শিরোনাম

প্রকাশিত : ২৪ নভেম্বর, ২০২২, ০৪:২০ সকাল
আপডেট : ২৪ নভেম্বর, ২০২২, ০৪:২০ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

আলী ইমামের মিষ্টি ও যাদুকরী  ভাষায় লেখা ‘গদ্য রচনা’

মোরশেদ শফিউল হাসান

মোরশেদ শফিউল হাসান: যখন স্কুলের ছাত্র তখন থেকেই আমরা তাঁর লেখার সঙ্গে পরিচিত। বিভিন্ন দৈনিকের ছোটদের পাতা এবং ‘কচি ও কাঁচা’, ‘টাপুর টুপুর’ প্রভৃতি পত্রিকায় তখন নিয়মিত তাঁর লেখা প্রকাশিত হতো। মিষ্টি, যাদুকরী ভাষায় লেখা সেসব গদ্য রচনা। তখন তিনি যাই লেখেন, সবই তাঁর সরল স্বাদু ও আকর্ষণীয় ভাষার গুণে আমাদের মতো বয়সীদের কাছে প্রিয় পাঠ্য হয়ে উঠতো। পরবর্তীকালেও তিনি তাঁর এই ভাষা বৈশিষ্ট্যটি অক্ষুণ্ন রাখতে পেরেছেন। নানা বিষয়ে অজস্র লিখেছেন। তবে সবই প্রধানত শিশুÑকিশোরদের জন্য। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা সেসব রচনা থেকে দূরে সরে এসেছি। কিন্তু আমাদের এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্মেরও অনেকের শৈশবÑ কৈশোরের স্মৃতি এবং মানসÑবিকাশের সঙ্গে আলী ইমামের কিশোরোপযোগী লেখাগুলোর সুঘ্রাণ জড়িয়ে আছে। 
[১] ১৯৭২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর তাঁকে পাই আমাদের একই বিভাগের বড় ভাই হিসেবে। মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরের সহপাঠী ছিলেন তিনি। খুব সম্ভব তাঁর মাধ্যমেই আলী ইমাম ভাইয়ের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটে। সে সময় বাংলা বিভাগের সেমিনারে তাঁরা আড্ডা দিতেন। জাহাঙ্গীর ভাই, আলী ইমাম ভাই, আল মনসুর, অন্য বিভাগ থেকে আসতেন মুনতাসীর মামুন ভাই। আমরা ছিলাম প্রথমদিকে তাঁদের সে গল্পগুজবের নীরব শ্রোতা। আসলে এভাবেই এতোদিনের লেখক পরিচয়ের বাইরে ব্যক্তিমানুষ আলী ইমামের সঙ্গে আমাদের কিছুটা ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। তারপর বিভাগে বা বিভাগের বাইরে যখন যেখানেই তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে সহাস্যে নিজেই এগিয়ে এসে আমাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেছেন। লেখালেখি ও অন্যান্য বিষয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন।
ছাত্রজীবন শেষে যোগাযোগটা কমে এসেছিল সত্যি। তারপরও কখনো কখনো দেখা হতো, হয়তো কোনো সভাÑঅনুষ্ঠানে, চলচ্চিত্র প্রদর্শনীতে, পথ চলতি বাংলা বাজারের রাস্তায় কিংবা বাংলা একাডেমির সাধারণ সভায়। দেখা হতেই হাসিমুখের সেই মিষ্টি ও উদাত্ত সম্ভাষণ। তাঁর সমবয়সী বন্ধুরা অনেকেই গত কয়েক বছরে চলে গেছেন। চলে গেছেন মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর ভাই, আরেক জাহাঙ্গীর ভাই (আহমেদ মাহফুজুল হক)। আমাদের বন্ধুÑসহপাঠীদেরও অনেকে। আলী ইমাম ভাইয়ের অসুস্থতার খবর শুনেছিলাম, পরে জেনেছিলাম তিনি সুস্থ হয়ে উঠছেন। আশা ছিল আবার কোথাও আগের মতো দেখা হয়ে যাবে। আগামী মাসেই তো বাংলা একাডেমির সাধারণ সভা। আগে যাঁদের সঙ্গে দেখা হতো, তাঁদের অনেকের সঙ্গেই আর দেখা হয় না, হবে না। আলী ইমাম ভাইও তাঁদের একজন হয়ে গেলেন। মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে খুব। 
[২] বয়স বাড়ার পর তাঁর পাঠকবৃত্ত থেকেও বিচ্যুত হয়ে পড়েছিলাম। তবে মাঝে মাঝে শুনতাম তিনি দুই হাতে অজস্র ধারায় লিখে চলেছেন। তাঁর বইয়ের সংখ্যা নাকি কয়েক শত। কিন্তু দেখা হলে, সংক্ষিপ্ত আলাপেও বুঝতে পারতাম, আমরা তাঁর লেখালেখির খবর না রাখলেও, তিনি আমাদের লেখালেখি, নতুন বই প্রকাশের খবরটুকু অন্তত রাখতে চেষ্টা করেন। একা আমার নয়, অনেকের বা সবার বেলায়ই হয়তো তিনি তা করতেন। যেমন রাখতেন জাহাঙ্গীর ভাইও। এমন মানুষের সংখ্যা তো আমাদের সমাজে দিন দিন কমে আসছে। [৩] অনেক স্মৃতির মধ্যে মনে পড়ছে, সেই ১৯৭২ কি ৭৩ সালেই জাহাঙ্গীর ভাই ও আলী ইমাম ভাইয়ের নেতৃত্বে আমরা কয়েক বন্ধু (গোলাম মুস্তাফা, হুমাছুন, আমি এবং আর কে কে ছিল মনে নেই) একবার কয়েকটা রিক্সায় চড়ে বাংলাবাজারে গিয়েছিলাম, ভারত থেকে আসা বই কিনতে। সেই আমার প্রথম বাংলাবাজার চেনা। আর সেদিনই মাওলা ব্রাদার্সে আমি প্রথম তাঁদের আরেক বন্ধু জাহাঙ্গীর ভাইকেও দেখি।
মনে হয় তিনি তখন ওই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে ছিলেন। বছর বিশেক আগে আমি তাঁর একটি কিশোরোপযোগী বই ‘বাঙলা নামে দেশ’ পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম। একটি পত্রিকায় বইটির একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা লিখেছিলাম আমি। তাতে আমার সে মুগ্ধতার প্রকাশ ঘটেছিল। আলী ইমাম ভাই আমার সে লেখাটি পড়েছিলেন। এরপর দেখা হতে তিনি একধিকবার আমার সে লেখাটির উল্লেখ করেছিলেন মনে আছে। তারপর একবার পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে কোনো এক চলচ্চিত্র প্রদর্শনীতে ঢোকার আগে স্ত্রীসহ আমি লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। দূর থেকে দেখতে পেয়ে তিনি ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। আমাদের সদ্যপ্রকাশিত একটি রূপকথার অনুবাদ সংকলন পাঠের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে সবার সামনে তাঁর সে কী উচ্ছ্বাস প্রকাশ। এইসব মানুষদের আমরা হারিয়ে ফেলছি। [৪] আলী ইমাম ভাই যেখানেই গিয়ে থাকেন, যেন তাঁর মুখের সেই চিরপরিচিত হাসিটি নিয়েই বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে গল্পেÑ আড্ডায় আনন্দিত সময় কাটাতে পারেন, আমরাও গিয়ে যেন সেভাবেই তাঁকে পাই। [৫] তাঁর স্ত্রী, পুত্রÑকন্যা এবং অন্য স্বজনÑপরিজনকে সমবেদনা। তাঁরা যেন ভেতর থেকে এই শোক ও বিচ্ছেদ বেদনা সইবার ও বইবার শক্তি পান, এই কামনা করি। ফেসবুক থেকে 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়