প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অসাম্প্রদায়িকতার জন্য বিরূপ সময়
গণতন্ত্রের জন্য অসাম্প্রদায়িকতা অপরিহার্য

রাকিন আবসার অর্ণব : ভারতের বিশিষ্ট অসাম্প্রদায়িক সাংবাদিক গৌরি লঙ্কেশের গুপ্তহত্যা, এবং মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে পরিকল্পিতভাবে জাতিগত নিধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিধনের অপচেষ্টা অথবা বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর দফায় দফায় হামলার মাধ্যমে একটা বাস্তবতা খুব সহজেই উপলব্ধি করা যায়, আর তা হলো অসাম্প্রদায়িকতা নিয়ে কিছু বলার অথবা লেখার জন্য এটা একদমই সঠিক সময় নয়।

পূর্ণাঙ্গ ও অস্থায়ী উভয় গনতান্ত্রিক আঙ্গিকে নতুন ভাবে বেড়ে ওঠা “সাম্প্রদায়িক জাতিয়তাবাদ” এর গণতন্ত্রের উত্থান বিশ্ব রাজনীতির অসাম্প্রদায়িকতার ভিত্তি নাড়িয়ে দিয়েছে।

একটি কাঙ্খিত সমাজ গড়ার লক্ষে অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূল বিষয়াদির উপর ন্যূনতম আলোচনা করার যেটুকু প্রয়োজনীয়তা রয়েছে শুধু সেটাকেই রোধ করা নয় বরং কিছু মানুষ নতুন হাতিয়ার হিসেবে “ধর্মীয় অধিকার” এর দোহায় দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার গুরুত্বকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে চলেছে। আর অবশিষ্টরা এই প্রসঙ্গটাকে রিতিমত অগ্রাহ্য করে চলেছে।

সম্মিলিতভাবে বলতেই হয় অসাম্প্রদায়িকতাকে এর অন্তর্নিহিত নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা উচিত। যেমন কম শুল্ক অথবা উচ্চ শুল্কের হিসাব অথবা যদি কর্তৃত্বপূর্ণ শাসনব্যবস্থার শাসকেরা অসাম্প্রদায়িক চেতনা লালন না করে তবে অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিঃশেষ হয়ে যাবে।

তবে প্রভাবশালীত্বের পদ্ধতি বিপথে চলছে, কারণ এটি এখনো গণতন্ত্রের মূল ধারণাকে বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে, গণতন্ত্রীয় ব্যবস্থা এখনো ধর্মনিরপেক্ষতাকে একটি বিকল্প পদ্ধতি হিসাবে বিবেচনা করে, কিন্তু অসাম্প্রদায়িকতা যে কনো অবিচ্ছেদ্য কাঠামোর মতো নয় বরং এটি এমন একটি নীতি যা গণতন্ত্রের পতাকাকেই আরও ওপরে তুলে ধরে।

ভোলটাইর, জেমস ম্যাডিসন, থমাস জেফ্যারসন অথবা থমাস পেইন এর মত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের একযোগে এইটা বলে যাওয়া কোন সমাপতন নয় যে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতা অবিচ্ছেদ্য ভূমিকা রাখে।

কেবল বিতর্কের যায়গা হচ্ছে, ধর্মনিরপেক্ষতা ধর্মীয় নেতাদের থেকে সরকারী প্রতিষ্ঠানের বিচ্ছেদ দাবি করে এবং বলে ‘ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান থেকে রাষ্ট্র আলাদা থাকবে’ । কিন্তু এই স্লোগান তাদের পক্ষেই কথা বলে যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। ধর্মীয় নেতাদের থেকে সরকারী প্রতিষ্ঠান পৃথকিকরনের এই পদ্ধতি শাসকের নিজেদের হুকুম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী অধিকাংশের ধর্মীয় মতামত যেন সংখ্যালঘুদের উপর না বর্তায় তারই পথ বের করে দেই এই পদ্ধতি।

যদিও, ঠিক এই সময়ে গণতন্ত্রের সাথে জড়িত ভুল ধারণাগুলোর সৃষ্টি হয় যেমন রাজনৈতিক বা ধর্মীয় ডানপন্থির দলগুলি প্রশ্ন করে যে যখন গড়িষ্ঠতামূলকভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিয়ম যদি – যেমন গণভোট বা সংসদীয় ভোটাধিকার – ধর্মীয় আইনসমূহ গ্রহনের পক্ষে সিদ্ধান্ত আসে, রাষ্ট্রপতি, তাহলে কি এই ধরনের ফলাফল গণতান্ত্রিক হবে না?

উল্লিখিত প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর হল : না এর কারণ কেবলমাত্র যে ঐতিহাসিক উৎস থেকে উদ্ভট যুক্তিগুলি “চিরস্থায়ী কনট্রাকশন” এবং একবার গৃহীত হয়, এই আইনগুলি পরিবর্তন করা যায় না (অন্তত যতক্ষণ না কেউ তা ধরে রাখতে চায় একটি কঠোর আড়ম্বরপূর্ণ অবস্থানে)।

তারপরেও যদি এই আইনগুলি রাষ্ট্রীয় কাঠামের মূল উপাদান হয়েই ওঠে, তাহলে একটি প্রতিনিধিত্বমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থার আর কি দরকার? জনপ্রতিনিধিরাও বা কিভাবেই সেই সকল আইন সংশোধন করবেন বা বাতিল করবেন যেগুলো স্বর্গ থেক প্রেরিত?

গণতন্ত্রের মূল ধারণা এইটাই যে, প্রতিটি প্রজন্মই যোগ্যতার ভিত্তিতে তাদের জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করবে এবং সেই জনপ্রতিনিধিগণ অধিকাংশের মতামতকে অসম্মান না করে অথবা সংখ্যালঘুদের উপর মতামত চাপিয়ে না দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রক্রিয়া নিজেদের মত তৈরি করবেন। তবে সাধারণ ভাবেই বলা যায় স্বর্গিয় বা ধর্মিয় বিচার ব্যবস্থা থাকলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পরিচালনা করা সম্ভব নয় কারন সেগুলো পরিবর্তন করাও ধর্মিয় মতে সম্ভব নয়।

অন্য কথায়, গণতন্ত্রে অভিযোজিত দক্ষতা কাজে লাগানো হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যেখানে সমাজের বৃহত্তর অগ্রগতির জন্য ক্ষতিকর একটি প্রজন্মের মতামতকে বাতিল করে দেওয়া হয়, যা কেবলমাত্র সম্বব হয় যখন ধর্মীয় সংস্থাগুলির উক্তিমতে রাষ্ট্র পরিচালিত হতে শুরু করে।

অতএব বলা চলে অসাম্প্রদায়িকতাই ইমারতের সেই ইট যা গণতন্ত্রকে নির্মান করে এবং লালন করে। পরিশেষে বলাই যায় যে এমন একটি সমাজ ব্যবস্থা যেখানে ভিন্ন ধর্মালম্বী মানুষ শুধু বসবাসই করবেনা বরং একে অপরের মতামতের এবং বিশ্বাসের প্রতি সহনশীলতা স্থাপন করবে আর এমন একটি সমাজ ব্যবস্থা তৈরি করাই অসাম্প্রদায়িক চেতনার চুড়ান্ত লক্ষ্য।

 

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ