শিরোনাম
◈ গুলশানে দুটি স্পা সেন্টারে পুলিশের অভিযান, ২৮ জন আটক ◈ হাদি হত্যা মামলায় জাবেরকে বাদী করার কারণ জানতে চান বোন মাসুমা ◈ বাজেট অধিবেশন ঘিরে সংসদ ভবন এলাকায় আগ্নেয়াস্ত্র বহন ও মিছিল-সমাবেশ নিষিদ্ধ ◈ এশিয়ান গেমস ক্রিকে‌টে বাংলা‌দেশসহ ১০ দল চূড়ান্ত, অ‌ক্টোব‌রে খেলা হ‌বে জাপা‌নে  ◈ গ‌্যাংস্টার দাউদ ইব্রাহিমের হুম‌কি‌তে আ‌মি প্রস্রাব ক‌রে দেই, আইপিএলের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা শোনালেন ললিত মো‌দি ◈ আগস্টে ইউপি নির্বাচনের তফসিল, আচরণবিধিতে আসছে বড় পরিবর্তন ◈ হামে ও উপসর্গে মৃত্যু বেড়ে ৬১০, ২৪ ঘণ্টায় প্রাণ গেল আরও ৫ শিশুর ◈ পাহাড়ি অঞ্চলে সফল আর্লি ওয়ার্নিং মডেল: আগাম সতর্কবার্তায় কমছে প্রাণহানি, ভূমিধস মোকাবিলায় নতুন আশার আলো ◈ মার্কিন ভিসা আবেদনকারীদের সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল ‘পাবলিক’ রাখার নির্দেশ দিয়েছে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস ◈ মিথ্যা কাহিনি ও জাল কাগজে অ্যাসাইলাম, হাজারো আবেদন বাতিলের হুঁশিয়ারি

প্রকাশিত : ১৬ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১১:০৫ দুপুর
আপডেট : ০৫ জুন, ২০২৬, ০৯:০০ সকাল

প্রতিবেদক : মহসিন কবির

আয়ের সঙ্গে ব্যয় মিলাতে পারছেন না সাধারণ মানুষ

মহসিন কবির: মূল্যস্ফীতি বাড়ায় দেশের মানুষ আয়ের সঙ্গে ব্যয় মিলাতে পারছেন না। দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাওয়ায় বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি কম হারে বাড়ায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধারাবাহিকভাবে দুর্বল হচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) অনুযায়ী, চলতি বছরের নভেম্বরে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে, যা অক্টোবরে ছিল ৮ দশমিক ১৭ শতাংশ। এক বছর ধরে কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণের পরও মূল্যস্ফীতির এই ঊর্ধ্বগতি নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

অন্যদিকে, একই সময়ে মজুরি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ০৪ শতাংশে, যা মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম। ফলে গত বছরের তুলনায় পরিবারগুলোর প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে।

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বর মাসে জাতীয় পর্যায়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ, যা অক্টোবরে ছিল ৭ দশমিক ০৮ শতাংশ। শহরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৬১ শতাংশ এবং গ্রামে ৭ দশমিক ২৭ শতাংশ। যদিও এই হার ২০২৪ সালের নভেম্বরের ১৩ দশমিক ৮০ শতাংশের তুলনায় অনেক কম, তবুও খাদ্যপণ্যের দাম বাড়াই সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেছেন, সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির পেছনে খাদ্যদ্রব্যের দামই মূল ভূমিকা রাখছে। নন-ফুড মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও খাবারের দাম বাড়ায় মানুষের ওপর চাপ বাড়ছে। তিনি আরও জানান, টানা ৪৫ মাস ধরে মজুরি মূল্যস্ফীতির চেয়ে পিছিয়ে থাকায় শ্রমিকদের প্রকৃত আয় কমছে এবং শ্রমবাজারেও চাপ তৈরি হচ্ছে। বেশি বেতনের কাজে স্থানান্তরের সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেক শ্রমিক কম বেতনের কাজেই আটকে থাকছেন।

খাতভিত্তিক হিসেবে কৃষিতে মজুরি বেড়েছে ৮ দশমিক ১৪ শতাংশ, শিল্পে ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ এবং সেবা খাতে ৮ দশমিক ২২ শতাংশ। তবে কোনো খাতেই এই প্রবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।

নভেম্বরে নন-ফুড মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০৮ শতাংশে, যা অক্টোবরে ছিল ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। গ্রামে এই হার ৯ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং শহরে ৮ দশমিক ৯১ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। খাদ্য, জ্বালানি, চিকিৎসা ও বাসস্থানের খরচ বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষকে আয়ের বড় অংশ ব্যয় করতে হচ্ছে। এতে সঞ্চয় কমছে এবং জীবনযাত্রার মান নিচে নেমে যাচ্ছে।

মূল্যস্ফীতি সঞ্চয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। যখন পণ্যের দাম বাড়তে থাকে, তখন টাকা বা মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। ফলে সঞ্চয় করা অর্থ আগের মতো উপযোগী থাকে না। উদাহরণস্বরূপ, ১০ বছর আগে যে পরিমাণ টাকায় একটি পরিবার মাসিক খরচ চালাতে পারত, সেই একই টাকায় এখন একই পরিমাণ পণ্য কিনতে সক্ষম নয়।

বিশেষজ্ঞরা জানান, বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষদের প্রতিটি দিন শুরু হয় বেদনাদায়ক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে। যখন পেঁয়াজ, চিনি ও রান্নার তেলের মতো অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের দাম ক্রমশ বেড়ে যায় তখন কী বাদ দেওয়া যায়? তাদের কাছে মূল্যস্ফীতি শুধু অর্থনৈতিক ঘটনা নয়, এটা টিকে থাকার লড়াই।

রাজধানীর মানিকনগরের মুদি দোকানদার ইউসুফ মোল্লা জানান, তার দোকানে বিক্রি কমেছে। যারা এক সময় পাঁচ লিটার রান্নার তেল কিনতেন, এখন তারা নেন এক বা দুই লিটার। যারা দুই কেজি চিনি কিনতেন, তারা এখন কিনছেন এক কেজি। ক্রেতারা পেঁয়াজ কেনাও কমিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আগে যিনি এই দোকান থেকে দুই হাজার টাকার পণ্য কিনতেন, এখন তিনি হাজার টাকার নিচে পণ্য কিনছেন।’

এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেছেন, মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার কম হলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। এতে মানুষের কষ্ট বাড়ে। তিনি বলেন, এটি যারা চাকরিতে আছেন তাদের সমস্যা। কিন্তু যারা বেকার বা আয় নেই, তাদের কষ্ট আরও বেশি। সরকারও দিন দিন বাজেটের আকার বাড়াচ্ছে। কিন্তু সেই হারে রাজস্ব আয় বাড়াতে পারছে না। ফলে ঋণের বোঝা বাড়ছে। এতে সুদ বাবদ ব্যয় বাড়ছে। এ জন্য তিনি বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দেন। বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়বে, বাড়বে মানুষের আয়ও। তবে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে ঋণের সুদের হার কমাতে হবে। তা না হলে বিনিয়োগ বাড়বে না।

ইনস্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলাম বলেছেন, মূল্যস্ফীতির চেয়ে আয় বৃদ্ধির হার কমলে জীবনযাত্রার ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে যাদের কর্মসংস্থান নেই, তাদের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খেতে হয়।

জানা গেছে, মূল্যস্ফীতি এক ধরনের করের মতো। আপনার প্রতি মাসে আয়ের পুরোটাই সংসার চালাতে খরচ হয়ে যায়। কিন্তু হঠাৎ জিনিসপত্রের দাম বাড়লে এবং সে অনুযায়ী আপনার আয় না বাড়লে আপনাকে ধারদেনা করে সংসার চালাতে হবে কিংবা খাবার, কাপড়চোপড়, যাতায়াতসহ বিভিন্ন খাতে কাটছাঁট করতে হবে। মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধি বা আয় বৃদ্ধি কম হলে সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়ে। প্রকৃত আয় কমে যায়।

দুই-তিন বছর ধরে অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়। এনবিআরও তেল, আলু, পেঁয়াজ, ডিমসহ বেশকিছু নিত্যপণ্যে শুল্ক-কর কমিয়ে দেয়। বাজারে নিত্যপণ্যের আমদানিপ্রবাহ ঠিক রাখার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বাজারে ঊর্ধ্বগতি রয়েছে মূল্যস্ফীতির।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়