প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ভারত-জাপানের আফ্রো-এশিয়া করিডোরের সদস্য হতে পারে আরও দেশ

ডেস্ক রিপোর্ট : প্রধান সহযোগী ভারতকে সাথে নিয়ে জাপান যে ‘এশিয়া আফ্রিকা গ্রোথ করিডোর’ (এএজিসি) প্রকল্প শুরু করেছে তাতে কালক্রমে আসিয়ানের ১০ সদস্য দেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার যুক্ত হওয়ার বিষয়ে আশাবাদী জাপান। চীনের ওবিওআর প্রকল্পের জবাবে নেওয়া জাপান-ভারতের এএজিসি ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার ব্যপক সমর্থন পেয়েছে। চীনের ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোডের’ মতো এএজিসিও স্থলপথে যোগাযোগ ও সমুদ্রবন্দরের সাথে সংযোগ নিশ্চিত করার দিকে মন দিয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুল সেখানে এ বিষয়ে আলাপ করবেন।

চীনের ওবিওআর প্রকল্পের জবাবে পাল্টা প্রকল্পের উদ্যোগ নিয়ে জাপান ও ভারত কাজ শুরু করলেও পরে যুক্তরাষ্ট্র উৎসাহ ব্যক্ত করে। ভারতীয় পর্যবেক্ষকরা জানিয়েছেন, মূলত দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের অব্যাহত প্রভাব বিস্তারের প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র এ প্রকল্পে যুক্ত হতে আগ্রহী। এএজিসিভুক্ত এলাকার সমুদ্রপথে যোগাযোগ এবং ভারত সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সমুদ্রবন্দরগুলোর মধ্যে আন্তঃসংযোগ স্থাপনে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র।

উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে মধ্যএশিয়া ও আরও দূরের দেশগুলোর মধ্যে আন্তঃসংযোগ স্থাপনের জন্য ‘নিউ সিল্ক রোড’ (এনএসআর) প্রকল্পের প্রস্তাব পুনরায় বিবেচনা করছে। বরাক ওবামা ও হিলারি ক্লিনটন উভয়ের সমর্থন পেলেও এনএসআর প্রকল্প থমকে গিয়েছিল আফগানিস্তান থেকে তুরস্ক পর্যন্ত পশ্চিম এশিয়ার বেশিরভাগ এলাকায় ও অস্থিতিশীল থাকায়।

হিলারি ক্লিনটন এ করিডোরের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন, তাজিকিস্তানের তুলা যাতে ভারতের তাঁতিদের হাতে পৌঁছায়, আফগানিস্তানের ফল ও আসবাবপত্র যাতে মুম্বাই ও আস্তানার মতো শহরে বিক্রি হয়, এমন চিন্তা থেকেই ওই আন্তঃসংযোগ প্রকল্পের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এনএসআর বাস্তবায়িত হলে ভারত ও পাকিস্তান তাদের জ্বালানির প্রয়োজন পূরণে তুর্কেমেনিস্তানের গ্যাস ব্যবহার করতে পারবে। অন্যদিকে আফগানিস্তান নিয়মিত টোল আদায় করে আয় করতে পারবে। পরিহাসের বিষয় হচ্ছে, উদ্যমী চীনকে দেখেই তার বিরুদ্ধে পাল্লা দিতে ভারত, জাপান ও অন্যান্য দেশ আন্ত:মহাদেশীয় আন্তঃসংযোগ স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে।
চীন যে শুধু ‘চায়না পাক ইকোনোমিক করিডোরের’ বাস্তবায়ন এগিয়ে নিচ্ছে তা নয়, তারা পূর্বে ‘বাংলাদেশ চীন ভারত মিয়ানমার করিডোর’ (বিসিআইএম) প্রকল্পের কাজও অনেকাংশে শেষ করে ফেলেছে। ভারতের অনাগ্রহ কাজ না করলে এতো দিনে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন শেষ হয়ে যেত। এছাড়া চীন আফ্রিকার দিজিবুতি থেকে পাকিস্তানের গাদার, শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা থেকে মিয়ানমারের বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প পর্যন্ত সব প্রকল্পের নির্মাণকাজ দ্রুত গতিতে শেষ করার চেষ্টা করছে। ওবিওআর প্রকল্পে চীনের বিনিয়োগ ১৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এসব তথ্য উল্লেখ করার কারণ এটা নয় যে এএজিসি—ওবিআরের সঙ্গে পার্থক্য স্পষ্ট করতে যাকে ফ্রিডম করিডোর নামেও ডাকা হয়—এবং প্রাসঙ্গিক প্রকল্পগুলো টাকার অভাবে আটকে আছে। কাজ শুরু করার জন্য জাপান ইতোমধ্যে ৩ হাজার কোটি টাকা দেওয়ার ওয়াদা করেছে। একবার কাজ শুরু হয়ে গেলে জাপানের প্রভাবাধীন এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) কাছ থেকে সহায়তা পাওয়া সম্ভব হবে। ইতোমধ্যে, জাপান ভারতের উত্তর-পূর্বে বেশ কয়েকটি সড়ক ও মিয়ানমারে থাইল্যান্ড সীমান্তের কাছে দাউই বন্দর নির্মান প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে।

সাম্প্রতিককালে জানা গেছে, জাপানের শিল্পপতিরা ইউরোপের কাছে আফ্রিকার পশ্চিমে জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদ খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। জাপানের গণমাধ্যম জানিয়েছে, জাপান আশা করছে, পূর্বদিকে এরকম উদ্যোগ নিলে আসিয়ানভুক্ত দেশসমূহ ও দক্ষিণ কোরিয়াকে পাশে পাওয়া যাবে। জাপানের জন্য কাজটি রাজনৈতিকভাবে কিছুটা সহজ হবে। কারণ মিয়ানমার ছাড়া আসিয়ানের অন্যান্য দেশগুলো সাগরে চীনের আগ্রাসী উপস্থিতি ও চীনের সুদূরপ্রসারী অভিসন্ধির বিষয়ে চিন্তিত।

প্রকল্পগুলো শুরু হয়ে গেলে চার দেশ—জাপান, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত—ব্যাংক, স্থানীয় বেসরকারি খাত ও দাতাদের মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক ব্যবসা বাণিজ্য বাড়িয়ে তোলার মাধ্যমে নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন ও বিদ্যমান শিল্পকারখানাগুলোর উন্নয়নে সাহায্য করতে পারবে। চীনের নেতৃত্বাধীন প্রকল্পে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার তিক্ত অভিজ্ঞতা ‘ফ্রিডম করিডোরের’ জন্য বাড়তি সুবিধা এনে দেবে। উভয় দেশে সাধারণ মানুষ ও নাগরিক সমাজের পাশাপাশি বিরোধী দলগুলোও অসন্তুষ্ট। আর্থিক বিষয় ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণে চীনের মনোভাব সামন্তবাদী, এমন অভিযোগ তাদের। এছাড়াও, দেশগুলোতে চীন রাজনৈতিকভাবে যে প্রভাব বিস্তার করেছে তাতেও অসন্তুসষ্ট পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মানুষ।

পাকিস্তানের কিছু স্থানে ম্যান্ডারিন ভাষা শেখা বাধ্যতামূলক হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও চীনা মুদ্রা উয়ানে লেনদেনও হয়। আর শ্রীলঙ্কা যদি সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দর প্রকল্পে খরচ করা টাকা চীনকে ফেরত দিতে না পারে তাহলে ওই বন্দরগুলো চীন নিয়ে নেবে, চীনের পক্ষ থেকে এটা স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। এর সাথে তুলনা করে দেখা যেতে পারে যে জাপানের দেওয়া ঋণের শর্ত কতটা শিথিল; মুম্বাই থেকে আহমেদাবাদ পর্যন্ত বুলেট ট্রেন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য জাপান ভারতকে ০.৫ শতাংশ সুদে কয়েক হাজার কোটি টাকার কুড়ি বছর মেয়াদী ঋণ দিয়েছে, অন্য কোন শর্ত ছাড়াই!
কলকাতার একজন বিশ্লেষক বলেছেন, যদিও শ্রীলঙ্কা উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য চীনের সাহায্য নেয়, তারা কিন্তু ভারতের সিপিইসি বয়কট করার সিদ্ধান্তের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়েছে। শ্রীলঙ্কার মন্ত্রী শারাথ আমানুগাম সম্প্রতি বলেছেন, ‘সিপিইসির পথ যেভাবে প্রস্তাব করা হয়েছে তাতে ভারতে স্বার্থ বিনষ্ট হওয়ারই কথা। যদি অধিকৃত কাশ্মীর না হয়ে অন্য কোনও বিতর্কিত এলাকা দিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব করা হতো তাহলে বিষয়টা অন্যরকমভাবে দেখা যেত। কাশ্মীর প্রসঙ্গ ভারতের পক্ষে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।’ আপাতত মনে হচ্ছে, আমানুগামের মনোভাবই আগামী সময়ে শ্রীলঙ্কার মনোভাব হয়ে টিকে থাকবে। ১৯৮৭ থেকে ১৯৯০ সাল মেয়াদে ভারতের শান্তিরক্ষী বাহিনীর গোয়েন্দা প্রধানের দায়িত্ব পালন করা আর হারিহারান মনে করেন, চীনা ঋণের চাপে পিশে যাওয়া শ্রীলঙ্কার জন্য ভারতের সাহায্যের হাত যেকোনও সময়ের চেয়ে এখন বেশি জরুরি। সুতরাং ধরে নেওয়া যায়, শ্রীলঙ্কা ভারতের সাথে সমঝোতা রেখেই তার নীতি প্রণয়ন করবে, শ্রীলঙ্কার শাসন ক্ষমতায় কোনও পরিবর্তন এলেও।’ সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত