শিরোনাম
◈ কোরআ‌নে চুমু দি‌য়ে যাত্রা শুরু, মেক্সিকোতে ইরানের বিশ্বকাপ দল‌কে উষ্ণ অভ্যর্থনা ◈ নাহিদ রানাকে নিয়ে আতং‌কে আ‌ছি, বললেন অ‌স্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক ◈ মোবাইলের স্ক্রিন থেকে মাঠে ফিরুক শিশুরা, খেলার মাঠ ও পার্ক দখলমুক্তের ঘোষণা সংসদে ◈ ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নেই, তবু বলছি’— আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সংসদে রুমিন ফারহানার তোপ ◈ যুক্তরা‌স্ট্রে ইংল্যান্ড দ‌লের ক‌্যা‌ম্পের কা‌ছেই বন্দুক হামলা, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বিশ্বকাপের অ‌নেকগুলো দল ◈ এলডিসি উত্তরণের প্রভাব: ঝুঁকিতে সাড়ে ১৭ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি: বাণিজ্যমন্ত্রী ◈ উত্তরবঙ্গের আকাশপথে নতুন দিগন্ত, ৩ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে বদলে যাচ্ছে বগুড়া বিমানবন্দর ◈ বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৩৫ লাখ টন খাদ্য অপচয় হচ্ছে : সংসদে খাদ্যমন্ত্রী ◈ বজ্রপাত ও দুর্যোগ ঝুঁকি কমাতে আধুনিক প্রযুক্তির দিকে যাচ্ছে সরকার : সংসদে ত্রাণমন্ত্রী ◈ আফগা‌নিস্তান নাজেহাল, একদিনেই দু’বার অলআউট করে ৩০০ রা‌নে টেস্ট জিতলো ভারত

প্রকাশিত : ০৭ মে, ২০২৬, ০৮:৩৯ রাত
আপডেট : ০৭ জুন, ২০২৬, ১২:০০ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

এপারে মন্দির পাহারায় সম্প্রীতির নজির, ওপারে বুলডোজারে মুসলিম উচ্ছেদের বর্বরতা

গত ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে যখন এক বিশাল রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে, তখন এক শ্রেণির স্বার্থান্বেষী মহল দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের তথাকথিত ‘উগ্র’ তকমা পাওয়া ডানপন্থী ও ইসলামি দলগুলো সেই ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিয়ে এক অনন্য নজির স্থাপন করে। অথচ ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে ওপার বাংলায়। কাটাতারের ওপারে চলছে মধ্যযুগীর বর্বরতা।

পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মুসলিমদের স্থাপনা, দোকানপাট ও ঘরবাড়িতে পরিকল্পিত হামলা, ভাঙচুর এবং নাম পরিবর্তনের রাজনীতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন বইছে ক্ষোভের ঝড়।

একাধিক ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, গেরুয়াধারী হিন্দুত্ববাদী জঙ্গিরা মুসলিম নারীর নেকাব টেনে খুলে নিচ্ছেন। কোথাও বাইক চালিয়ে যাওয়া মুসলিম বৃদ্ধকে ছোট্ট শিশুরাও ‘জয় শ্রী রাম’ বলে আক্রমণ করছেন। একটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, হিন্দুত্ববাদী জঙ্গিরা একটি কলেজের বাইরে দাঁড়িয়ে হুমকি-ধামকি দিচ্ছে, ‘এখন থেকে কোনো মুসলিম নারী বোরকা পরে কলেজে আসতে পারবে না। আগামীকাল থেকে কোনো বোরকা মেনে নেওয়া হবে না।’ অনেক জায়গায় মুসলিমদের মাংশের দোকান ও বিরিয়ানির হোটেল গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। দলবল নিয়ে হামলা চালিয়ে ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান দিয়ে ঘরবাড়ি ভাঙচুর চালানো হচ্ছে।

৫ই আগস্টের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যখন কিছুটা শিথিল ছিল, তখন বাংলাদেশের ডানপন্থী দলগুলো—বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি এবং ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীরা রাত জেগে পালা করে হিন্দুদের মন্দির ও ঘরবাড়ি পাহারা দিয়েছেন। যাত্রাবাড়ীর মতো গুরুত্বপূর্ণ ও সংঘাতপ্রবণ এলাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত কোথাও কোনো বড় ধরনের এ্যানার্কি বা সাম্প্রদায়িক ভাঙচুরের ঘটনা ঘটতে দেয়নি এদেশের ‘চাষাভূষা’ বলে পরিচিত সাধারণ মুসলমানরা।

শাপলা চত্বরে যারা জীবন দিয়েছিল কিংবা জুলাই আন্দোলনে যারা যাত্রাবাড়ীর রাজপথে বুক পেতে দিয়েছিল, সেই ‘নন-সেক্যুলার’ তরুণরাই মন্দিরের সামনে জায়নামাজ বিছিয়ে তাহাজ্জুদ পড়ে রাত কাটিয়েছেন। তাদের লক্ষ্য ছিল একটাই—যাতে রাতের অন্ধকারে কেউ দেশের সংখ্যালঘু ভাইদের ওপর হামলা চালিয়ে বৈশ্বিক রাজনীতিতে বাংলাদেশকে কালিমালিপ্ত করতে না পারে। বাংলাদেশের ইসলামি দলগুলোর এই উদারতা ও দায়িত্বশীলতা বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হলেও একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী ও ওপার বাংলার মিডিয়া তা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে।

বাংলাদেশের চিত্র যেখানে সম্প্রীতির, সেখানে পশ্চিমবঙ্গের চিত্র ভয়াবহ। সম্প্রতি বিজেপির রাজনৈতিক অগ্রযাত্রার পর সেখানে মুসলিমদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালানোর দৃশ্য ছড়িয়ে পড়েছে। উগ্র হিন্দুত্ববাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সেখানে কেবল মানুষের ঘরবাড়ি নয়, বরং ইতিহাসের ওপরও চালানো হচ্ছে বুলডোজার।

এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উঠে এসেছে বারাসাতের ঐতিহ্যবাহী ‘সিরাজ উদ্যান’-এর নাম পরিবর্তনের ঘটনা। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার স্মৃতিবিজড়িত এই পার্কটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে ‘শিবাজী উদ্যান’। ইতিহাসবিদরা বলছেন, শিবাজীর সাথে বাংলার ইতিহাসের কোনো প্রত্যক্ষ যোগসূত্র না থাকলেও স্রেফ ধর্মীয় মেরুকরণ ও মুসলিম বিদ্বেষ থেকে এই নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। এছাড়া বুলডোজার দিয়ে মুসলমানদের দোকানপাট গুড়িয়ে দেওয়া এবং পরিকল্পিতভাবে সাম্প্রদায়িক উস্কানি দেওয়ার অসংখ্য ভিডিও নেটদুনিয়ায় ভাইরাল হয়েছে।

বাংলাদেশে একজন হিন্দু সামান্য আক্রান্ত হলেও যেখানে সাউথ ব্লক (ভারত) থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় তোলপাড় শুরু হয়, সেখানে পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদের ওপর ঘোষণা দিয়ে প্রকাশ্যে চালানো এই বর্বরতায় ভারতীয় মিডিয়া রহস্যজনকভাবে নীরব। মানবাধিকার কর্মীদের এই ‘চোখে ঠুলি’ পরা নীতি নিয়ে নেটিজেনরা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।

নেটিজেনরা বলছেন, সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশের কিছু সংখ্যালঘু ব্যক্তির চরমপন্থী ও উসকানিমূলক আচরণ। সম্প্রতি ইসকন সন্ত্রাসী চিন্ময় দাসের সহকারী প্রবীর চন্দ্র পালের মতো ব্যক্তিদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের খাদ্যাভ্যাসে বিধিনিষেধ আরোপ নিয়ে উল্লাস করতে দেখা গেছে, যা এদেশের মানুষের মনে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। সাধারণ জনমনে এই আশঙ্কার সৃষ্টি হচ্ছে যে, জনতাত্ত্বিক কাঠামো ভিন্ন হলে হয়তো এদেশেও সাম্প্রদায়িক উগ্রবাদের ভয়াবহ রূপ দেখা যেত। অনেকেই মনে করছেন, ভারতের হিন্দুত্ববাদী আগ্রাসন ভবিষ্যতে সীমান্ত পেরিয়ে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করতে পারে এবং এখানকার সুপ্ত উগ্রবাদীরা তাতে ইন্ধন দিতে পারে; তবে এদেশের সচেতন তৌহিদী জনতা ও সম্প্রীতিপ্রিয় মানুষ যেকোনো মূল্যে সেই অশুভ চক্রান্ত রুখে দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।"

তারিক সাদাত নামে ফেসবুকে একজন লিখেছেন,‘‘বাংলাদেশের উগ্র ডানপন্থী বা দক্ষিণপন্থীরা ৫ই আগষ্টের পর রাত জেগে পালা করে মন্দির পাহারা দিসে, তাদের দ্বারা দেশের কোথাও বলতে গেলে কোন এ্যানার্কি বা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে নাই।দেশের এই ঊনমানুষ 'উগ্রপন্থীরা' শাপলাতে যেমন জীবন দিসে, জুলাইতেও তেমনি যাত্রাবাড়ির মতোন একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় প্রতিরোধ গড়ে তুলছিলো।অতএব ওপার বাংলার যেই দক্ষিণপন্থীরা হাতে ক্ষমতা পাওয়ার সাথে সাথে বুলডোজার দিয়ে দোকানপাট গুড়ায়ে দিতেছে আর চারদিকে ঘৃণার রাজনীতি ছড়াইতেছে, তাদের সাথে এপার বাংলার ডানপন্থীদের তুলনা তাদেরই কাজ যারা এপার বাংলার চাষাভুষা মুসলমানদেরকে ঔন করতে চায় না।

এপার বাংলার ডানপন্থীরা কখনোই ঘৃণার রাজনীতি করে নাই, করবেও না। এইটাই নন-সেক্যুলার বাংলাদেশী মুসলমানের চরিত্র।

ফেসবুকে অপর একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, "বাংলাদেশের হুজুররা মন্দির পাহারা দিয়ে নিজেদের অসাম্প্রদায়িক চরিত্রের প্রমাণ দিয়েছেন। অথচ ওপার বাংলায় ক্ষমতার দম্ভে মুসলিম নিধন ও ইতিহাস বিকৃতি চলছে। এই বৈষম্যই প্রমাণ করে কারা প্রকৃতপক্ষেই উগ্র আর কারা শান্তির ধারক।"

পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে মুসলিম ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনায় অসংখ্য পরিবার এখন ঘরছাড়া। সেখানকার স্থানীয় প্রশাসন ও কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না থাকায় উদ্বেগ বাড়ছে। বিপরীতে, বাংলাদেশে ৫ই আগস্টের পর জামায়াত-বিএনপিসহ ডানপন্থী দলগুলো প্রতিটি মন্দিরে গিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাদের সাথে মতবিনিময় করেছেন এবং নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়েছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এপার বাংলার মুসলমানরা কখনোই ঘৃণার রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয়। সিরাজউদ্দৌলার অসাম্প্রদায়িক চেতনার উত্তরসূরি হিসেবে তারা মন্দির পাহারা দেওয়াকে নিজেদের ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্ব মনে করে। অথচ ওপার বাংলার উগ্রবাদীরা ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার সাথে সাথেই চরম অসহিষ্ণুতার পরিচয় দিচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গের এই সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বন্ধে এবং মুসলিমদের জানমালের নিরাপত্তায় আন্তর্জাতিক মহলের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন নেটিজেন ও সচেতন নাগরিক সমাজ। বাংলাদেশের সম্প্রীতির মডেল যেখানে উদাহরণ হতে পারতো, সেখানে প্রতিবেশী রাজ্যে ঘৃণার এই চাষাবাদ দুই বাংলার মানুষের মধ্যে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি করছে।

সূত্র: ইনকিলাব

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়