প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মতিনের বিপুল অর্থের উৎস খোঁজা হচ্ছে

ডেস্ক রিপোর্ট : আলোচিত লেকহেড গ্রামার স্কুলের মালিক খালেদ হোসেন মতিনের অর্থের উৎস খুঁজছেন গোয়েন্দারা। ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিসানে হামলার পর নানাভাবে আলোচনায় আসে লেকহেড। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সংশ্নিষ্ট অন্তত ২৬ জন নানাভাবে জঙ্গিবাদের সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে। গোয়েন্দারা বলছেন, হলি আর্টিসানের পর এ প্রতিষ্ঠানের মালিকানা বদল হয়। রেজোয়ান হারুনের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এটি কিনে নেন মতিন। তবে জঙ্গি কার্যক্রমে পৃষ্ঠপোষকতা ও উৎসাহ দেওয়ার অভিযোগে গত নভেম্বরে লেকহেড গ্রামার স্কুল বন্ধ করে দিয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। পরে ঢাকার বিভাগীয় কমিশনারকে সভাপতি এবং সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের নিয়ে পরিচালনা পর্ষদ করে স্কুলটি চালুর নির্দেশ দেন সর্বোচ্চ আদালত। এর পরও স্কুলটি মালিক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনায় চালানোর জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করাতে দেনদরবার শুরু করেন মতিন। ঘুষ দেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন ও মন্ত্রণালয়ের উচ্চমান সহকারী নাসির উদ্দিনকে। গত রোববার রাতে মতিনসহ তিনজনকে গ্রেফতার দেখায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।

এদিকে মতিনের বিশাল অর্থের উৎস খতিয়ে দেখছে পুলিশ। কেন জঙ্গিবাদে সংশ্নিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠান কিনতে তিনি এত টাকা ঢেলেছেন- সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে। এ প্রতিষ্ঠানের নেপথ্যে বর্তমানে আর কারা রয়েছেন, মালিকানা বদলের নেপথ্যে আবারও উগ্রবাদ চর্চার পরিকল্পনা ছিল কি-না- এসব বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে। পুলিশের একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা গতকাল এসব তথ্য জানান।

এদিকে গ্রেফতার তিনজনের বিরুদ্ধে গতকাল দুটি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছিল। সন্ত্রাস দমন আইনে দায়ের করা মামলায় আসামি করা হচ্ছে লেকহেড গ্রামার স্কুলের মালিক মতিনকে। এ ছাড়া ঘুষ লেনদেনে জড়িত থাকার অপরাধে আরেকটি মামলায় মতিন, শিক্ষামন্ত্রীর পিও মোতালেব ও উচ্চমান সহকারী নাসিরকে আসামি করা হচ্ছে। এর পর আদালতের অনুমতি নিয়ে তাদের হেফাজতে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করবে পুলিশ।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ডিবির যুগ্ম কমিশনার আবদুল বাতেন গতকাল বলেন, লেকহেড গ্রামার স্কুল চালু করতে প্রতিষ্ঠানটির মালিক শিক্ষামন্ত্রীর পিও এবং উচ্চমান সহকারীকে ঘুষ দিয়েছিলেন।

ডিবির একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিক তদন্তে তারা জানতে পেরেছেন, লেকহেড গ্রামার স্কুল বন্ধ করে দেওয়ার পর মোতালেব, নাসিরসহ কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন মতিন। স্কুল চালাতে কোনো সমস্যা হবে না- এ কথা জানিয়ে মতিনের কাছ থেকে দুই দফায় ৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা নেন মোতালেব ও নাসির। পুলিশ গ্রেফতারের সময় নাসিরের কাছ থেকে ঘুষের ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা উদ্ধার করে।

একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, হলি আর্টিসানের পর ২০ কোটি টাকার বিনিময়ে লেকহেড গ্রামার স্কুলের মালিকানা বদল হওয়ার তথ্য তারা পেয়েছেন। তবে বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে নিশ্চিত হতে মালিকানা বদলের চুক্তিপত্র খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ছাড়া নামে-বেনামে থাকা মতিনের অর্থের হিসাব ও তার উৎস অনুসন্ধান শুরু করেছে পুলিশ। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে চিঠি দেওয়া হবে।

তদন্তের সঙ্গে যুক্ত একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মতিনের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন নাসির। তিনি বলেছেন, ‘সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে তাকে যেন ক্ষমা করে দেওয়া হয়।’ তবে নাসির উচ্চমান সহকারী হয়ে তার বিলাসী জীবন-যাপনের পেছনে ব্যয় করা অর্থের হিসাব দিতে পারেননি গোয়েন্দাদের। অপরদিকে পিও মোতালেব দাবি করেছেন, পরিচিতজনদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে পশ্চিম ধানমণ্ডিতে বাড়ি তৈরি করছেন তিনি। তবে কারা তাকে এত টাকা ঋণ দিয়েছেন, তার সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।

সংশ্নিষ্টরা আরও জানান, লেকহেড গ্রামার স্কুলের মালিকের কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে দুটি গুরুতর অপরাধ করেছেন শিক্ষামন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ও উচ্চমান সহকারী। প্রথমত- তারা ঘুষ নেওয়ার মতো অপরাধ করেছেন। দ্বিতীয়ত- এমন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঘুষ নিয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদে জড়িত থাকার সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের ওপর অনেক দিন ধরে নজর রাখা হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত তারা নাটকীয়ভাবে গ্রেফতার হলেন। তবে এ চক্রের আরও অনেককে শিগগিরই আইনের আওতায় আনা হবে। গ্রেফতার তিনজনের তথ্যের ভিত্তিতে আরও কয়েকটি স্থানে অভিযান চলছে।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) একাধিক কর্মকর্তা জানান, হিযবুত তাহ্‌রীর, আনসার আল-ইসলাম, আল-কায়েদা ইন অ্যারাবিয়ান পেনিনসুলা (একিউএপি), নব্য জেএমবি ও মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন আনসার আল বাইয়্যাত আল মাকদিসের মতো উগ্রপন্থি সংগঠনে জড়িত ছিল লেকহেড গ্রামার স্কুলের অন্তত ২৬ শিক্ষক-কর্মকর্তা। মিরপুরে পুলিশের অভিযানে নিহত মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলামও লেকহেড গ্রামার স্কুলের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি করত। এ ছাড়া ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের বিমান উড়িয়ে দেওয়ার চক্রান্তে জড়িত থাকার অভিযোগে যুক্তরাজ্যে গ্রেফতার রাজীব করিমও এক সময় লেকহেড গ্রামার স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। রাজীব বর্তমানে ব্রিটেনের কারাগারে বন্দি। রাজীবের ভাই তেহজীব করিম ও তেহজীবের স্ত্রী সিরাতের বিরুদ্ধেও জঙ্গিবাদে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তারা দু’জনই লেকহেড গ্রামার স্কুলের শিক্ষক ছিল। ২০১০ সালে ইয়েমেনে জঙ্গিবিরোধী অভিযানে গ্রেফতার হয়েছিল তেহজীব। তার শ্বশুর এ রশিদ চৌধুরী এক সময় লেকহেড গ্রামার স্কুলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। গোয়েন্দারা জানান, ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর লেকহেড গ্রামার স্কুলের প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন জেনিফার আহমেদ। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গোলাম মাওলার স্ত্রী। তাদের দু’জনের বিরুদ্ধে হিযবুত তাহ্‌রীরের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। গোলাম মাওলা ও জেনিফারের পর লেকহেড গ্রামার স্কুল পরিচালনায় আসেন হারুন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মালিক হারুন অর রশিদ ও তার ছেলে রেজোয়ান হারুন। দু’জনেই জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ত বলে অভিযোগ আছে। রেজোয়ান হারুনের সঙ্গে এবিটির শীর্ষ নেতা কারাবন্দি জসিমুদ্দিন রাহমানি, রেজওয়ানুল আজাদ রানার সুসম্পর্ক ছিল। তাদের কাছ থেকেই প্রতিষ্ঠানটি হাতবদল হয়ে মতিনের কাছে যায়।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত