শিরোনাম
◈ আগামী এক মাসের মধ্যে রামিসা হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড নিশ্চিত করা হবে : প্রধানমন্ত্রী ◈ ‘উগ্রবাদীদের শিক্ষা দিতে’ কুরবানিতে গরু না দেওয়ার আহ্বান মাওলানা মোহাম্মদ জাফর পাশার (ভিডিও) ◈ অবশেষে কাটলো সম্প্রচার জট, ভারতে দেখা যাবে ফুটবল বিশ্বকাপ ◈ দেশের ভাগ্য পরিবর্তনে ৪০ কোটি হাতকে এক হতে হবে: প্রধানমন্ত্রী ◈ বাংলাদেশে নারী-শিশু নির্যাতন বেড়েছে, বিচারহীনতা বন্ধে জরুরি পদক্ষেপ চায় ইউনিসেফ ◈ কলকাতায় বাংলাদেশি তারকাদের কাজে আপত্তি টলিউডের টেকনিশিয়ানদের, যা বললেন রুদ্রনীল ◈ যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসী গ্যাবার্ড পদত্যাগ করলেন ◈ দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আজ থেকে ছুটি শুরু ◈ গ্রিন কার্ডে নতুন কড়াকড়ি: যুক্তরাষ্ট্রে বসে আর নয়, বিদেশিদের দেশে ফিরে আবেদন বাধ্যতামূলক! ◈ চার নতুন নিয়ম আস‌ছে বিশ্বকাপে, ম্যাচের চেহারা বদ‌লে যা‌বে!

প্রকাশিত : ১২ মে, ২০২৬, ১১:১২ দুপুর
আপডেট : ২২ মে, ২০২৬, ০৭:০০ সকাল

প্রতিবেদক : মহসিন কবির

বাড়ছে সহিংস হত্যাকাণ্ড, কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি 

মহসিন কবির: সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকাণ্ড সামাজিক মূল্যবোধকে নাড়া নিয়েছে। নিজের আপন লোকদের হাতে খুন আরো ভাবিয়ে তুলছে। কয়েকটি ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অন্তত ছয়টি কারণে দেশে সামাজিক অবক্ষয় হওয়ায় নৃশংসতা চরম আকার ধারণ করছে। এই অবক্ষয়ে মাদকের প্রভাব জড়িত। মাদকের টাকার যোগান দিতে গিয়ে অপরাধে জড়াচ্ছে মাদকসেবীরা। পারিবারিক কলহ ও পরকীয়ার কারণে সামাজিক মূল্যবোধ হারাচ্ছে মানুষ।

সামাজিক অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ হচ্ছে, মোবাইলে পর্নো ভিডিওর ছড়াছড়ি। এতে নৈতিকতার অধঃপতন ঘটছে দেশের তরুণ সমাজের। এই অবক্ষয়ের কারণ প্রতিবেশী দেশ ভারতের মুম্বাইয়ের সিনেমার চিত্রনাট্য ও যৌন সুড়সুড়ির ছবির প্রভাব। আরো রয়েছে পারিবারিক দ্বন্দ্ব-কলহকে উপজীব্য করে নির্মিত ভারতীয় মিডিয়ার বিভিন্ন সিরিয়াল, ওটিটি প্ল্যাটফর্মে নির্মিত বিভিন্ন ধরনের সিরিয়াল, মুভি ও শো।

এছাড়া অনলাইন জুয়ার ছড়াছড়ি এবং সাম্প্রতিক সময়ে ফেক আইডি তৈরি করে প্রতারণায় জড়িয়ে যাচ্ছে তরুণদের একটি অংশ। এতে সামাজিক মূল্যবোধ নষ্ট হচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, দেশে সামাজিক মূল্যবোধকে জাগ্রত করতে হবে। যেসব ঘটনা বা কাজ সমাজে অধঃপতন ডেকে আনছে, সেগুলো দূর করার কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বিচারের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপির) গত মার্চ মাসের ডাটা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত মার্চ মাসে শুধু ডিএমপিতেই খুন হয়েছে ২৪ জন। ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৫৬টি। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৫৫টি। অপহরণের ঘটনা ঘটেছে ২০টি। বিভিন্ন অপরাধের কারণে এক হাজার ৩০৫টি মামলা হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক অপরাধ ও অবক্ষয় বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম. শাহাদাত হোসাইন আমার দেশকে বলেন, ‘আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার যে কোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

জানা গেছে, গত ৭ মে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে তালাবদ্ধ ঘর থেকে বর্ষা আক্তার (২০) নামে এক গার্মেন্ট কর্মীর গলাকাটা লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। পারিবারিক কলহকে কেন্দ্র করে গত ৮ মে খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে কোদালের আঘাতে মাহিনুর আক্তার (২৪) নামে এক গৃহবধূকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় মাহিনুরের স্বামীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একই দিন চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় হাসান রাজু নামে এক যুবককে।

এ সময় চোখে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয় ১১ বছর বয়সি শিশু রেশমি। এখন সে হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। গত ৯ মে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় আন্দালিব সাদমান রাফি (৯) নামে এক শিশুকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়। পুলিশ জানায়, অনলাইনে জুয়ার টাকা নিয়ে শিশুটির বাবার সঙ্গে বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। পুলিশ অভিযুক্ত নূর মুহাম্মদ খোকনের বাড়ির স্যানেটারি ল্যাট্রিনের রিং স্ল্যাবের ভেতর থেকে বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করে।

৯ মে ঘটে আরো একটি মর্মান্তিক ঘটনা। গাজীপুরের কাপাসিয়ার রাউৎকোনা গ্রামে শারমিন আক্তার (৩০), তার তিন সন্তান মীম খানম (১৫), উম্মে হাবিবা (৮) ও ফারিয়া (২) এবং রসুল মিয়া (২২)সহ পাঁচজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, আর্থিক লেনদেন, পরকীয়া এবং পারিবারিক কলহের জেরে শারমিনের স্বামী ফোরকান মিয়া এ হত্যাকাণ্ড ঘটায়।

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের এপ্রিলে বিভিন্ন সহিংসতায় নিহত ২২ জন এবং পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ২৯৪ নারী ও শিশু। ওই মাসে ৯ নারী ও শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত দেশে প্রায় ৭৭০টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। অর্থাৎ গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ২৫০টি হত্যার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার পেছনে পরিকল্পিত হত্যা, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।

সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইন জুয়া বেড়ে গেছে। ধনীর দুলাল থেকে শুরু করে রিকশা চালক পর্যন্ত এই নেশায় এখন মত্ত। এতে মোটা অংকের টাকা বিদেশে যেমন পাচার হচ্ছে, পাশাপাশি সমাজে বড় ধরনের অবক্ষয় তৈরি হয়েছে। অনলাইনের জুয়ার টাকা যোগান দিতে কিশোরগ্যাং ছিনতাই ও অপহরণের মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে ফেসবুকে ভুয়া ফেক আইডি তৈরি করে বিভিন্ন অপরাধ ও সামাজিক অবক্ষয়ের ঘটনা ঘটছে। ফেক আইডি তৈরি করে ব্ল্যাকমেইল ও অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে চক্র। সাইবার অপরাধ ঠেকানো এখন বড় চ্যালেঞ্জের বিষয় পুলিশের।

জানা গেছে, রাত জেগে কিশোর ও তরুণরা মোবাইলে এক ধরনের আসক্তিতে পড়ছে। তারা বিভিন্ন গেম যেমন- পাবজি, ফোর্টনাইট, পোকেমন গো, মাইনক্র্যাফট, ক্র্যাশল্যান্ড, ইভোল্যান্ড ১ ও ২, ব্যাডল্যান্ড ব্রাউল এবং হোলডাউনসহ বিভিন্ন গেমে আসক্ত হয়ে পড়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। অনেকেই সারা রাত গেম খেলে সকালে উঠতে গড়িমসি করছে। শিশুরাও মোবাইলে আক্রমণাত্মক কার্টুনে মগ্ন হয়ে যাচ্ছে। বাবা-মা তাদের মোবাইল না দিলে খারাপ আচরণ করে শিশুরা।

সূত্র জানায়, সামাজিক অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ হিন্দি সিরিয়ালের প্রভাব। এসব সিরিয়ালে পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের বিষয়ে চিত্রনাট্য দেখে দেশের মানুষের মনোজগতে প্রভাব পড়ছে। এর কারণে দেশে বাড়ছে পরকীয়া।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ড. তৌহিদুল হক গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘দেশের সামাজিক মূল্যবোধের অভাব দেখা দিয়েছে। মাদকাসক্ত, অভাব-অনটন, দীর্ঘদিন কর্মহীন থাকা, অবৈধ যৌন অপরাধে তৃপ্তি, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক গড়ার বিষয়টি ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে। স্ত্রী-সন্তানকে হত্যা করে আরেকটি নতুন পরিবার গঠনের মতো জঘন্য কাজ করার মতো সামাজিক অপরাধ বাড়ছে।

তিনি আরো বলেন, এই অপরাধের বিচার হওয়া জরুরি। বিচারের শক্ত বার্তা না যাওয়ার কারণে এসব অপরাধ বাড়ছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি মানুষের মনকে অন্যভাবে প্রভাবিত করে। অপরাধী মনে করে যে, অপরাধ করলে পার পাওয়া যাবে।

জানতে চাইলে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক ডা. রশিদুল হক গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘সমাজে নেতিবাচক বিষয়গুলো দেখে বর্তমান প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা নেতিবাচক মানসিকতা নিয়ে বড় হচ্ছে। যখন তারা দেখছে, অটোপাসের জন্য তার সিনিয়র সহপাঠীরা আন্দোলন করছে, তখন সেও মনে মনে ভাবছে যে, লেখাপড়া করার আদৌ প্রয়োজন নেই। সেও কিছুদিন পর বড় আন্দোলনে যোগ দেবে এবং অটোপাস করবে।

তিনি আরো বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ফেসবুকে বিভিন্ন কুৎসা রটানো হচ্ছে, গুজব তৈরি করে মানুষের মনে ভীতি ছড়ানো হচ্ছে। গুজব ছড়ানোর আরেক প্রকার অর্থ রয়েছে। এটি মানুষের মনকে ভয় দেখানো। এটাও একটি সামাজিক অপরাধ। এই অপরাধ প্রবণতা থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রকে বের হয়ে আসতে হবে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়