প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বগুড়ার ঘাটে ঘাটে ইয়াবা

ডেস্ক রিপোর্ট : করতোয়া নদীর বুক চিরে গড়ে ওঠা বাণিজ্য নগরীখ্যাত জেলা উত্তরাঞ্চলের বগুড়া। এখানে দিনের পর দিন গড়ে উঠছে নতুন নতুন ব্যবসা-বাণিজ্য। তাল মিলিয়ে গড়ে উঠেছে নানা শিল্পকারখানাও। উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে জনপ্রিয় বাণিজ্যনগরী বগুড়ায় এমন কোনো ব্যবসা নেই, যার এখানে অস্তিত্ব নেই। আর এসব ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে তালমিলিয়ে মাদকেরও রয়েছে রমরমা বাণিজ্য। এখানে অনেকটা ফ্রি স্টাইলে চলছে মাদকের ব্যবসা। শহরের অলি-গলিতে বিভিন্ন কৌশলে চলছে মরণনেশা ইয়াবার ব্যবসা। এ ব্যবসা করে রাতারাতি লাখো কোটি টাকার মালিক বনেছেন অনেকেই। সড়কপথে উত্তরের ১৬ জেলার গেটওয়ে এই বগুড়া। রয়েছে ট্রেন যোগাযোগও। আর এই সুবিধায় উত্তরাঞ্চলের ইয়াবার হাট হিসেবে বগুড়াকে ব্যবহার করছে মাদক ব্যবসায়ীরা। ফলে হাত বাড়ালেই মিলছে ইয়াবাসহ নানান মাদক।

কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে ইয়াবার বড় বড় চালান এখন সরাসরি চলে আসছে বগুড়ায়। আর এখান থেকেই ভাগবাটোয়ারা হয়ে বিভিন্ন রুটে অনেকটা বিনা বাধায় উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। এই বগুড়াকে অঘোষিতভাবে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা নতুন ট্রানজিট বানিয়েছে। বগুড়ার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহজেই ম্যানেজ করা যায়— তাই এখানে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের আধিপত্য বেশি। শুধু তাই নয়, বগুড়ার প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও এই মরণনেশা ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। সবমিলে বগুড়া শহরেই গড়ে উঠেছে মাদক ব্যবসায়ীদের সাম্রাজ্য। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখের সামনে ইয়াবার ব্যবসা করলেও বাধা দিচ্ছেন না তারা। বগুড়া পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আফসোস করে বলেন, ‘বগুড়াকে ২৪ ঘণ্টায় মাদকমুক্ত করা যাবে। কিন্তু কিছু ভাইদের জন্য পারছি না।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ট্রেনযোগে আসা ইয়াবার চালান বগুড়া ট্রেন স্টেশনের পাশেই চিহ্নিত কয়েকটি এলাকার বাসা-বাড়িতে স্টক করা হয়। এর

মধ্যে হাড্ডিপট্টি, চকসূত্রাপুর, সুইপারপট্টি, সেওজগাড়ি উল্লেখযোগ্য। আর যাত্রীবাহী বাসে আসা ইয়াবার চালান বনানী মোড়, মাটিডালি, চেলোপাড়া, বাসস্ট্যান্ড, নাড়ুলি, সান্দারপট্টি, দত্তবাড়িসহ বেশ কয়েকটি স্পটে স্টক করা হয়। বগুড়া শহরের বাইরের কিছু পয়েন্ট থেকেও ইয়াবা পাঠানো হয় বিভিন্ন জেলায়। ঢাকা থেকে রংপুর, নাটোর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, দিনাজপুর, জয়পুরহাট সড়কপথের কেন্দ্রস্থল বগুড়া। আর এতে বগুড়ার গুরুত্ব অনেক বেশি। বগুড়ার বনানী, মাটিডালি, ঠনঠনিয়া ও রেলস্টেশন এলাকায় ইয়াবা ব্যবসায়ীদের ছদ্মবেশে অবস্থান করতে দেখা যায়। এসব কৌশলী ব্যবসায়ীরা স্টেশনে ট্রেন ও বাস আসামাত্রই ইশারা-ইঙ্গিতে ইয়াবাসহ নানা ধরনের মাদক নিয়ে নিরাপদে চলে যান। অন্যদিকে ভোর রাতে নাইটকোচের মাধ্যমে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম থেকে ইয়াবার চালান এসে ভাগবাটোয়ারা হয়ে বিভিন্ন পথে চলে যায়। বগুড়া শহরের মালতিনগর, সেউজগাড়ী, বৃন্দাবনপাড়া, পুরান বগুড়া, খান্দার, চেলোপাড়া, ঠনঠনিয়া, নামাজগড়, চকসূত্রাপুর, বাদুড়তলা, জহুরুল নগর, জ্বলেশ্বরীতলা, হাড্ডিপট্টি, মাটিডালি, তিনমাথা রেলগেট, স্টেশন রোড, চেলোপাড়া, রহমান নগর, বখশী বাজার, কলোনি, বনানী ও শাজাহানপুর এলাকায় চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীরা ঘাঁটি গেড়েছেন বলে জানা গেছে। বগুড়ার একজন করে সিন্ডিকেটের প্রধান হয়ে ২০টি স্থানে বানিয়েছেন ইয়াবার পাইকারি আড়ত। ওই সিন্ডিকেট প্রধানের অধীনে রয়েছে কয়েকজন করে বেতনভোগী মাঠকর্মী। তবে বগুড়ার সব ইয়াবা-মাদক ব্যবসায়ীর গডফাদার একজনই। আর এই গডফাদার হলেন, জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল আলম মোহন। তবে মোহন কখনো সরাসরি এই কারবার করেন না।

মাঠপর্যায়ে গডফাদারি করেন সামছুদ্দিন শেখ হেলাল, তুফানের ভাই মতিন সরকার, আবদুল মান্নান ওরফে ফেম মান্নান। এদের মধ্যে সামছুদ্দিন শেখ হেলাল বগুড়া পৌরসভার কাউন্সিলর, জেলা শ্রমিক লীগ ও জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন ফেডারেশনের রাজশাহী বিভাগের যুগ্ম সম্পাদক। অপরদিকে মতিন সরকার বগুড়ার সবচেয়ে আলোচিত নাম তুফান সরকারের ভাই ও বহিষ্কৃত যুবলীগ নেতা। আর আবদুল মান্নান ওরফে ফেম মান্নান বগুড়া জেলা ট্রাক মালিক সমিতির সভাপতি। আর এদের ছত্রছায়াই চলে বগুড়ার সব মাদক ব্যবসা। এই সিন্ডিকেট পুলিশের সঙ্গে দৈনিক ও মাসিকভাবে একটি মাসোয়ারা দিয়ে চালানো হয় এই মরণনেশা মাদকের ব্যবসা। বগুড়া শহরে বা জেলায় এমন কেউ নেই যারা এদেরকে মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে চেনেন না। যাত্রীবাহী বাসের চালক, হেলপারকে দিয়ে বগুড়া জেলার বিভিন্ন এলাকা ও উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় বাধাহীনভাবে পৌঁছে দেওয়া হয় ইয়াবার বড় বড় চালান। আর ফেম মান্নানের ট্রাকের চালক ও হেলপার দিয়ে একইভাবে ইয়াবার চালান পাঠানো হয় বিভিন্ন স্থানে। তবে তুফানের ভাই মতিন সরকার শহরের নিজ বাড়িতে ইয়াবার আস্তানা গেড়ে ব্যবসা চালাচ্ছেন।

বগুড়া জেলা ট্রাক মালিক সমিতির সভাপতি আবদুুল মান্নান ওরফে ফেম মান্নান মাদকের ব্যবসার কথা অস্বীকার করে বলেন, আমি শুধু ট্রাকের ব্যবসা করি। অস্বীকার করেন সামছুদ্দিন শেখ হেলালও। এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বগুড়া থেকে ইয়াবার চালান আনতে বিভিন্ন কৌশলে কারবারিয়া যায় ইয়াবার রাজধানীখ্যাত কক্সবাজারে। আর ওখানে কয়েকদিন অবস্থান করে তারা ইয়াবার বড় বড় চালান নিয়ে সরাসরি বগুড়া আসেন। পরে ওই সব ইয়াবা উত্তরের বিভিন্ন জেলায় পৌঁছে দেওয়া হয়। এসব চালান বহনকারীরা স্বামী-স্ত্রী সেজে প্রথমে চট্টগ্রাম যান। পরে আলাদা হয়ে যার যার মতো কক্সবাজার চলে যান। এদের কক্সবাজার থেকে বগুড়া আসতে বিভিন্ন পয়েন্টে সহযোগিতা করারও লোক রয়েছে। এরা একেক সময় একেক কৌশল অবলম্বন করেন। বগুড়া পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ২০১৭ সালেই বগুড়া জেলায় মাদকের মামলা হয়েছে ২ হাজার ৫১১টি। মাদকের সঙ্গে জড়িত এমন গ্রেফতার হয়েছে ৩ হাজার ১৪৭ জন। এ ছাড়া ১ লাখ ৮ হাজার ৫২৬ পিচ ইয়াবা, ৯ হাজার ২৬৮ বোতল ফেনসিডিল, ৫৭৮ কেজি গাঁজা, সাড়ে ৩ কেজি হিরোইনসহ বিভিন্ন নেশা জাতীয় দ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে। বগুড়ার যুদ্ধকালীন কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেন মোফা বলেন, স্বাধীন দেশে অন্য কিছুর সঙ্গে তাল মিলিয়ে এখন মাদকও ছড়িয়ে গেছে। মাদক যুব সমাজকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছে। তবে পুলিশ ইচ্ছে করলেই বগুড়াকে মাদকমুক্ত করতে পারে। বগুড়া সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এমদাদ হোসেন মাদক ব্যবসার সঙ্গে পুলিশের সহযোগিতার বিষয়টি সত্য নয় বলে জানান।

কখনো কখনো ট্রাক বা প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাসে ইয়াবা নিয়ে বগুড়ায় এলে পুলিশ আটক করে ঠিকই। কিন্তু মূল ব্যবসায়ীকে ছেড়ে দিয়ে শুধু চালককে আটক করে রাখেন। আর এর পেছনের কারণ বড় ধরনের আর্থিক লেনদেন। শুধু তাই নয়, ইয়াবার বড় চালান থানা পুলিশের নিকট আটক হলেও অধিকাংশ সময় আটককৃত ইয়াবা পুনরায় ওই কারবারির হাতে চলে যায় বিক্রির উদ্দেশ্যে। একটি সূত্রে জানা গেছে, বগুড়ার ফেনসিডিলের সিংহভাগ চালান সরবরাহ করেন জয়পুরহাটের শাহাদত নামের এক মাদক ব্যবসায়ী। জয়পুরহাট জেলা পুলিশের তালিকাভুক্ত চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী শাহাদত পালিয়ে এসে বগুড়া শহরের ফুলবাড়ী এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে অবস্থান করে ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন। সম্প্রতি শাহাদতের একটি বড় চালান আটক করে বগুড়া জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। ওই ঘটনায় মামলা হলেও শাহাদাত ও আরেক শীর্ষ মাদক কারবারি রজবের নাম বাদ দেওয়া হয়। শহরের নামাজগড় সুলতানগঞ্জ পাড়া এলাকার দীপ্তি নামের এক ইয়াবা ব্যবসায়ী রয়েছেন। তিনি ওই এলাকায় ইয়াবা সম্রাট হিসেবে পরিচিত। এ ছাড়াও চকসূত্রাপুরের এজদা পাগলীর মেয়ে রীনা, জহুরুল নগরের শাবানা, সেওজগাড়ির আলমের স্ত্রী তাসলি, জহুরুলপাড়ার শাবানা, শাহাদত, রজব, জলিল, বাদুড়তলার শামীম, খান্দারের মুন্না, জ্বলেশ্বরীতলার রাজীব, হাড্ডিপট্টির বকরি শামীম, নামাজগড়ের রফিকুল, চকসূত্রাপুরের রজ্জব, আপেলসহ শতাধিক চিহ্নিত ইয়াবা ব্যবসায়ী রয়েছেন। এ ছাড়াও গাবতলী উপজেলার বুলবুল নামের এক যুবক সমিতি ব্যবসার আড়ালে জহুরুলনগর ও হাড্ডিপট্টি এলাকায় ইয়াবার ব্যবসা করছেন প্রকাশ্যে। শুধু তাই নয়, নামাজগড় এলাকায় রফিক নামের এক ইয়াবা ব্যবসায়ী সিসি ক্যামেরা লাগিয়ে প্রকাশ্যে ইয়াবা বিক্রি করছেন। পুলিশের নাকের ডগায় এই মরণনেশার ব্যবসা করলেও কেউ কিছু বলেনি। যদিও সম্প্রতি র‌্যাব-১২ একটি দল তাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে।

ইয়াবা ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন সময় পুলিশের হাতে গ্রেফতার হলেও জামিনে বের হয়ে আবারও মরণনেশার ব্যবসায় নেমে পড়েন। কারণ এ ব্যবসা যারা করেন তাদের বেশিরভাগই এখন কোটি কোটি টাকার মালিক। ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঝুঁকি এড়াতে অন্য যে কোনো পেশার চেয়ে এ পেশায় অতি কৌশলী হতে হয়। কিছুদিন পর পর বদলাতে হয় কৌশল। তবে পুরুষের চেয়ে নারীরা এ পেশায় বেশ যোগ্য ও নিরাপদ। মাদক ব্যবসায়ীরা জানান, বগুড়া পুলিশকে সহজেই টাকা দিয়ে কেনা যায়। আর এ সুযোগে ইয়াবা ব্যবসা করা হচ্ছে। বিশেষ করে নারীরা গায়ে মাদকদ্রব্য পেঁচিয়ে বহন করেন। অভিযোগ রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সদস্য ওইসব ইয়াবা ব্যবসায়ীর কাছ থেকে নিয়মিত মাসোয়ারা নিয়ে থাকেন। পুলিশ জানায়, মাদক ও মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে শহরের একাধিক সভা-সমাবেশ করা হচ্ছে। বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে মাদকসহ মাদক ব্যবসায়ীদের আটক করে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। মাদক ব্যবসা বন্ধে পুলিশের চেষ্টার কমতি নেই বলেও জানায় পুলিশ। বগুড়া সদর সার্কেল অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ‘আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি বগুড়াকে মাদকমুক্ত করতে। তবে শুধু পুলিশ নয়, পুলিশের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিরা সহযোগিতা করলেই মাদক থেকে বগুড়াকে মুক্ত করা সম্ভব।’ বাংলাদেশ প্রতিদিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত