প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শেখ হাসিনা এবং উন্নয়নে বাংলাদেশের বিস্ময় যাত্রা

অধ্যাপক ড. এম এ মাননান : শ্বেতশুভ্র চুলবিশিষ্ট ভদ্রলোক একজন নামকরা ব্রিটিশ প-িত, উন্নয়ন গবেষক। ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ছিলেন আমার পোস্ট-ডক্টর‌্যাল গবেষণার সুপারভাইজার বহু বছর আগে। ২০১৩ সালে এসেছিলেন গবেষণার কাজে বাংলাদেশে। আমি সবেমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিপুটেশনে এসে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছি। ঢাকা-গাজীপুর তখন বোমাবাজদের দখলে। বোমার আগুনে পুড়ছে বাস-ট্রাক, মরছে নিরীহ মানুষ পথেঘাটে বেঘোরে; গুপ্ত আক্রমণে প্রাণ হারাচ্ছে পথচারী, অফিসযাত্রী।

সংঘবদ্ধ আক্রমণে দেশবিরোধী-সরকারবিরোধীরা থেঁতলে দিচ্ছে ইট-পাথর দিয়ে পথচলা মানুষ আর পুলিশের মাথা। রাতের শহর ছিল আতঙ্কের নগরী। এমনি সময় তিনি না জেনে ঢাকায় এসে পড়লেন মহাবিপদে। গুলশানের একটি গেস্ট হাউজ থেকে এক সকালে ফোন পেয়ে দেখা করলাম। আমি নিজেও তখন মহা আতঙ্কে; অন্যদের মতো দোয়া-দরুদ পড়ে প্রতিদিন সকালে ঢাকা থেকে গাজীপুর রওনা দিই। এমতাবস্থায় তাকে কী সাহায্য করব। শেষ পর্যন্ত অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা বিমানবন্দরে পৌঁছিয়ে দিলাম। যাওয়ার সময় শুধু বললেন: টেক কেয়ার অ্যান্ড ইফ পসিবল লিভ দিস্ প্লেস; দিস কান্ট্রি ইজ অ্যা গন্ কেস (নিজের প্রতি খেয়াল রেখো এবং সম্ভব হলে এ জায়গা ছেড়ে চলে যাও; এ দেশ গোল্লায় গেছে)। সেই তিনি আবার এলেন ২০১৭-এর শেষের দিকে। আমি তাকে বহু জায়গায় নিয়ে গেলাম।

দেখলেন তিনি হাতিরঝিল, ঘুরে বেড়ালেন সব ফ্লাইওভার দিয়ে। দেখলেন উত্তরায় মেট্রোরেলের কর্মযজ্ঞ। সুন্দরবন ভ্রমণে গিয়ে নদী থেকে পারমাণবিক কেন্দ্র দেখে অবাক হলেন। অবাক প্রশ্ন, বাংলাদেশ পারমাণবিক কেন্দ্র তৈরি করবে? পারবে তো? আগ্রহ নিয়ে পদ্মা সেতু দেখতে গেলেন। স্প্যানসহ দৃশ্যমান পদ্মা সেতু দেখলেন, বিস্ময়ভরা তার দু’নয়ন। কক্সবাজার গিয়ে ফেনাভ সাগরের কূল ঘেঁষে ছুটে চলা ঝকঝকে রাস্তা ধরে ইনানি বিচ হয়ে চলে গেলেন টেকনাফ তক। বিমোহিত তিনি। কুমিল্লায় আমার পৈত্রিক আবাস জানতে পেরে বায়না ধরলেন যাবেন তিনি গ্রাম দেখতে। যেতে যেতে ফোর-লেন রাস্তা দেখে আরেকবার বিমূঢ় হলেন। বিস্মিত জিজ্ঞাসা, এত অল্প সময়ে বাংলাদেশ এত কিছু করল কী করে? বললাম, এত সব জাতির পিতার মেয়ের কা-। দুঃসাহসী এই নারী আপনাদের লৌহমানবী প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের প্রতিচ্ছবি। তিনি করে দেখিয়েছেন, সততা আর স্বচ্ছতা থাকলে আর সাহসী ভিশনসহ সঠিক নেতৃত্ব দিতে পারলে কর্দমাক্ত জমিন থেকেও লাফিয়ে সপ্তম আকাশে ওঠা যায়।

বাংলাদেশে দ্রুত উন্নয়ন হয়েছে, তবে তা নির্বিঘেœ হয়নি। ২০১৩ পুরোটা এবং ২০১৪ সালের প্রথম কয়েকমাস শান্তিপ্রিয় মানুষের এ দেশটি শুধু আগুনে জ্বলেছেÑ রাজনীতির আগুনে, প্রতিহিংসার আগুনে, পরশ্রীকাতরতার আগুনে। এ দেশে ২০০৯ সালের প্রথম মাস থেকেই নৌকার পালে সঠিক হাওয়া লেগেছে। নির্বাচনি মেনিফেস্টো অনুযায়ী সরকার কাজ করেছে, অর্জন হয়েছে আশানুরূপ। অর্থনীতিবিদদের প্রেডিকশন অনুসারে উন্নত বিশ্বের কাতারে অবস্থান নিতে পারবে যে এগারোটি দেশ, তার মধ্যে এই আমাদের ক্ষুদ্র দেশটির সম্ভাবনা অনেক উপরে। শুধু চাই ক্রমাগত পথ চলা, নির্বিঘেœ। প্রবৃদ্ধির হার সাত শতাংশের উপরে রেখে উৎসাহব্যাঞ্জক অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা। বিগত নয় বছরে বিভিন্ন সেক্টরে হয়েছে ব্যাপক উন্নয়ন। অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন, কৃষি, অবকাঠামো, নারী শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন ইত্যাদিতে লেগেছে উন্নয়নের হাওয়া। বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ছাড়িয়েছে পনেরো হাজার মেগাওয়াট। বিগত কয়েক বছর ধরে জাতীয় বাজেটের আকার ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়নের উপরে। প্রবাসীর সংখ্যা ৭৫ লাখে বৃদ্ধি পেয়ে এখন বাংলাদেশ বিশ্বে পঞ্চম আর রেমিটেন্স আয়ের দিক থেকে দশম স্থানে। তৈরি পোশাক শিল্পে বাংলাদেশ রপ্তানিকারক হিসেবে বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থানটি ধরে রেখেছে বিগত বছরেও। এ দু’খাত থেকে প্রাপ্ত আয় অর্থনীতির সঞ্জীবনী শক্তি হিসেবে কাজ করেছে এবং করছে। দ্রুত এগিয়ে যাওয়া অর্থনীতি আর সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্ময়কর অগ্রযাত্রা সারা বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। দারিদ্র্য, ক্ষুধা আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ হিসেবে পরিচিত এক সময়কার ‘বাস্কেট কেস’ বাংলাদেশ বিশ্বের নিকট সমসাময়িক কালের উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে সমাদৃত।

লেখক : ব্যবস্থাপনাবিদ ও গবেষক; উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত