সহযোগীদের খবর: অস্ট্রেলিয়া সরকার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য পড়াশোনা-পরবর্তী কাজের ভিসার ফি ২,৩০০ ডলার থেকে ৪,৬০০ ডলার বাড়িয়েছে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভিসায় যোগ হয়েছে নতুন নীতিমালা। এই ভিসা জটিলতা ও নীতিমালার ঘন ঘন পরিবর্তন আন্তর্জাতিক মেধাবী শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উপরও। গত সপ্তাহে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ আইন জারি করে। অস্থায়ী স্নাতক ভিসার খরচ কেন্দ্রীয় সরকার দ্বিগুণ করায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে হতাশা। সূত্র: মানবজমিন
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের শীর্ষ সংস্থা ফেডারেল সরকারের কাছে এই পরিবর্তনগুলো প্রত্যাহার করার আহ্বান জানিয়েছে বলে সূত্রে জানা গেছে। অস্ট্রেলিয়ান ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস অনুসারে, লোহা, কয়লা এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের পর শিক্ষা অস্ট্রেলিয়ার চতুর্থ বৃহত্তম আয়ের উৎস। ২০২৫ সালে শেষ হওয়া অর্থবছরে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতিতে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার আয় হয়। তথ্য অনুযায়ী, ২০ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা করছেন।
সুন্দর ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে প্রতিদিন অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমাচ্ছেন হাজারো বাংলাদেশী শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে ৯০ ভাগের স্বপ্ন অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়া। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি দিয়েই শুরু হয় সেই স্বপ্নবাজদের নতুন যাত্রা। যে যাত্রা পাড়ি দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে শতশত শিক্ষার্থীর। কিছু দিন যেতে না যেতেই শুরু হয় প্রবাস ও দেশের পার্থক্য খোঁজাখুঁজি। কাজ খুঁজতে খুঁজতে চলে যায় কয়েক মাস। এর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য কাজের সীমাবদ্ধতা।
প্রতি সপ্তাহে ২৪ ঘণ্টা কাজের সীমাবদ্ধতা বেঁধে দিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্র ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু প্রতি সপ্তাহে ২৪ ঘণ্টা কাজ করে টিউশন ফির টাকা ব্যবস্থা করা সম্ভব হয় না। তাই বাধ্য হয়েই একটি করযোগ্য কাজ অন্যটি কর ছাড়া কাজ করতে হয় শিক্ষার্থীদের। অস্ট্রেলিয়া কর ছাড়া কাজ করলে সেটি অবৈধ ইনকাম বলে গণ্য হয়। সরকার কয়েক দিন পর পর আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন নতুন আইন প্রনয়ণ করে আসছে। সে কারণে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হচ্ছে বাংলাদেশিসহ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের।
এদিকে ২০২৬ সালের শুরু থেকে, নথি জালিয়াতির উদ্বেগের কারণে অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশি, পাকিস্তান , নেপাল ও ভারতের শিক্ষার্থীদের জন্য ভিসার নিয়মকানুন উল্লেখযোগ্যভাবে কঠোর করেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশকে এভিডেন্স লেভেল ১ থেকে ৩-এ—নিয়েছে যা সবচেয়ে কঠোর বিভাগ—স্থানান্তরিত করেছে। স্টুডেন্ট ভিসা নিশ্চিত করার জন্য আবেদনকারীদের এখন আরও কঠোর আর্থিক নথিপত্র, তহবিলের বিস্তারিত প্রমাণ, উচ্চতর ইংরেজি দক্ষতা এবং আসল একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট জমা দিতে হবে।
সেন্ট্রাল কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটি সিডনি ক্যাম্পাসের মাস্টার্স এর শিক্ষার্থী মো: ইমাম মেহেদী হাসান লিহাম জানান, অস্ট্রেলিয়া সরকারের পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই অস্থায়ী ভিসার ফি দ্বিগুণ হওয়ায় আমার মতো অনেকে হতবাক হয়েছে। এখানে পড়াশোনার পাশাপাশি অন্যান্য যাবতীয় খরচও অনেক বেশি। প্রতি বছর ইউনিভার্সিটির টিউশন ফি বাড়তে থাকে। আমার বছরে শুধু টিউশন ফি দিতে হয় ২৮ হাজার ডলার। এ ফি জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হয়। প্রায় সময় দেশে থাকা আমার বাবার কাছ থেকে টাকা আনতে হয়। কারণ- স্টুডেন্টদের জন্য কর যুক্ত কাজের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমরা এশিয়ান হওয়ায় ডিপার্টমেন্টাল চাকরি পেতেও অনেক কষ্ট করতে হয়। তাই কেউ কেউ কর ছাড়াই কাজ খুঁজে নিতে বাধ্য হয়। আগামীতে কী হবে তা জানি না। পড়ালেখা শেষ করে অস্ট্রেলিয়ায় থাকবো কি না তা নিয়ে ভাবতে হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
সিডনি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ইউটিএস) এর মাস্টার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সাদিদ হোসেন জানিয়েছেন, শুধু পড়াশোনার জন্যই অতিরিক্ত তহবিল জোগাড় করতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে। এর মধ্যে অস্থায়ী ভিসার ফি বাড়িয়ে দেয়ায় নতুন করে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। আমি আমার সেমিস্টার শেষ করে অস্থায়ী ভিসার জন্য আবেদন করতে হলে বড় অঙ্কের টাকা ব্যবস্থা করতে হবে। না হয় দেশে চলে যেতে হবে। এখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো কাজ। কাজের সীমাবদ্ধতা থাকায় প্রায় সবাইকেই সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। সরকারের নতুন আইনের কারণে সবাই বিপাকে।
ইউনিভার্সিটির ফির বাইরে থাকা খাওয়াসহ অন্যান্য খরচ প্রতি মাসে ২ হাজার ডলারের মতো চলে যায়। এখানে ঘর ভাড়া অনেক। সপ্তাহে ২৪ ঘণ্টা কাজ করে খরচ পোষানো যায় না। তিনি আরো জানান, এক জনের জন্য ইনসুরেন্সে ও এজেন্সি ফিসহ দুই বছরের অস্থায়ী ভিসার জন্য ১০ হাজার ডলারের মতো পড়ে যায়। আবার কেউ যদি স্বামী-স্ত্রীসহ থাকেন তাদের সবকিছু মিলিয়ে প্রায় ১৮ হাজার ডলারের মতো লাগে। অনেকের পক্ষে এ টাকা জোগাড় করা কঠিন হওয়ায় তারা এখানে না থেকে দেশে চলে যাচ্ছেন। অনেকেই দেশ থেকে স্বপ্ন ও আগ্রহ নিয়ে অস্ট্রেলিয়া আসেন। কিন্তু এখানে এসে পরিস্থিতি মোকাবিলায় বুঝতে পারেন কত কষ্ট করতে হয়।
ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশন অফ অস্ট্রেলিয়ার সিইও ফিল হানিউড বলেন, অস্ট্রেলিয়ায় হাজার হাজার শিক্ষার্থীর স্টাডি ভিসার মেয়াদ প্রায় শেষ হতে চলেছে। তাদের জন্য এই মূল্যবৃদ্ধি ‘অন্যায্য’। পোস্ট-স্টাডি ভিসা এবং স্টুডেন্ট ভিসার এই মূল্য ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা করতে নিরুৎসাহিত করবে। সাধারণ ছাত্র ভিসার বর্তমান খরচ ২,০০০ ডলার এবং এটি বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল ভিসা— যা যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার চেয়েও অনেক বেশি।
ন্যাশনাল ইউনিয়ন অফ স্টুডেন্ট (এনইউএস)-এর সভাপতি ফেলিক্স হিউজ জানান, আমরা ফেডারেল সরকারের কাছে এই ফি বৃদ্ধি প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে একটি আবেদন করেছি। এই নীতি পরিবর্তন ভুল বার্তা দেয়। রাতারাতি এটি দ্বিগুণ করে দেয়াটা এই ব্যবস্থার উপর আমাদের আস্থা নষ্ট করে এবং শিক্ষার্থীদের আগে থেকে পরিকল্পনা করার সুযোগ দেয় না। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, সরকার শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করবে।
অস্ট্রেলিয়া সরকারের শিক্ষামন্ত্রী জেসন ক্লেয়ার বলেন, আন্তর্জাতিক শিক্ষা শুধু আমাদের অর্থই এনে দেয় না এটি আমাদের বন্ধুও তৈরি করে দেয়। অস্থায়ী স্নাতক ভিসাধারীরা সীমাহীন কাজের অধিকার রাখেন এবং তারা তাদের অস্ট্রেলিয়ান যোগ্যতা ব্যবহার করে স্নাতক পর্যায়ের কাজের সুযোগ পেতে এবং অস্ট্রেলিয়া বা বিদেশে তাদের কর্মজীবনে উন্নতি করতে পারেন।