প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আমেরিকায় এত খুনের কারণ কী?

তসলিমা নাসরিন : বন্দুকের গুলিতে প্রতিবছর প্রচুর লোকের মৃত্যু হয় যুক্তরাষ্ট্রে। কদিন পর পরই কেউ না কেউ ঘর থেকে বন্দুক এনে একসঙ্গে অনেকগুলো মানুষকে খুন করে।

কখনো ইস্কুলে, কখনো সিনেমা হলে, কখনো ক্লাবে, কনসার্টে, কখনো গির্জায়। দেখা যায় নিজের বন্দুক দিয়ে নিজেই গণহত্যা চালিয়েছে। খুনির মৃত্যু হলে আমরা জানতে পারি না কেন সে এমন নৃশংস কাজটি করল। লাস ভেগাসে ৫৯ জনকে মেরে স্টিফেন প্যাডক আত্মঘাতী হলো, আর সাদারল্যান্ড স্প্রিং-এ ২৬ জনকে হত্যা করার পর ডেভিন কেলে নিহত হলো। কেউ তাদের কাছ থেকে এমন বীভৎস হত্যাকাণ্ড ঘটানোর কারণ জানতে পারল না। মানুষ খুব সহজে ধরে নেয় খুনিদের মানসিক সমস্যা ছিল। দেশের প্রেসিডেন্টও একই কথা বলেছেন। বলেছেন বন্দুক আইন নিয়ে সমস্যা নেই, যে-কেউ যে চাইলেই ছোটখাটো দোকান থেকেও বন্দুক কিনতে পারে, তা নিয়েও সমস্যা নেই, সমস্যা মানসিক, মানসিক সমস্যার কারণে মানুষ বন্দুক হাতে নিয়ে গণহত্যাগুলো করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পৃথিবীর সব দেশেই মানসিক রোগী আছে, তাদের কজন খুন খারাবি করে? মানসিক রোগীরা যতটুকু হিংস্র বা নৃশংস হতে পারে, ততটা হিংস্র বা নৃশংস হতে, মানসিক রোগ নেই, এমন মানুষও পারে। আসলে মানসিক রোগ যাদের বেশি, তারা অন্যকে মারে না, বরং অন্যের মার খায়। খুনিরা মানসিক রোগী, এই ঘোষণা দিয়ে মানসিক রোগীদের বিপদ ডেকে আনলেন ট্রাম্প। মানসিক রোগীদের এখন সন্দেহের চোখে দেখা হবে, তাদের ধারে কাছে কেউ ঘেঁষবে না। তাদের চলাফেরার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হবে। মানসিক রোগ নিয়ে যে অহেতুক ভয় এবং ঘৃণা ছিল মানুষের, তা থেকে তো যাবেই বরং আরও বাড়বে।

খুনোখুনি বা বন্দুকবাজির সঙ্গে মানসিক রোগের কোনও সম্পর্ক নেই। মানসিক রোগীরা বন্দুক দিয়ে বড়জোর যা করে, তা আত্মহত্যা। অধিকাংশই নিজেকে মারে, অন্যকে নয়। আমেরিকায় মানসিক-চিকিত্সা ব্যবস্থা আরও উন্নত হলে আত্মহত্যার হারও অনেক কমে যাবে। আমেরিকার মনোচিকিৎসকরা বারবারই বলছেন, মানসিক রোগীদের দিকে আঙ্গুল না তুলে বরং যে হিংস্র নিষ্ঠুর বদমেজাজি লোকগুলো বাড়ির ভিতর বউ বাচ্চাকে মারছে, যারা কথায় কথায় যে কারও গায়ে হাত তোলে, হামলা করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে— তারা যেন চাইলেই বন্দুক কিনতে না পারে, সেই ব্যবস্থা করুন। কিন্তু কে শোনে কার কথা। না জেনে না বুঝে সারা বিশ্বকে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলে দিয়েছেন, মানসিক সমস্যার কারণে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে ডেভিন কেলি। (এর কিছুদিন আগেই নিউইয়র্কের রাস্তায় ট্রাক চালিয়ে যে লোকটি কিছু লোককে মেরে ফেলেছিল, তাকে ফাঁসি দেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট অস্থির হয়ে উঠেছিলেন। ) ডেভিন কেলির হাতে বন্দুক কী করে এলো, যে-কেউ যেন বন্দুক কিনতে না পারে— এটি মোটেও ভাবছেন না প্রেসিডেন্ট।

আমেরিকার যে পুরুষেরা বন্দুক চালিয়ে মানুষ খুন করেছে, অধিকাংশই তাদের স্ত্রী বা বান্ধবীর ওপর নৃশংসতা চালাতো। তাদের বিরুদ্ধে ‘ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স’-এর অভিযোগও ছিল। ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের অভিযোগ থাকা সত্ত্বে দিব্যি লোকেরা বন্দুক কিনতে পারে। আজ যে স্ত্রীকে মারে, কাল সে অন্যকে মারবে। কবে কোন আমলে আমেরিকায় আইন হয়েছিল নাগরিকদের নিজের নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিজেরাই করবে, সেই থেকে আইনের কোনও বদল নেই। এত যে মৃত্যু হচ্ছে নিরীহ মানুষের, তারপরও মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার ঠিকই কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু কারও বন্দুক কেনার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়নি। স্ত্রীকে মেরেছিল, এমনকী বাচ্চাকে মেরে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিল বলে ডেভিন কেলিকে বের করে দেওয়া হয়েছিল বিমান বাহিনী থেকে। এক বছরের শাস্তি হয়েছিল তার। তারপরও কিনা বন্দুকের দোকানে গিয়ে বন্দুক কিনতে তার কোনও অসুবিধে হয়নি। বন্দুক কাছে থাকলে রাগী লোকদের মনে হতেই পারে একে মারি, ওকে মারি বা একসঙ্গে অনেকগুলোকে মারি। মানসিক সমস্যার কারণে এই ইচ্ছেগুলো হয় না, এই ইচ্ছেগুলো আমার মনে হয় মানুষের ভিতরে নিহিত আছে, কেউ একে সংবরণ করে, কেউ করে না। অনেকে জেল ফাঁসির ভয়ে খুন করে না। আজ জেল ফাঁসি অথবা যা কিছু শাস্তি আছে উঠে যাক, সবাই দেখুক, মানুষ কী করে মানুষকে মারার জন্য উন্মাদ হয়ে ওঠে। অনেকে ভাবে, অপরাধ করেও তারা ধরা পড়বে না। ধর্ষণের বড় বড় শাস্তির ব্যবস্থা থাকার পরও ধর্ষণ কমছে না। এরও কারণ ওই একই। ভেবে নেয় ধরা পড়বে না। কোনও না কোনও ভাবে বেঁচে যাবে। ডেভিন স্ত্রীকে মারতো। ভার্জিনিয়ায় বন্দুকবাজি করা জন হজকিন্সও মারতো তার বান্ধবীকে। ক্যালিফোর্নিয়ার সেড্রিক এন্ডারসন বিয়ে করার দু’মাস পরই তার স্ত্রীর ক্লাসরুমে গিয়ে স্ত্রীকে আর ক্লাসের বাচ্চাদের মেরে নিজে মরেছিল। পরে জানা গেছে ক্যারেনকে সে নানাভাবে নির্যাতন করতো। বোস্টন ম্যারাথনে বোমা মেরেছিল যে, অরলান্ডোর গে নাইটক্লাবে যে লোক গুলি চালিয়েছিল, কোলোরাডো স্প্রিং-এর প্ল্যান্ড প্যারেন্টহুড ক্লিনিকে যে গুলি করে মানুষ মেরেছিল— সবারই ছিল নারী-নির্যাতনের ইতিহাস। নারী-নির্যাতনের সঙ্গে বরং যোগ রয়েছে বন্দুকবাজির।

আমেরিকায় বন্দুকের গুলিতে প্রতি ১৫ মিনিট অন্তর অন্তর একজন মারা যায়। আমেরিকায় বন্দুকের সংখ্যা ৩০ কোটি। প্রায় প্রত্যেকের জন্য একটি করে বন্দুক। জাপানে প্রতি ১০০ জনে একটি বন্দুক। পুরো জাপানে বছরে ১০ জনেরও কম লোক গুলিতে নিহত হয়। ওদিকে যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুকের গুলিতে নিহতের সংখ্যা বছরে প্রায় তিরিশ চল্লিশ হাজার।

বন্দুক বিক্রি বন্ধ করো— এই স্লোগানে তেমন কাজ হয়নি। যারা বন্দুক বানায় এবং বিক্রি করে, তারা দেশের ধনী এবং প্রভাবশালী লোক। দেশের অর্ধেক মানুষ বন্দুকের গুলিতে নিহত হলেও ওই লোকগুলোর কিছু যাবে আসবে না। তারা রাজনীতিকদের প্রচুর পয়সাকড়ি দিয়ে কিনে নিয়েছে। রাজনীতিকরা বন্দুক আইন বদলানোর পক্ষে কিছুই বলবেন না। তার চেয়ে বন্দুক ব্যবহারের কারণে যেখানে সেখানে যখন তখন মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, মানুষ আহত হচ্ছে, পঙ্গু হয়ে বেঁচে থাকছে বাকি জীবন— একে জনস্বাস্থ্যের গুরুতর সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। জনস্বাস্থ্যের জন্য যেসব জিনিস ক্ষতিকর, সেসবকে যেভাবে বন্ধ করা হয়, বন্দুককে সেভাবেই বন্ধ করতে হবে। এ কথা সকলেই জানে, যে দেশে বন্দুক যত কম, বন্দুকবাজি তত কম। তত কম বন্দুকের গুলিতে নিহত এবং আহতের সংখ্যা। জরিপে দেখা যায়, যে বাড়িতে বন্দুক আছে, সে বাড়িতে সাধারণত কেউ না কেউ গুলি করে নিজেকে মারে, অথবা অন্যকে মারে।

বাড়িতে বন্দুক রাখা মনে হচ্ছে না আমেরিকার লোকেরা অচিরে বন্ধ করবে। নিদেন পক্ষে বন্দুকগুলো তো কোনও কোডনম্বর দিয়ে বন্ধ করে রাখা যায়। বাড়ির বাচ্চারা রিভলভার নিয়ে খেলতে খেলতে ট্রিগার টিপে এ পর্যন্ত কম মানুষকে তো মারলো না! ঘর থেকে অনায়াসে বাবার বন্দুক নিয়ে ইস্কুলে যায় বাচ্চারা, যাকে সামনে পায় তাকে গুলি করে মেরে আসে। আসলে আমেরিকায় বন্দুকবাজি বন্ধ করা সহজ নয়। কিন্তু কিছু পদক্ষেপ নেওয়া এ মুহূর্তে জরুরি। সড়ক দুর্ঘটনাকে জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে নেওয়ার পর আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে এই দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার। আজ সবাই নিজের এবং অন্যের নিরাপত্তার জন্য নিরাপদ ড্রাইভিংয়ের সব শর্ত মেনে চলে। মদ্যপান করে ড্রাইভিং পারতপক্ষে কেউ করে না। ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন প্রায় কেউই করে না আমেরিকায়। ১০০ বছর আগেও এই সচেতনতা আশা করা যায়নি। জনস্বাস্থ্যের জন্য যদি মানুষ সচেতন হয়ে সড়ক দুর্ঘটনা এড়ায়, তবে জনস্বাস্থ্যের জন্য সচেতন হয়ে বন্দুক দুর্ঘটনা এড়াবে না কেন?

লেখক : নির্বাসিত লেখিকা।

সূত্র : বিডি-প্রতিদিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত