মহসিন কবির: ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারে আতঙ্কে ছিলো আওয়াশী লীগের নেতাকর্মীরা। অনেকে করাগারে আছেন, অনেকে পালিয়ে গেছেন, অনেকে আছেন আত্মগোপনে। ইতোমধ্যে নেতানেত্রীরা জামিন পেয়েছে। কক্সবাজারের সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদি ও নারায়ণগঞ্জের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন।
২০২৫ সালের মে মাসে আওয়ামী লীগের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছে। স্থগিত করা হয় দলটির নিবন্ধনও। এ কারণে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও অংশ নিতে পারেনি আওয়ামী লীগ। ভোটের আগে ‘নো বোট নো ভোট’ ক্যাম্পেইন চালালেও নির্বাচন প্রতিহতে তেমন কোনো কর্মসূচি দিতে দেখা যায়নি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে। বরং নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসায় এখন তারা ‘হাঁপ ছেড়ে বাঁচা’র মতো অবস্থায় আছে।
নির্বাচন শেষ হওয়ার পরপরই ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় দলটির নেতাকর্মীরা কার্যালয়ে প্রবেশের চেষ্টা করেছেন। কোথাও কোথাও ইতোমধ্যে অবস্থানও নিয়েছেন। কিছু স্থানে কার্যালয় খোলার পর পালটা দখল, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটলেও ক্ষমতাসীন দল বিএনপির কেন্দ্রীয় অবস্থানকে ‘ইতিবাচক’ হিসাবেই দেখছে আওয়ামী লীগ। ফলে দলটি এখন সরকারের ‘সবুজ সংকেত’র অপেক্ষায় রয়েছে। সরকার ‘ছাড়’ দিলে তারা ইতিবাচক রাজনীতির পথেই ফিরতে চান।
গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে ছিল। পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপিও আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফিরে আসার ঘোরতর বিরোধী। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি নমনীয় না হলে বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগের অফিস খোলা সম্ভব ছিল না বলে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা আছে। ফলে আওয়ামী লীগ এখন বিএনপির দিকেই তাকিয়ে আছে।
আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলটি আপাতত সহিংসতার পথে না গিয়ে গুছিয়ে রাজনীতি করার পক্ষে। সেক্ষেত্রে একটু ‘স্পেস’ পেলেই কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দলকে পুনর্গঠন করার পরিকল্পনাও রয়েছে আওয়ামী লীগের। যাদের কারণে অতীতে দলের ইমেজ ধ্বংস হয়েছে, তাদের আর কোনো পর্যায়েই নেতৃত্বে রাখা হবে না এটি মোটামুটি নিশ্চিত। পুরোনোদের বাদ দিয়ে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি এবং তরুণ নেতাদের নেতৃত্বে আনা হবে।
আওয়ামী লীগে শেখ হাসিনা শেষ কথা হলেও পরিস্থিতি বিবেচনায় বিকল্প নেতৃত্বও ভাবা হতে পারে। তবে এমন পরিস্থিতির মধ্যেও ‘শেখ পরিবার’র হাতেই থাকবে দলের দায়িত্বভার। সেক্ষেত্রে শেখ হাসিনা পেছনে থেকে দলের মূল চালিকা শক্তি হিসাবে কাজ করতে পারেন। আর সামনে আসতে পারেন অন্য কোনো নেতৃত্ব।
জানুয়ারিতে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, তার মা (শেখ হাসিনা) হয়তো আর সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরবেন না। কারণ, তিনি অবসর নিতে চেয়েছিলেন। সাক্ষাৎকারে জয়কে প্রশ্ন করা হয়েছিল আপনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, আপনার মা রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। তার মানে কি এই, তিনি যদি কখনো বাংলাদেশে ফিরে যেতে পারেনও, তবু তিনি আর রাজনৈতিক অঙ্গনে থাকবেন না?’ জয়ের উত্তর ছিল ‘না, তিনি বৃদ্ধ। মা এখন প্রবীণ। এমনিতেও এটিই ছিল তার শেষ মেয়াদ। তিনি অবসর নিতে চেয়েছিলেন।’ ‘তাহলে কি এটি এক অর্থে হাসিনা যুগের অবসান?’-এমন পালটা প্রশ্নে জয় বলেছিলেন, ‘সম্ভবত, হ্যাঁ।’
যদিও আওয়ামী লীগ নেতারা প্রকাশ্যে এখনো বলছেন, দলের নেতৃত্বের প্রশ্নে শেখ হাসিনাই শেষ কথা। দলও তার নেতৃত্বে এখনো ঐক্যবদ্ধ আছে। এছাড়া আওয়ামী লীগের এই কঠিন সময়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের বিকল্প নেই বলেও মনে করেন তারা। আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার বিষয়টি আমরা ইতিবাচক হিসাবেই দেখছি। নেতাকর্মীদের মধ্যেও স্বস্তি ফিরে এসেছে। এখন রাজনীতি করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে অবশ্যই ভাবা হবে।’ তিনি জানান, দলের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত অবশ্যই পরিবর্তন আসবে। বিতর্কিতদের বাদ দেওয়া হবে। নতুন নেতৃত্ব সামনে আনা হবে।’
দলের সভাপতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগে এখনো শেখ হাসিনার বিকল্প কেউ নেই। পরিস্থিতি বিবেচনায় তিনিই সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন।’
আওয়ামী লীগের একজন সাংগঠনিক সম্পাদক গণমাধ্যমকে বলেছেন, নেত্রী (শেখ হাসিনা) ইতোমধ্যে নির্দেশনা দিয়েছেন। সবাইকে দলের কার্যালয়গুলো খোলার জন্য বলেছেন। এখন যেহেতু ড. ইউনূস সরকার চলে গেছে; ফলে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে। তাই নেতাকর্মীরাও কার্যালয়ে যাচ্ছেন। আত্মগোপন থেকে নেতাকর্মীরাও বেরিয়ে আসছেন। দেশের বাইরে থাকা অনেকেই দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, আমাদের কোটি কোটি নেতাকর্মী ও সমর্থক দেশে রয়েছেন। আমরা তাদের বিপদে ফেলতে চাই না। তাই তড়িঘড়ি করে কোনো কর্মসূচি বা তেমন কোনো কিছু আপাতত দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে না। বিএনপির অবস্থানও আমরা পর্যবেক্ষণ করছি।
তারেক রহমান এখন পর্যন্ত যেসব পদক্ষেপ নিয়েছেন সেগুলোকে বেশ ‘ইতিবাচক’ বলে উল্লেখ করে ওই নেতা বলেন, ‘আওয়ামী লীগ যা করেছে তার সবকিছু সঠিক ছিল না। তবে নতুন প্রধানমন্ত্রী দেশে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে ইতিহাসে নাম লেখাতে চাইছেন বলেই মনে হচ্ছে। পরিস্থিতি এমন হলে আওয়ামী লীগও ইতিহাস থেকে শিখে নতুন ধারার রাজনীতি করতে উৎসাহিত হবে।
আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড মনে করছে, নির্বাচিত নতুন সরকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় গুরুত্ব দেবে। সেক্ষেত্রে আওয়ামী লীগকে ছাড় দেওয়া হতে পারে বলেও মনে করছেন তারা। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের এখন পর্যন্ত দেওয়া বক্তব্য এবং তার কর্মকাণ্ডেও স্বস্তির জায়গা রয়েছে বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা। তাদের কেউ কেউ বলেছেন, তারেক রহমান ও বিএনপির কর্মকাণ্ড ইতিবাচক। ফলে খুব শিগগিরই দলের কার্যক্রমে যে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া রয়েছে, তা তুলে নেওয়ার ব্যাপারেও আশাবাদী তারা।
সোমবার নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রশ্ন করা হয় বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের অফিসগুলো খোলা হচ্ছে, এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান কী? জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা আমরা চাইনি এবং যেহেতু আইনগতভাবে বলা আছে যে তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, সেভাবেই এটাকে দেখা হবে সব জায়গায়।
এর পরদিন মঙ্গলবার বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ও দলের প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণের পর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আব্দুল মঈন খানের কাছে সাংবাদিকরা জানতে চান আওয়ামী লীগ বিভিন্ন জায়গায় তাদের অফিস খুলছে, ‘গণহত্যাকারীরা’ দেশে ফিরছে; এই ব্যাপারে বিএনপির অবস্থান কী? জবাবে তিনি বলেন, আমাদের দলীয় অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট।
একদলীয় বাকশাল শাসন যেটা বাংলাদেশের ওপরে জগদ্দল পাথরের মতো আওয়ামী লীগ চাপিয়ে দিয়েছিল, সেই ধারণায় বিএনপি বিশ্বাস করে না; বিএনপি জনগণের শক্তিতে বিশ্বাস করে। তিনি আরও বলেন, আমরা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিতে চাই যে, বিএনপি একটি উদারনৈতিক রাজনৈতিক দল; সবাইকে নিয়ে আমরা রাজনীতি করি, আমরা প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। এটা আমাদের নেতা জনাব তারেক রহমান বারবার বলেছেন। তিনি আরও বলেছেন যে, আমরা আইনের শাসনে বিশ্বাসী।