প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘সুবোধ’ মুক্তি পাক’

তুষার আবদুল্লাহ : সুবোধ কি গ্রেফতার হয়েছে? বাজারে প্রচার বা গুজব ছড়িয়েছে– ‘আটক’ করা হয়েছে তাকে। মূলত সুবোধ নয়, যিনি এই গ্রাফিতি’র শিল্পী বা আঁকিয়ে তাকেই নাকি গ্রেফতার করা হয়েছে, এমন গুজবই ছড়িয়ে পড়েছিল হঠাৎ। তিনি কি নিজেকে নিয়ে এই গ্রাফিতি এঁকে বেড়াচ্ছেন শহরের দেয়ালে দেয়ালে? নাকি কোনও চরিত্র বা সময়কে উপস্থাপন করছেন। যদি সত্যিই শিল্পী আটক হয়ে থাকেন, তাহলে হয়তো তার জবানবন্দি থেকে ধারণা পাওয়া যাবে। সব জবানবন্দিতে সত্য ভাষণ, প্রকৃত ঘটনা উঠে আসে এমন নয়। তবে অনুমান পাওয়া যাবে।

গ্রাফিতি বা দেয়ালচিত্রের এই অনুশীলন পৃথিবী জুড়েই আছে। কোথাও শিল্পীর স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কোথাও এই ক্যানভাস শিল্পকে নিষিদ্ধই করা আছে। দেয়ালের কান আছে কথাটি আমাদের জানা ছিল। আমরা চারদিকের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে গোপন কথাটি আরও ফিসফিসিয়ে বলার চেষ্টা করি। কিন্তু আইজুদ্দিন যখন প্রথম বলে উঠলো দেয়াল ছাপিয়ে-কষ্টে আছি। কিংবা নাজির বলে বসলো–অপেক্ষায়? তখন আমরা চমকে উঠলাম। নড়েচড়ে বসলাম। বুঝলাম আইজুদ্দিনের এই চিৎকার হয়তো কোনও সমাজের কোনও অংশের চাপাকান্না। তারা কণ্ঠ ছেড়ে সরব হতে পারেননি। দেয়ালের মুখ দিয়ে নিজেদের বোবাকান্নার প্রকাশ ঘটিয়ে ছিলেন।

নাজিরের মাধ্যমে হয়তো সমাজের কোনও একটি অংশ বুঝাতে চেয়েছে, জানাতে চেয়েছে– তারা অপেক্ষায়। এই অপেক্ষা কোন সুদিনের। রাত্রির পর কোন ভোরের। সুবোধকে আমরা দেয়ালের ক্যানভাসে ভিন্নভাবে পেলাম। মাত্র একটি বক্তব্যে সে স্থির থাকেনি। তাকে চঞ্চল, উচাটন মনে হচ্ছে। ক্যানভাসে সুবোধকে আমরা দেখতে পাই বাক্সবন্দি কমলা রঙের সূর্যকে নিয়ে। সুবোধকে কেউ বলছে–‘এখন পালিয়ে যা, এখন সময় পক্ষে না। মানুষ ভালোবাসতে ভুলে গেছে’। কোনও কোনও ক্যানভাসে আমরা বাক্সবন্দি ভালোবাসা’র চিহ্নকেও দেখতে পাই। কিছু সময়ের ব্যবধানে আমরা দেখছি সুবোধকে বলা হচ্ছে– ‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা তোর ভাগ্যে কিছু নেই’। কখনও কখনও দেখেছি ‘HOBE KI’র পাশে বসে আছে দুটি কাক। স্বল্প বিরতিতেই আমরা আমাদের আবার ভাবনায় ফেলে দেয় ক্যানভাসের এই লেখা গুলো–‘সুবোধ এখন জেলে পাপবোধ নিশ্চিত করছে বাস মানুষের হৃদয়ে’। দেখতে পাই সুবোধ জেলে আটকা পড়েছে। নিজেকেই তখন আমরা জিজ্ঞেস করি–আমাদের শুভ ভাবনা গুলো কি আটকা পড়লো কোনও কারাগারে? আমরা বুঝি সুবোধকে ফিরে আসার ডাক দিয়েছিলাম। সেটা কণ্ঠ ছেড়ে না দিলেও মনের ডাক ছিল কিন্তু দেয়াল সেই ডাক শুনে ফেলেছিল বলেই, ক্যানভাসে ভেসে ওঠে– সুবোধ তুই পালিয়ে যা ভুলেও ফিরে আসিস না’। সুবোধের মাধ্যমেই আমরা বুঝি মুক্তির পথ খুঁজতে শুরু করেছি, গেরিলা শিল্পী আমাদের মনের সেই খোঁজ পেয়ে যান বলেই ক্যানভাসে আঁকলেন– ‘সুবোধ কবে হবে ভোর’?

আদৌ সুবোধ গ্রাফিতি’র সেই গেরিলা শিল্পীকে আটক করা হয়েছে কিনা সেটাও তো নিশ্চিত নয়। রাষ্ট্রের কৌতূহল থাকতেই পারে। কে এই শিল্পী। কার, কাদের হয়ে তিনি দেয়ালের কণ্ঠে শব্দ দিয়েছেন। রাষ্ট্রের এই কৌতূহলও অযৌক্তিক নয়। দেখা গেছে নানা সময়ে গোলকের নানা প্রান্তে প্রচলিত সময়, নিয়ম, নীতির বিরুদ্ধে গ্রাফিতির মাধ্যমে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। যারা সেই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি বা ওই সময়টুকুতে অস্বস্তিবোধ করেছেন, তারা গ্রাফিতির মাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

সুবোধের কাছ থেকে যে উচ্চারণগুলো শুনছি, তাতে আমরা কেন বিচলিত হবো? সম্পর্কের মাঝে দেয়াল উঠছে একের পর এক। ‘অনৈতিক’ আগাছায় ভরে গেছে সম্পর্কের জমিন। সু বা শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষেরা তো সত্যিই অচল হয়ে পড়ছেন। এখানে রাজনীতিতে শুদ্ধতা নেই। শিক্ষা এক বাণিজ্যের নাম। স্বাস্থ্য মানে প্রতারণা। নিরাপত্তার চাদরে অযুত ফুটো। শিক্ষক নেই, তারা এখন ক্ষমতার ক্যাডার। পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র থেকে শুভবোধ ও সু-বুদ্ধি পলাতক, এই বার্তাটিই হয়তো গেরিলা শিল্পী নাগরিকদের জানাতে চেয়েছেন। জানানোর মাধ্যম হিসেবে তিনি বা তারা ক্যানভাস হিসেবে বেছে নিয়েছেন দেয়ালকে। শিল্পীর ক্যানভাস বেছে নেওয়াটাও বেশ যৌক্তিক। কারণ মানুষ যখন নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে তখন দেয়ালের সঙ্গেই চলে তার কথোপকথন। এই শহরের নাগরিকেরা হয়তো দেয়ালের কাছে গিয়েই বারবার জানতের চাচ্ছে কখন হবে ভোর, নষ্টদের দখলে যাওয়া সব কিছু আবার আমরা ফিরে পাবো কবে? সকল শুভবোধ ও সু-বুদ্ধির মুক্তিদাবি সরল নাগরিকেরা করবেনই। এটাই নাগরিকের ধর্ম।

‘সুবোধ’এর স্রষ্টা গ্রেফতার হয়েছেন এই খবরটি গুজব হলেও–শুভবোধ, সুচিন্তা, শুভবুদ্ধি ‘নষ্ট’দ্বারা গুম হয়েছে, এই সত্যটি এখন আর গুজব নয়।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি। বাংলা ট্রিবিউন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত