এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি : বাগেরহাটের ঐতিহাসিক ও বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হজরত খানজাহান আলী (রহ.) মাজার শরীফের দিঘি থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে দীর্ঘদিনের পরিচিত সেই কুমিরটিকে। শিশু ফাতেমা আক্তারের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনার পর দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে জেলা প্রশাসনের জরুরি সিদ্ধান্তের আলোকে বুধবার (৩ জুন) দুপুরে বন বিভাগের একটি বিশেষজ্ঞ দল কুমিরটিকে উদ্ধার করে খুলনা বিভাগীয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্রে নিয়ে যায়।
এই কুমির অপসারণের মধ্য দিয়ে অবসান ঘটলো প্রায় সাড়ে ৬০০ বছরের এক ঐতিহ্যের, যা যুগ যুগ ধরে বাগেরহাটের খানজাহান আলী (রহ.) মাজারের ইতিহাস, লোকবিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে।
ফাতেমার মৃত্যুর পর প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ
গত রোববার (১ জুন) রাত সাড়ে ৮টার দিকে মাজার শরীফের দিঘির মহিলা ঘাটে গোসল করতে নেমে সাত বছর বয়সী শিশু ফাতেমা আক্তার কুমিরের আক্রমণের শিকার হয়। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবন্ধী ভবঘুরে মায়ের সঙ্গে মাজার এলাকায় বসবাসকারী ফাতেমার মরদেহ পরদিন সকালে দিঘি থেকে উদ্ধার করা হয়।
এর আগে গত ১০ এপ্রিল একই দিঘিতে কুমিরের আক্রমণে একটি কুকুর মারা যাওয়ার ঘটনাও আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। তবে শিশুর মৃত্যুর পর বিষয়টি দেশব্যাপী ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং কুমিরটিকে সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে জনমত জোরালো হয়ে ওঠে।
মঙ্গলবার রাতে জেলা প্রশাসনের জরুরি বৈঠকে কুমিরটিকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় এবং পরদিনই তা বাস্তবায়ন করে বন বিভাগ।
বিশেষজ্ঞ দলের অভিযানে ধরা পড়ে কুমির
বুধবার সকাল থেকে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিভাগের বিশেষজ্ঞ দল দিঘিতে অভিযান শুরু করে। কয়েক ঘণ্টার চেষ্টার পর দুপুর ১২টার দিকে দিঘির পূর্ব পাড় থেকে কুমিরটিকে সফলভাবে আটক করা হয়।
বাগেরহাট পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিভাগের বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় কুমিরটিকে নিরাপদে আটক করা হয়েছে। বর্তমানে এটি খুলনা বিভাগীয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। সেখানে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের পর প্রয়োজন হলে সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন ও পর্যটন কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হবে।
ইতিহাস, লোককথা ও বিশ্বাসের প্রতীক
খানজাহান আলী (রহ.) মাজারের দিঘির কুমির শুধু একটি প্রাণী নয়, এটি শতাব্দীজুড়ে একটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছিল।
ঐতিহাসিকদের মতে, প্রায় সাড়ে ৬০০ বছর আগে হজরত খানজাহান আলী (রহ.) দিঘি খননের পর এর মিঠা পানির পরিবেশ রক্ষার জন্য সেখানে এক জোড়া মিঠাপানির কুমির অবমুক্ত করেছিলেন। স্থানীয়ভাবে তাদের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘কালা পাহাড়’ ও ‘ধলা পাহাড়’। পরবর্তী সময়ে তাদের বংশধরদেরও একই নামে ডাকা হতো।
বছরের পর বছর ধরে এই কুমিরগুলোকে ঘিরে অসংখ্য লোককথা, ধর্মীয় বিশ্বাস ও কিংবদন্তির জন্ম হয়েছে। দেশ-বিদেশ থেকে আগত দর্শনার্থীরা মাজার জিয়ারতের পাশাপাশি কুমির দেখাকেও একটি বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে বিবেচনা করতেন।
বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার
মূল বংশধারার সর্বশেষ কুমিরটির মৃত্যু হয় ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে। পরে ঐতিহ্য রক্ষার লক্ষ্যে ২০০৫ সালে ভারত থেকে কয়েকটি মিঠাপানির কুমির এনে দিঘিতে ছাড়া হয়েছিল। সময়ের ব্যবধানে সেগুলোর অধিকাংশই মারা যায়।
সর্বশেষ দুটি কুমিরের একটি ২০২৩ সালের অক্টোবরে মারা যাওয়ার পর দিঘিতে মাত্র একটি কুমির অবশিষ্ট ছিল। সেই শেষ কুমিরটিকেও বুধবার সরিয়ে নেওয়া হওয়ায় আপাতত কুমিরশূন্য হয়ে পড়েছে খানজাহান আলী (রহ.) মাজারের ঐতিহাসিক দিঘি।
আবার ফিরবে কি কুমির?
বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মো. গোলাম মোহাম্মদ বাতেন জানিয়েছেন, এটি স্থায়ী অপসারণ নয়। মাজার দিঘির দুটি ঘাটে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা বেষ্টনী ও ফেন্সিং নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর কুমিরটিকে পুনরায় মাজার দিঘিতে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই ঐতিহ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে ইতিহাস ও জননিরাপত্তা—দুই বিষয়ই সমানভাবে রক্ষা করা সম্ভব হয়।
ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণ খানজাহান আলী (রহ.) মাজার দিঘির কুমির শুধু একটি বন্যপ্রাণী ছিল না; এটি ছিল শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাস, লোকবিশ্বাস ও ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতীক। ফাতেমার করুণ মৃত্যুর পর জননিরাপত্তার স্বার্থে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত যেমন সময়ের দাবি, তেমনি কুমিরটির বিদায় বাগেরহাটের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এক আবেগঘন অধ্যায়েরও সমাপ্তি।
তবে প্রশাসনের আশ্বাস অনুযায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পন্ন হলে হয়তো আবারও ঐতিহ্যের সেই জীবন্ত প্রতীক ফিরে আসবে খানজাহান আলী (রহ.) মাজারের ঐতিহাসিক দিঘিতে।