (এআরআই) সাবেক পরিচালক ড. হাসিব মোহাম্মদ আহসান যুগান্তরকে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় অভিযুক্তদের শাস্তির নজির নেই। অভিযুক্তদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত হলে বেপরোয়া গাড়ি চালানো অনেকাংশে বন্ধ হবে। এতে সড়ক দুর্ঘটনাও হ্রাস পাবে।

তিনি আরও বলেন, এ ছাড়া হাঁটাচলার সুবিধা না দিলে সড়ক দুর্ঘটনার কোনো সমাধান হবে না। মানুষ হাঁটতে চায়, কিন্তু হাঁটতে পারছে না। শহর এবং গ্রামের সব রাস্তার পাশেই হাঁটার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা (ফুটপাত) থাকতে হবে। আমাদের দেশে নামেমাত্র ফুটপাত রয়েছে।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট লোকজন ফুটপাত ভাড়া দিচ্ছেন। এসব ফুটপাত যদি হাঁটার জন্য ফ্রি করা না যায়, তাহলে বাধ্য হয়ে মানুষ রাস্তায় নেমে আসবে। আর তখন নিরাপত্তার প্রশ্নই অবান্তর। যদি গাড়ি ও মানুষ একই রাস্তায় চলে তাহলে নিরাপত্তা আসবে কী করে? বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই।

সড়কের নিরাপত্তার দাবিতে সামাজিক আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া সংগঠন নিরাপদ সড়ক চাই’র (নিসচা) তথ্যানুসারে, ২০১৭ সালে সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা ২০১৬ সালের তুলনায় বেড়েছে। গত বছর সারা দেশে তিন হাজার ৪৭২টি সড়ক দুর্ঘটনায় চার হাজার ২৮৪ জন নিহত ও নয় হাজার ১১২ জন আহত হয়েছেন।

নিহতের তালিকায় রয়েছেন ৫১৬ নারী ও ৫৩৯ জন শিশু। নিসচা’র তথ্যমতে, ২০১৬ সালে দুই হাজার ৯৯৮টি দুর্ঘটনায় ৪৭০ নারী ও ৪৫৩ শিশুসহ তিন হাজার ৪১২ জন নিহত এবং আট হাজার ৫৭২ জন আহত হয়েছেন। তবে এর আগের বছর ২০১৫ সালে চার হাজার ৫৯২টি দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ছয় হাজার ৮২৩ ও ১৪ হাজার ২৬ জন।
জানতে চাইলে নিসচার চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন যুগান্তরকে বলেন, আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী সব উপকরণই বিদ্যমান রয়েছে। আইন সঠিকভাবে প্রয়োগ হচ্ছে না। তাছাড়া আইনের দুর্বলতাও রয়েছে। রয়েছে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বে অবহেলা। গত ৪৭ বছরেও চালকদের প্রশিক্ষিত করার সুযোগ কেউ করে দেয়নি, যা সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। মানুষ এখন বুঝতে শিখছে যে, দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব। সমাজের সব স্তরের মানুষ সচেতন হলেই ৮০ ভাগ সড়ক দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় অভিযুক্তদের শাস্তি হয় না। পরিবহন শ্রমিকরা এটা মানতেই রাজি নন যে- দুর্ঘটনা রোধ সম্ভব। তারা মনে করেন, রাস্তায় গাড়ি বের করলে দুর্ঘটনা ঘটবেই। অপরাধীদের সাজার নজির সৃষ্টি হলে চালকসহ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে দায়িত্বশীলতা বাড়বে।

এদিকে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যানুসারে, গত বছর (২০১৭) ৪ হাজার ৯৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় সাত হাজার ৩৯৭ জন নিহত ও ১৬ হাজার ১৯৩ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে হাত, পা বা অন্য কোনো অঙ্গ হারিয়ে চিরতরে পঙ্গু হয়েছেন এক হাজার ৭২২ জন। আর ২০১৬ সালে চার হাজার ৩১২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ছয় হাজার ৫৫ জন নিহত ও ১৫ হাজার ৯১৪ জন আহত হয়েছিলেন।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ১১৫টি কারণ জড়িত। এর মধ্যে পাঁচটি বড় কারণ হল- দক্ষ চালকের অভাব, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, রাস্তাঘাটের বেহাল দশা ও আইনের অপপ্রয়োগ। এ পাঁচটি কারণ যদি ওভারকাম করা যায় তাহলে সড়ক দুর্ঘটনা একটা সহনীয় পর্যায়ে চলে আসবে।

চালক-মালিকের ‘পক্ষে’ পুলিশ : সড়ক দুর্ঘটনায় ৮০ ভাগ অপমৃত্যুর মামলা হয়। বাকি ২০ ভাগ নিয়মিত মামলায় পুলিশ ও আইন কর্মকর্তাদের গাফিলতিতে অপরাধীরা উপযুক্ত শাস্তি থেকে পার পেয়ে যাচ্ছেন। বাসের চালক ও মালিককে শুরুতেই পুলিশ লঘু শাস্তির ব্যবস্থা করে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনায় কেউ মারা গেলে বর্তমানে দণ্ডবিধির ৩০৪(খ) ধারায় মামলা করা হয়। বিচারও সম্পন্ন হয় এ ধারাতেই। ৩০৪ ধারায় চালকদের বিচারে বাধা না থাকলেও অজ্ঞাত কারণে পুলিশ এ ধারায় মামলা করে না।

জানতে চাইলে ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি কাজী মো. নজিবুল্লাহ হিরু যুগান্তরকে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার শাস্তি হওয়া উচিত সর্বোচ্চ ২০ বছর কারাদণ্ড, কমপক্ষে ১০ বছর। এর সঙ্গে বড় অঙ্কের জরিমানা ও লাইসেন্স বাতিল করে শাস্তির দু-চারটি নজির সৃষ্টি করতে পারলেই চালকদের মধ্যে একটা সচেতনতা সৃষ্টি হতো ও সবাই সাবধান থাকত। এ ধরনের মামলায় শাস্তির নজির খুবই কম। একপর্যায়ে গিয়ে মামলার বাদী-বিবাদীর মধ্যে আপস হয়ে যায়। সাধারণত দুর্ঘটনার জন্য দণ্ডবিধির ৩০৪(খ) ধারাতেই মামলা হয়। তবে সেক্ষেত্রে যদি ড্রাইভারের লাইসেন্স না থাকে ও বিষয়টি উদ্দেশ্যমূলক হয় তাহলে অবশ্যই ৩০৪ ধারায় মামলা করতে হবে।

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) জনসংযোগ শাখার উপ-কমিশনার (ডিসি) মাসুদুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, মূলত সড়ক দুর্ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তি অথবা বাদীর দেয়া বর্ণনা অনুযায়ী এজাহার তৈরি করা হয়। তদন্তে সাক্ষ্য-প্রমাণে যদি উদ্দেশ্যমূলক হত্যার বিষয়টি প্রমাণ হয় সেক্ষেত্রে ধারা পরিবর্তন করে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দেয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে পুলিশের কোনো গাফিলতি নেই। সূত্র : যুগান্তর

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত