প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আমদানির মাছে মারাত্মক রাসায়নিক

ডেস্ক রিপোর্ট : আমদানি করা প্রায় সকল ধরনের মাছে অতিমাত্রায় ক্ষতিকর রাসায়নিক পাওয়া যাচ্ছে, যা মানব স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। এ অবস্থায় বিদেশ থেকে আমদানি করা সব মাছ খালাসের আগে নির্ধারিত ল্যাবরেটরিতে শতভাগ পরীক্ষা করার অনুরোধ জানিয়েছে সরকারের নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। সম্প্রতি সংস্থাটির পক্ষ থেকে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে পাঠানো চিঠিতে এই অনুরোধ জানানো হয়। এদিকে খাদ্য অধিদপ্তরও বলছে, আমদানি করা কিছু মাছে ক্ষতিকর রাসায়নিক থাকে। বিচ্ছিন্নভাবে করা ল্যাবরেটরির পরীক্ষায় মাঝে মাঝে সেটা ধরাও পড়ে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা সামুদ্রিক মাছে এর পরিমাণ বেশি থাকায় এসব মাছ আমদানি না করতে দুই বছর আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠিও পাঠানো হয়েছে। সংশ্নিষ্ট দপ্তরগুলো বলছে, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চিঠি পাওয়ার পর এই প্রথম আমদানি করা মাছের রাসায়নিক পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আগে ফরমালিন ছাড়া আর কোনো রাসায়নিক পরীক্ষা করা হতো না।

গত এক জানুয়ারি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, এনবিআর এবং কাস্টম হাউসে পাঠানো এক চিঠিতে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ জানায়, আমদানি করা প্রায় সব ধরনের মাছে অতিমাত্রায় সিসা বা লেড, ক্রোমিয়াম, মার্কারি পাওয়া যাচ্ছে। সংস্থাটির সদস্য (যুগ্ম সচিব) মো. মাহবুব কবীর স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, বন্দর থেকে খালাসের আগে এটমিক এনার্জি সেন্টার ঢাকা, বিসিএসআইআর ঢাকা, ফিশ কোয়ালিটি কন্ট্রোল ল্যাব-সাভার দ্বারা আমদানি করা মাছ পরীক্ষা করে খালাসের অনুমতি দিতে বিশেষ অনুরোধ জানানো হয়েছে। ওই সব মাছে রাসায়নিকের পরিমাণ কেবল মৎস্য অধিদপ্তর কর্তৃক নির্ধারিত মাত্রায় থাকলেই তা খালাসের অনুমতি দেওয়া কথা বলা হয়। চিঠিতে নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ অনুযায়ী সংশ্নিষ্টদের সহযোগিতা করার আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়।

মাহবুব কবীর বলেন, একটি গবেষণাপত্র থেকে জানা যায়, আমদানি করা মাছে ক্ষতিকর রাসায়নিক পাওয়া যাচ্ছে। তখনই খোঁজ-খবর নিয়ে জানতে পারি বিদেশ থেকে আসা এসব মাছের ফরমালিন ছাড়া আর কোনো রাসায়নিকের অস্তিত্ব পরীক্ষা করা হয় না। বিশেষ করে আমদানি করা মাছের সঙ্গে থাকা কাগজপত্রের ওপর বিশ্বাস করেই দেশের বাজারে এসব মাছ বিক্রি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, দেশের সব পয়েন্টে এ চিঠি পাঠানো হয়েছে। এরই মধ্যে আমদানি করা মাছ শতভাগ পরীক্ষা ছাড়া খালাস না করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মানবদেহে রাসায়নিক পদার্থের সর্বোচ্চ মাত্রা ক্যাডমিয়াম ০.২৫ মিলি গ্রাম, লেড/সিসা ০.৩০ মিলি গ্রাম, মারকারি ১ মিলি গ্রাম, ক্রোমিয়াম ১ মিলি গ্রাম। এ পরিমাণের চেয়ে বেশি মাত্রায় রাসায়নিক পদার্থ মানবদেহে প্রবেশ করলে তা চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে ক্ষতিকর। মৎস্য চাষ, উৎপাদন, পরিবহন, বাজারজাতকরণ, সংরক্ষণ, আমদানি ও রফতানির ক্ষেত্রে মৎস্য অধিদপ্তর থেকে মাছে থাকা রাসায়নিকের যে সহনীয় মাত্রা ঠিক করে দেওয়া আছে সেটা হলো ০.৩। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বলছে, আমদানি করা মাছে বিশেষ করে সামুদ্রিক মাছ পরীক্ষা করে নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে চার-পাঁচ গুণ বেশি রাসায়নিক পাওয়া যাচ্ছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সৈয়দ আরিফ আজাদ বলেন, মৎস্য অধিদপ্তর দ্বৈবচয়ন পদ্ধতিতে আমদানি করা মাছের নমুনা সংগ্রহ করে তা পরীক্ষাগারে পাঠায়। কয়েক বছর ধরে এটা নিয়মিতই করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে এ পরীক্ষার ক্ষেত্রে আরও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা সামুদ্রিক মাছেই মারাত্মক ক্ষতিকর রাসায়নিকের পরিমাণ বেশি থাকে। এ বিষয়টি অন্তত দুই বছর আগে চিঠির মাধ্যমে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়। একই সঙ্গে সামুদ্রিক মাছ আমদানি বন্ধের ব্যাপারে একটি নির্দেশনাও চাওয়া হয়। তবে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।

তিনি বলেন, ২০১৪ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে মাছের একটি বড় চালান জব্দ হয়, যা পরীক্ষা করে অতিরিক্ত মাত্রায় ক্ষতির রাসায়নিক পাওয়া যায়। ওই মাছের চালান খালাস করার অনুমতি না দিতে তখন কাস্টমসকে অনুরোধ করা হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে এ মাছ নিয়ে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে তা মৎস্য অধিদপ্তরকে জানানো হয়নি। তিনি বলেন, ওই ঘটনার পর আরও অনেক চালানের নমুনা পরীক্ষা করে অতিমাত্রায় ক্ষতিকর রাসায়নিক পাওয়া যায়। বিদেশ থেকে আমদানি করা মাছ কাস্টমের মাধ্যমে খালাস হয়। এসব মাছ পরীক্ষার জন্য কাস্টমস থেকে যেটুকু সহায়তা চাওয়া হয় অধিদপ্তর শুধু সেটুকুই দিতে পারে। তাই মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষে শতভাগ আমদানি করা মাছ পরীক্ষা করা অসম্ভব ব্যাপার।

এদিকে ২০১৪ সালের রাসায়নিকযুক্ত ওই মাছগুলো কাস্টমস খালাসের অনুমতি দিয়েছিল বলে মৎস্য অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানান।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রায় ১ লাখ টন মাছ আমদানি করা হয়। এর আগে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৮৮ হাজার ৫৯৩ টন, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৯৭ হাজার ৩৮৩ টন, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে আমদানি হয় ৭০ হাজার টন এবং ২০০৯-১০ অর্থবছরে ৩৬ হাজার টন মাছ আমদানি করা হয়। সাম্প্রতিক এ বছরগুলোর হিসেবে ৮ বছরের ব্যবধানে প্রায় ৬৪ হাজার টন বেশি মাছ আমদানি করা হচ্ছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রজাতির স্বাদু ও সামুদ্রিক মাছ আমদানি করা হয়। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে- ভারত, মিয়ানমার, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর, চীন, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান ও ইয়েমেন। আমদানি করা ক্যাটফিশ জাতীয় মাছের মধ্যে রয়েছে বোয়াল, আইড়, বাঘা আইড়। সামুদ্রিক মাছের মধ্যে রয়েছে ইলিশ, চাপিলা জাতীয় বিভিন্ন সার্ডিন বা সেড, গিজার্ড সেড, ডটেড সেড, হোয়াইট সেড, ইচরি মলা। এছাড়াও রয়েছে সামুদ্রিক আইড়, রূপচাঁদা, মুলেট বা বাটা, কাঁটা ও কোরাল বা ভেটকি। মৎস্য অধিদপ্তর বলছে, আমদানি করা মাছের মধ্যে বেশিরভাগই সামুদ্রিক মাছ। গত বছর আমদানি করা মাছের মধ্যে ৫৮ হাজার টনই ছিল সামুদ্রিক মাছ।

সংশ্নিষ্টদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওমান, আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আসা মাছেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর রাসায়নিক থাকে। আরব সাগরের কিছু এলাকা জাহাজশিল্পের জন্য প্রসিদ্ধ। ওইসব শিল্প কারখানার বর্জ্যে আরব সাগরে মিশে। যার পানি তুলনা করা হলে বুড়িগঙ্গার পানির চেয়েও দূষিত হয়ে যায়। ওই পানিতে বেড়ে ওঠা মাছে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষতিকর রাসায়নিক থাকবে, যা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষ যখন ক্ষতিকর রাসায়নিকযুক্ত মাছ খায় তখন ওসব ধাতু মানবদেহে প্রবেশ করে এবং অপরিবর্তিত অবস্থায় বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে জমা হতে থাকে, যা পরে মারাত্মক রোগব্যাধির সৃষ্টি করে।

আইসিডিডিআর’বির জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী পুষ্টিবিদ ডা. তাহমিদ আহমদ বলেন, লেড শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করে। বিশেষ করে খর্বকায় করে তোলে। মার্কারি মানুষের শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। মার্কারি মানুষের শরীরে প্রবেশের ফলে ‘মিনামাথা’ নামক রোগের সৃষ্টি করে। ১৯৪০ সালের দিকে জাপানে অনেকেই এ রোগে আক্রান্ত হয়। যদিও বাংলাদেশে মার্কারির কারণে আক্রান্ত রোগের খবর নজরে আসেনি।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনার ড. একেএম নুরুজ্জামান বলেন, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের একটি চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে আমদানি করা শতভাগ মাছ রাসায়নিক পরীক্ষার পর খালাসের সিদ্ধান্ত হয়েছে। অতীতে আমদানি করা মাছ ফরমালিন পরীক্ষা করেই খালাস দেওয়া হতো। এ প্রক্রিয়ার কারণে মাছ আমদানির ক্ষেত্রে বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়বে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

সার্বিক বিচারে দেশে মাছ আমদানি নিরুৎসাহিত করার পক্ষে মত দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহমুদ হাসান। তিনি বলেন, কয়েক বছর ধরেই আমদানি করা মাছে ক্ষতিকর রাসায়নিক পাওয়া যায়। আমদানি করা শুঁটকি মাছেও ক্ষতিকর রাসায়নিক রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে। এ বিষয়টিকে সরকারের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশ মাছ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এ বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২ লাখ টন বেশি মাছ উৎপাদন হয়েছে। এ অবস্থায় দেশে মাছ আমদানি করা অযৌক্তিক। টাকা দিয়ে ক্ষতিকর রাসায়নিক কিনে আনার কোনো যৌক্তিকতাই নেই।

মৎস্য অধিদপ্তর বলছে, মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে চতুর্থ। আর দেশের হিসেবে মাছের চাহিদার ক্ষেত্রে দেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। গত অর্থবছরে মাছ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪০ লাখ ৫০ হাজার টন। উৎপাদন হয়েছে ৪১ লাখ ৩৪ হাজার টন। এর আগে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মাছ উৎপাদন হয় ৩৮ লাখ ৭৮ হাজার টন। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে উৎপাদিত হয় ৩৫ লাখ টনেরও বেশি। গত ১০ বছরে দেশে মাছের উৎপাদন বেড়েছে ১৫ লাখ টন। প্রতি বছরই গড়ে ৫ শতাংশ হারে মাছের উৎপাদন বাড়ছে। সমকাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত