প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বেসরকারি মেডিকেল কলেজ
নিম্নমান ও চাহিদার উদ্বৃত্ত চিকিৎসক তৈরি করছে

ডেস্ক রিপোর্ট :  মেডিকেল শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাস্তব প্রশিক্ষণ। এজন্য ৫০ আসনের একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ২৫০ শয্যার আধুনিক হাসপাতাল থাকা বাধ্যতামূলক। হাসপাতালের ৭০ শতাংশ শয্যায় আবার সার্বক্ষণিক রোগী ভর্তি থাকতে হয়। যদিও বেসরকারি অনেক মেডিকেল কলেজেই শর্ত মেনে হাসপাতাল নেই। থাকলেও রোগী অনুপস্থিত। প্রতি ১০ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষকের নিয়মও লঙ্ঘিত হচ্ছে। অভাব রয়েছে আধুনিক শিক্ষা সরঞ্জামের। এসব অপ্রতুলতার মধ্যেই বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলো থেকে প্রতি বছর বের হচ্ছে ছয় হাজারের বেশি চিকিৎসক। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে এসব চিকিৎসকের মান নিয়ে।

বণিক বার্তার খবরে জানা গেছে, শুধু মানহীন নয়, চাহিদার উদ্বৃত্ত চিকিৎসকও তৈরি করছে বেসরকারি এসব মেডিকেল কলেজ। দেশে চিকিৎসকের চাহিদা ও জোগান নিয়ে একটি গবেষণা পরিচালনা করেছে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এবং চিকিৎসক ও জনসংখ্যা অনুপাতের ভিত্তিতে সরকারি সংস্থাটি দেখিয়েছে, এখনই চাহিদার উদ্বৃত্ত চিকিৎসক রয়েছে দেশে। আগামীতে এ উদ্বৃত্ত আরো বাড়বে।

গবেষণাটি তৈরিতে দেশে বার্ষিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ধরা হয়েছে বিশ্বব্যাংক নিরূপিত ১ দশমিক শূন্য ১১ শতাংশ। প্রতি ২ হাজার ৬২২ জন মানুষের জন্য চিকিৎসক ধরা হয়েছে একজন। ২০১৪ সালের হিসাবে চিকিৎসক বৃদ্ধির হার বিবেচনায় নেয়া হয়েছে ১০ শতাংশ। এসবের ভিত্তিতে বিআইডিএসের গবেষণা বলছে, ২০১৬ সালে ১৬ কোটি মানুষের জন্য দেশে চিকিৎসকের চাহিদা ছিল ৬৩ হাজার ৩৯৫ জন। এর বিপরীতে জোগান ছিল ৭৪ হাজার ৯২৪ জন চিকিৎসকের। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় বছরটিতে উদ্বৃত্ত চিকিৎসক ছিলেন ১১ হাজার ৫২৯ জন। তবে ২০২১ সালে ৬৭ হাজার ২৬৫ জনের চাহিদার বিপরীতে দেশে চিকিৎসকের জোগান দাঁড়াবে ৭৪ হাজার ৯২৪ জন। এ হিসাবে ২০২১ সালেই চাহিদার অতিরিক্ত চিকিৎসকের সংখ্যা দাঁড়াবে ৫৩ হাজার ৪০২। এর পাঁচ বছর পর উদ্বৃত্ত চিকিৎসকের সংখ্যা বেড়ে হবে ১ লাখ ২২ হাজার ৯৬৫। ৭১ হাজার ৩৭০ জনের চাহিদার বিপরীতে ২০২৬ সালে দেশে চিকিৎসকের সংখ্যা দাঁড়াবে ১ লাখ ৯৪ হাজার ৩৩৫।

বেসরকারি মেডিকেল কলেজের কারণেই চাহিদার অতিরিক্ত চিকিৎসক তৈরি হচ্ছে বলে জানান গবেষক দলের একজন ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. রাইসুল আউয়াল মাহমুদ। বেসরকারি মেডিকেল কলেজ থেকে বেরোনো চিকিৎসকদের মান নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, টাকার জন্য বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোয় বেশি হারে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হচ্ছে। এমনিতেই বেসরকারি মেডিকেলে একটু কম মেধাবী শিক্ষার্থী ভর্তি হন। আবার শিক্ষক সংকটও রয়েছে। বেসরকারি মেডিকেলের শিক্ষার্থীদের হাতেকলমে প্রশিক্ষণের সুযোগও কম। অধিকাংশ বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল না থাকার কারণে রোগী পায় না। ফলে শিক্ষার্থীরা ব্যবহারিক শিক্ষা পাচ্ছেন না। বেসরকারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন হাসপাতালে বা ক্লিনিকে ইন্টার্নশিপ করেন। এ কারণে তাত্ত্বিক বিষয় জানলেও বেসরকারি মেডিকেলের শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক জ্ঞান অনেক কম।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মেডিকেল কলেজ রয়েছে ১০০টির মতো। এর মধ্যে ৬৯টিই বেসরকারি, বাকি ৩১টি সরকারি। সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোয় প্রতি বছর ৩ হাজার ৩২০ জন ও বেসরকারিতে ৬ হাজার ২০৫ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হন। এছাড়া সরকারি ছয়টি ও বেসরকারি ২৬টি ডেন্টাল কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তি হয় যথাক্রমে ৫৩২ ও ১ হাজার ৪০০ জন। এদিক থেকে দেশে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ থেকেই সবচেয়ে বেশি চিকিৎসক তৈরি হচ্ছে।

যদিও পেশার ক্ষেত্রে এসব চিকিৎসক গুরুত্ব পাচ্ছেন কম। চিকিৎসক নিয়োগের ক্ষেত্রে বেসরকারি হাসপাতালগুলোও তাদের বিবেচনায় নিচ্ছে না সেভাবে। যারাও বা সুযোগ পাচ্ছেন, তাদের প্রায় সবাই প্রথম সারির কয়েকটি বেসরকারি কলেজ থেকে পাস করা।

ল্যাবএইড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এএম শামীম এ প্রসঙ্গে  বলেন, বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় নিয়োগের ক্ষেত্রে সাধারণত সরকারি মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করা চিকিৎসকদের প্রাধান্য দেয়া হয়। সরকারি মেডিকেল কলেজগুলো অনেক পুরনো হওয়ায় তাদের সেটআপ অনেক ভালো। এছাড়া এখনো সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে মেধাবীরা সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। তবে অনেক ক্ষেত্রে সরকারি মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করা শিক্ষার্থী পাওয়া যায় না। সেক্ষেত্রে বেসরকারি মেডিকেলের শিক্ষার্থীদের নেয়া হয়। সেক্ষেত্রে ভালো মানের মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করা চিকিৎসকরা সুযোগ পান।

বণিক বার্তা’র প্রতিবেদনে একই কথা বলেন হেলথ অ্যান্ড হোপ হসপিটালের চেয়ারম্যান ডা. লেলিন চৌধুরীও। তিনি বলেন, অধিকাংশ বেসরকারি মেডিকেল কলেজে শিক্ষা ও ইন্টার্নশিপের সময় যে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়, তার মান সন্তোষজনক নয়। এ কারণে বেসরকারি মেডিকেল কর্তৃপক্ষও চিকিৎসক নিয়োগের সময় সরকারি মেডিকেল থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের প্রাধান্য দেয়।

২০১৬ সালের এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি তথ্যের ভিত্তিতে গবেষণাটি পরিচালনা করে বিআইডিএস। তাতে দেখা যায়, দেশের বাইরে চিকিৎসক যাওয়ার হারও অনেক কমেছে। ২০১০ সালে ৬৮ জন চিকিৎসক দেশের বাইরে গেলেও ২০১৫ সালে সে সংখ্যা নেমে দাঁড়িয়েছে ২৩ জনে।

বাইরে যাওয়ার সুযোগ কমে আসার ফলে দেশে উদ্বৃত্ত চিকিৎসকের চাপ আরো বাড়বে বলে জানান গবেষক ড. রাইসুল আউয়াল মাহমুদ। তিনি বলেন, সত্তরের দশকে যখন চিকিৎসক, নার্স বাইরে যাওয়া শুরু হয়, তখন মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় বেশি যেত। সে সময় সেখানে অনেক চাহিদা ছিল। সেটি এখন কমে গেছে। তাদের নিজেদের জোগান বেড়েছে। বাইরে যাওয়ার সুযোগ কমে আসার ফলে দেশের মধ্যে উদ্বৃত্ত চিকিৎসকের চাপ আরো বাড়বে। মেডিকেল কলেজ থেকে পড়েও অনেকে অন্য পেশায় যেতে বাধ্য হবে।

চিকিৎসকদের পেশাগত নিবন্ধন দিয়ে থাকে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি)। বেসরকারি মেডিকেল কলেজে শিক্ষার মান সন্তোষজনক নয় বলে মনে করছে তারাও। বিএমডিসির ভাইস প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. এবিএম মাকসুদুল আলম বলেন, মেডিকেল কলেজগুলোয় সব ধরনের অবকাঠামো, পর্যাপ্ত শিক্ষক, হাসপাতালে উল্লেখযোগ্য রোগী থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দেশের অধিকাংশ বেসরকারি মেডিকেল কলেজে তা নেই।

তবে বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলো যাতে মান বজায় রাখতে পারে, সরকারের পক্ষ থেকে সে ব্যাপারে সব ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানান স্বাস্থ্য সচিব (মেডিকেল শিক্ষা) ফয়েজ আহমেদ।

তিনি বলেন, মেডিকেল কলেজগুলোর মান ধরে রাখতে বিএমডিসি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কমিটি কাজ করছে। নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত না হওয়ায় এ পর্যন্ত ১২টি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজের ভর্তি কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কেউ কেউ আদালত থেকে অনুমোদন নিয়ে এসে ভর্তি করাচ্ছে। এ ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত