মনিরুল ইসলাম : সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃস্থাপন করা হলে ভবিষ্যতে কোনো সরকার বা সংসদ যাতে সহজে তা বাতিল করতে না পারে, সে জন্য বিশেষ বিধান রাখা হবে বলে জানিয়েছেন সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করতে হলে জনগণের মতামত নেওয়ার জন্য গণভোটের প্রয়োজন হবে।
আজ মঙ্গলবার ৬ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির ষষ্ঠ বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধানের যেসব অনুচ্ছেদে সংশোধন বা সংযোজন আনা হবে, সেগুলো কার্যকর করার আগে গণভোটের ব্যবস্থা থাকতে হবে। এটি হবে সাংবিধানিক গণভোট। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এর আগে অনুষ্ঠিত গণভোট ছিল আইনি গণভোট।
সংবিধানের প্রস্তাবনা, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি ও মৌলিক বিষয়ে পরিবর্তন আনা হলে গণভোটের বিষয়টি সামনে আসবে বলেও জানান তিনি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আর্টিকেল ৪৫৬-এ আসবে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে আমরা ধারণ করব।’
সহজে বাতিল করা যাবে না তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে ফিরিয়ে আনার পর ভবিষ্যতে যাতে কোনো সরকার বা সংসদ সহজে সেটি পরিবর্তন করতে না পারে, সে বিষয়েও সুরক্ষা রাখার কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার পর সেটি পরিবর্তন করতে হলেও জনগণের কাছে যেতে হবে—এমন বিধান রাখা প্রয়োজন।
গণভোটের বিধান সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ থেকে তুলে দেওয়ার বৈধতা নিয়েও কথা বলেন তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ১৪২ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে গণভোটের বিধান তুলে দেওয়া হয়েছিল। পরে সেটিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায় হয়েছে। বিচার বিভাগের রায়ের ভিত্তিতে সংবিধানে সংশ্লিষ্ট বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
কীভাবে গঠিত হবে, এখনও চূড়ান্ত নয়
তত্ত্বাবধায়ক সরকার কী প্রক্রিয়ায় গঠিত হবে, কারা এতে থাকবেন এবং কী পদ্ধতিতে সরকার গঠন করা হবে—এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, বিষয়টি সংসদে আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত হবে। বর্তমানে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়া হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে আইনজীবী, বিচারক, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইন বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের সঙ্গেও আলোচনা করা হবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পদ্ধতি নিয়ে একাধিক বিকল্পও বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
রাষ্ট্রপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে কোনো প্রক্রিয়াই এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বিরোধী দল ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকেও বিভিন্ন প্রস্তাব আসতে পারে। সব প্রস্তাব পর্যালোচনা করে বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকা একটি পদ্ধতি নির্ধারণের লক্ষ্য রয়েছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ-আহতদের মতামত
ষষ্ঠ বৈঠকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের সঙ্গে মতবিনিময় করে কমিটি। এতে শহীদের মা-বাবা, ভাই এবং বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিসহ মোট ৬৩ জন অংশ নেন।
মতবিনিময়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং শহীদ ও আহতদের সাংবিধানিক সুরক্ষার দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি জুলাই ঘোষণাপত্রের সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সংবিধানের উপযুক্ত জায়গায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবও আসে।
শহীদ ও আহতদের পক্ষ থেকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ঘিরে মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিচার দ্রুত শেষ করার দাবিও জানানো হয়।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে সরকার আন্তরিক। তদন্ত, প্রসিকিউশন ও চার্জ গঠনের ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার
জুলাই জাতীয় সনদ নোট অব ডিসেন্টসহ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেভাবেই তা বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, নোট অব ডিসেন্টসহ যেভাবে জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেটি বাস্তবায়নে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ।
তবে শুধু জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে সংবিধান সংশোধনের অন্যান্য বিষয় বাদ পড়ে যেতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত এবং অন্যান্য প্রস্তাব বিবেচনায় নিয়ে সংসদে একটি বিল উপস্থাপনের জন্য রিপোর্ট দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
বিরোধী দলের লং মার্চ প্রসঙ্গ
বিরোধী দলের লং মার্চ কর্মসূচি প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এটি তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। তবে সংবিধান সংশোধনের বিষয়টি সংসদেই আলোচনা ও নিষ্পত্তি হবে।
ষষ্ঠ বৈঠক পর্যন্ত সংবিধান সংশোধন নিয়ে কতটা অগ্রগতি হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা বাকি রয়েছে। সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সাবেক বিচারপতি, বিচারক, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি, আইন বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের কাছ থেকে মতামত নেওয়া হবে। এরপর কমিটির বৈঠকে এসব প্রস্তাব পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।