বিবিসি বাংলা: গবেষকরা বলছেন, যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যাওয়ার প্রবণতা এখন বেশ সাধারণ হয়ে উঠেছে। ফলে অনেকেই চিকিৎসায় টেস্টোস্টেরনের দ্বারস্থ হচ্ছেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে-যৌন আকাঙক্ষা বাড়াতে টেস্টোস্টেরন কি সত্যিই কার্যকর, নাকি এটি অতিরঞ্জিত প্রচারণা?
নব্বইয়ের দশকে অ্যালান রিভস নিয়মিত মঞ্চে পারফর্ম করতেন। দ্য ড্রিমবয়েজের সদস্য হিসেবে হাজার হাজার দর্শকের সামনে নিজেকে তুলে ধরতেন। তার জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। এমনকি স্পাইস গার্লসের চলচ্চিত্র স্পাইস ওয়ার্ল্ড-এও দেখা যায় তাকে।
তখন তার বয়স ছিল ২৪ বছর। দেখতে আকর্ষণীয় ছিলেন, এমনটা তিনি নিজেই বলেছেন। কিন্তু ত্রিশে পা দিতেই তার জীবন বদলে যেতে শুরু করে। মন খারাপ থাকত তার। যৌন আকাঙক্ষা প্রায় ফুরিয়ে গেলো। তিনি বলেন, "আমি ঠিক নিজের মতো অনুভব করছিলাম না।"
এখন রিভসের বয়স ৫২ বছর। তিনি বলেন, সে সময়ে (৩০ বছর বয়সী থাকাকালে) যৌন আকাঙক্ষা একেবারে কমে যাওয়ার প্রভাব তার দীর্ঘদিনের সম্পর্কে পড়েছিল।
"একটা সময়ে তিন থেকে চার মাস পর্যন্ত যৌন সম্পর্ক হতো না। কারণ আমি আগ্রহ পেতাম না।" তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতি অনেক সম্পর্ক ভেঙে দিতে পারে। রিভস বর্তমানে লন্ডনভিত্তিক ফিটনেস ও লাইফস্টাইলের একজন কোচ।
যৌন আকাঙক্ষা ফুরিয়ে যাওয়ার পর তিনি টেস্টোস্টেরন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি বা টিআরটি শুরু করেন। তার দাবি, এতে তার লিবিডো ফিরে এসেছে। বৃদ্ধ বোধ করা থেকে আবার ২০ বছর বয়সী তরুণের মতো লাগছে নিজেকে। বিষয়টি অসাধারণ মনে হয় তার।
নারীরাও টেস্টোস্টেরনের দিকে ঝুঁকছেন। মেনোপজবিষয়ক ব্লগার ৩৭ বছর বয়সী র্যাচেল মেসন বলেন, এই হরমোন তার শক্তি, মনোযোগ এবং যৌন আকাঙক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। যুক্তরাজ্যে টেস্টোস্টেরন প্রেসক্রিপশনের হার দ্রুত বেড়েছে।
সরকারি অর্থে পরিচালিত যুক্তরাজ্যের হেলথকেয়ার ব্যবস্থা - ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের (এনএইচএস) বিজনেস অথোরিটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এ জাতীয় চিকিৎসা দেওয়ার হার বেড়েছে ১৩৫ শতাংশ।
স্বাস্থ্য সংক্রান্ত যুক্তরাজ্যের স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা-কেয়ার কোয়ালিটি কমিশন এই তথ্যগুলো সংগ্রহ করে তুলে ধরেছে। এই প্রবণতা এমন এক সময়ে দেখা যাচ্ছে, যখন যুক্তরাজ্যে সামগ্রিকভাবে যৌন সম্পর্কের হার কমছে।
ন্যাশনাল সার্ভে অব সেক্সুয়াল অ্যাটিটিউডস অ্যান্ড লাইফস্টাইলস (ন্যাটসাল)-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি দশকে ১০ হাজারের বেশি মানুষকে তাদের জীবনযাপন সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়। সেই গবেষণার ফলাফল এই বছরের শেষে প্রকাশিত হবে। এই জরিপ থেকে আভাস পাওয়া যাচ্ছে, যৌন সম্পর্কের হার ধীরে ধীরে কমছে।
১৯৯০ সালে ১৬ থেকে ৪৪ বছর বয়সীরা গড়ে মাসে পাঁচবার যৌন সম্পর্ক করতেন। ২০০০ সালে তা নেমে আসে চারবারে, আর ২০১০ সালে কমে তা হয় তিনবারে।
গবেষকদের ধারণা, এই বছরের শেষে প্রকাশিত নতুন ফলাফলেও এটি কমতে থাকার ধারা অব্যাহত থাকবে। তবে যৌনতায় আগ্রহ কমার পেছনে তারা নির্দিষ্ট কোনো একটি কারণকে চিহ্নিত করেননি।
এমন প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে-যৌন আকাঙক্ষা বাড়াতে টেস্টোস্টেরন কি সত্যিই কার্যকর, নাকি এটি অতিরঞ্জিত প্রচারণা?
অর্থাৎ, টেস্টোস্টেরন বাড়াতে ওষুধ দেওয়ার মধ্য দিয়ে কিছু লোকের মুনাফা কামিয়ে নেওয়া এবং শারীরিকভাবে উপকার নয়, বরং রোগীর মন ভালো রাখাই কৌশল কি?
যৌন আকাঙক্ষা কমছে
গবেষকরা বলছেন, যৌন আকাঙক্ষা কমে যাওয়ার প্রবণতা এখন বেশ সাধারণ হয়ে উঠেছে। অ্যালান রিভসের যৌন আকাঙক্ষা কমে যাওয়ার অভিজ্ঞতা শুধু একটি উদাহরণ মাত্র।
ন্যাটসালের একাডেমিক পরিচালক সোয়াজিগ ক্লিফটন বলেন, "বছরের পর বছর ধরে আমরা লক্ষ্য করেছি, সব বয়সী ও শ্রেণির মানুষের মধ্যেই যৌন আকাঙক্ষা কমছে।"
"যৌন আকাঙক্ষা কমার কারণ বোঝাতে উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, নব্বইয়ের দশকের তুলনায় এখন একসঙ্গে বসবাসকারী দম্পতির সংখ্যা কম। তবে দাম্পত্য সম্পকের্র দিকে খেয়াল করলেও যৌন সম্পর্ক কমার প্রবণতাই আমরা দেখি।"
আসলে, যৌন ক্রিয়াকলাপের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি কমেছে বেশি বয়সী, বিবাহিত বা একসঙ্গে বসবাসকারী দম্পতিদের মধ্যে। ক্লিফটন বলেন, যৌন আকাঙক্ষা কেনো কমছে তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।
তিনি বলেন, "আমরা একটি জনগোষ্ঠী হিসেবে আগের তুলনায় কম যৌন সম্পর্ক কেন করছি তা এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে যে তথ্য আছে, সেগুলোর কোনোটিই নিশ্চিতভাবে কোনো কারণকে দায়ী করতে পারে না।"
এমনটা হওয়ার কারণ বোঝা ও খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে কয়েকটি গবেষণায়। এই গবেষণাগুলো বলছে, যৌন সম্পর্কে অনীহার পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে ডিজিটাল বিশ্ব। কারণ ডিজিটাল বিশ্ব থেকে মানুষের 'সুইচ অফ' করা কঠিন এবং এটি বিকল্প কার্যকলাপের আরও সুযোগ দেয়।
জেনারেল প্র্যাকটিশনার (জিপি) ও যৌন থেরাপিস্ট ডা. বেন ডেভিস বলেন, মানুষ এখন ৩০ বছর আগের তুলনায় বেশি মানসিক চাপে থাকে। এটি একটি কারণ হতে পারে।
তিনি বলেন, "মানুষের জীবনে এতো কিছু ঘটছে। স্পষ্টতই প্রযুক্তি বড় একটি কারণ, তবে এটির পাশাপাশি মানসিক চাপ, হতাশা ও একাকীত্ব বেড়েছে। এসব কিছু যৌন আকাঙক্ষা কমাতে প্রভাব ফেলে।"
এই জটিলতার মধ্যেও এখন টিউব স্টেশন, বাস স্টপ ও সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা বিজ্ঞাপন দেখা যাচ্ছে-"কম লিবিডো? অর্থাৎ যৌন আকাঙক্ষা কমে গেছে? ব্রেন ফগ? ক্লান্ত? টেস্টোস্টেরন পরীক্ষা করানোর সময় এসেছে! আপনার স্বামীর আগ্রহ হারিয়ে গেছে? এটি তার হরমোনের কারণে হতে পারে!"
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কম যৌন আকাঙক্ষার জন্য টেস্টোস্টেরন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (টিআরটি) কি সত্যিই সব সমস্যার সমাধান দিতে পারে?
টেস্টোস্টেরনের কম মাত্রা পুরুষদের যৌন আগ্রহে প্রভাব ফেলতে পারে-এই বিষয়টি অনলাইনে ব্যাপক আগ্রহ উদ্দীপক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সেই সাথে বড় ধরনের ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও পরিণত হয়েছে।
ব্রিটিশ সোসাইটি অব সেক্সচুয়াল মেডিসিনের (বিএসএসএম) সদস্য ও কনসালট্যান্ট ইউরোলজিস্ট অধ্যাপক জেফরি হাকেট বলেন, "পুরুষদের টেস্টোস্টেরনের মাত্রা নিশ্চিতভাবেই কমছে।"
"টেস্টোস্টেরন মাত্রা কমার পেছনে স্থূলতা, টাইপ-টু ডায়াবেটিস এবং অলস জীবনযাপন বড় কারণ। আর যৌন আকাঙক্ষা কমে যাওয়ার পেছনেও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে কাজ করে থাকে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে যাওয়া।"
গত ২০ বছরে একাধিক বৃহৎ পরিসরের গবেষণায় পুরুষদের টেস্টোস্টেরনের মাত্রা পরিমাপ করা হয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে এই মাত্রা কমেছে। তবে হাকেট জোর দিয়ে বলেন, বিষয়টি এতোটা সরল নয়।
টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কম থাকলে যৌন আগ্রহ কম হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে ঠিকই, কিন্তু তার মানে এই নয় যে যাদের টেস্টোস্টেরন কম, তাদের সবারই যৌন আকাঙক্ষা কম হবে। হাকেট সতর্ক করে বলেন, কম টেস্টোস্টেরন থাকলেই যে সবার যৌন আকাঙক্ষা কমবে, এমন নয়।
টেস্টোস্টেরন 'আমাকে আমার জীবন ফিরিয়ে দিয়েছে'
মেলিসা গ্রিন প্রায় এক বছর ধরে টেস্টোস্টেরন নিচ্ছেন। তার যৌন আকাঙক্ষা কম থাকার কারণে স্বামীর সঙ্গে বেশ সমস্যা হচ্ছিলো। ৪৩ বছর বয়সী এই নারী বলেন, এটি কেবল তাঁর অদম্য প্রাণশক্তি ও উদ্দীপনা ফিরিয়ে দেয়নি, এটি তার বৈবাহিক সম্পর্ক বাঁচিয়েছে।
মেলিসা গ্রিন পেরিমেনোপজে (যেমন-অনিয়মিত পিরিয়ড, মেজাজ পরিবর্তন ইত্যাদি) ছিলেন। মেলিসার জেনারেল প্র্যাকটিশনার (জিপি) হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপির অধীনে প্রথমে তাকে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন দিলেও টেস্টোস্টেরনের মাত্রা পরীক্ষা করে দেখেননি। তাকে বলা হয়েছিলো- অতিরিক্ত হরমোনের প্রয়োজন নেই তার।
মেলিসা গ্রিন পরে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে যান এবং রক্ত পরীক্ষা করান। তাঁকে জানানো হয় যে তার হরমোনের মাত্রা কম। সেই পরীক্ষার ফল তিনি তাঁর জিপির কাছে নিয়ে গেলে এনএইচএস-এর মাধ্যমে কিছু টেস্টোস্টেরন পেতে শুরু করেন। পাশাপাশি একটি বেসরকারি প্রেসক্রিপশনের মাধ্যমে অল্প মাত্রায় অতিরিক্ত ডোজও নিচ্ছেন তিনি।
তিনি বলেন, "এটা যেন আমাকে আমার জীবনটা ফিরিয়ে দিয়েছে। কিছু দিক থেকে মনে হচ্ছে আমি আবার কুড়ির কোঠায় ফিরে গেছি।" "আমার প্রাণশক্তি বেড়েছে, মাথা অনেক বেশি পরিষ্কার লাগে, আর আমার যৌন আকাঙক্ষাও ফিরে এসেছে।"
টেস্টোস্টেরন লিবিডোর ওপর যে বিশাল প্রভাব ফেলে সে বিষয়ে খুবই প্রশংসাসূচকভাবে কথা বলেন কিছু মানুষ। তবে অন্যদের অভিজ্ঞতা ততোটা ইতিবাচক নয়। শেরল ও'মালি এক বছর ধরে টেস্টোস্টেরন নিয়েছিলেন।
তাঁর ভাষায়, এটি মেনোপজের সময় হারিয়ে যাওয়া কিছুটা শক্তি ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হলেও, একই সঙ্গে এটি তার যৌন আকাঙক্ষা অতিরিক্ত মাত্রায় বাড়িয়ে দেয় এবং তীব্র রাগ বা ক্ষোভের অনুভূতি তৈরি করে।
"আমি সত্যিই ভীষণভাবে যৌন উত্তেজনা অনুভব করতাম। আমি আমার স্বামীর সঙ্গে যৌনসম্পর্ক করতে চাইতাম, কিন্তু একই সাথে তাকে ঘৃণাও করতাম।" "তখনই বুঝেছিলাম, এটা ভালো কোনো অবস্থান নয়। আমি তো এমন ছিলাম না। নিজেকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে মনে হচ্ছিলো।"
রেচল ম্যাসন বলেন, তিনি যখন টেস্টোস্টেরন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (টিআরটি) নিয়ে সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করেন, তখন দেখেন "অনেক নারীই টেস্টোস্টেরন শুরু করতে ভীষণ ভয় পান।
তারা আশঙ্কা করেন, এতে তারা পুরুষালি হয়ে যাবেন, মুখে দাড়ি-গোঁফ গজাবে, বা তারা নিজেদের স্বাভাবিক অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলবেন।" রেচল ম্যাসন বলেন, তার কবজির একটি অংশে লোম তুলনামূলকভাবে বেশি গজিয়েছে। তিনি প্রতিদিন যেখানে টেস্টোস্টেরন জেল লাগান সেখানে।
তবে তার মতে, এই হরমোন থেকে যে উপকার তিনি পাচ্ছেন, তার তুলনায় এই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া গ্রহণযোগ্য। শরীরে লোম বাড়ার পাশাপাশি, টিআরটির আরও নানা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে।
নারীদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সাধারণ প্রভাবগুলো হলো অতিরিক্ত লোম গজানো, ব্রণ এবং ওজন বাড়া- যেগুলো সাধারণত ডোজ কমালে বা চিকিৎসা বন্ধ করলে আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়। টেস্টোস্টেরন রিপ্লেসমেন্টে চুল পড়ে যাওয়া (অ্যালোপেশিয়া) এবং কণ্ঠস্বর ভারী হয়ে যাওয়া তুলনামূলকভাবে বিরল।
পুরুষদের ক্ষেত্রে এতে টাক পড়া, ওজন বৃদ্ধি এবং মেজাজের হঠাৎ পরিবর্তনের মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে আরও হতে পারে ব্যথাযুক্ত ইরেকশন এবং কারণ ছাড়াই অতিরিক্ত দীর্ঘস্থায়ী ইরেকশন।
এ ছাড়া পুরুষদের এটি শুক্রাণু উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে, যার ফলে প্রজননক্ষমতার ওপর প্রভাব পড়তে পারে। এসব ক্ষেত্রে সহায়ক চিকিৎসা রয়েছে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই উত্তম।
"এটি একটি লাভজনক ব্যবসা"
এনএইচএসের কয়েকজন জিপি এবং সেকেন্ডারি কেয়ার কনসালট্যান্ট বিবিসিকে বলেছেন যে প্রাইভেট ক্লিনিকগুলো জটিল সমস্যার দ্রুত সমাধান হিসেবে টেস্টোস্টেরন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (টিআরটি) বিক্রি করে লাভবান হচ্ছে।
যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক এনএইচএসের কনসালট্যান্ট পাউলা ব্রিগস বলেন, এটা একটি "লাভজনক ব্যবসা" যেখানে মানুষ এমন কিছু জিনিসের জন্য অনেক অর্থ দেয় যা তাদের প্রয়োজন নেই।
তিনি বলেন, "এটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ওয়েলবিয়িং ইন্ডাস্ট্রি বাজারে এমন একটি ফাঁক তৈরি করেছে যা তারা নিজেদের সুবিধার জন্য ব্যবহার করছে। এটা নিঃসন্দেহে মানুষকে বঞ্চনা করা।"
তবে প্রাইভেট ক্লিনিকগুলো দাবি করছে, তারা এমন একটি পরিষেবা দিচ্ছে যা এনএইচএস দিতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং এর মাধ্যমে মানুষের জীবন উন্নত করছে।
জেফ ফোস্টার এনএইচএসের জিপি এবং তিনি "ভয়" নামের পুরুষদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিশেষায়িত ক্লিনিকের মেডিকেল ডিরেক্টর। মাল্টিমিলিয়ন পাউন্ডের ক্লিনিকটির এই মেডিকেল ডিরেক্টর বলেন, সরকারি সেবাখাতের ফাঁকগুলো পূরণ করছে প্রাইভেট সেক্টর।
তিনি বলেন, "হাজার হাজার পুরুষ যাদের কম টেস্টোস্টেরন থাকতে পারে, তাদের শনাক্ত বা চিকিৎসার জন্য বর্তমানে এনএইচএস সঠিকভাবে প্রস্তুত নয়।"
মাইকেল কোকসিস ২০১৬ সাল থেকে তার কোম্পানি ব্যালান্স মাই হরমোনস-এর মাধ্যমে মানুষকে টিআরটি দিচ্ছেন। তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে এই চিকিৎসার চাহিদা "অকল্পনীয়ভাবে" বেড়েছে।
কোকসিস বলেন, তার কিছু রোগী পরীক্ষা করাতে এনএইচএসে গিয়েছিলেন এবং সে সময় বলা হয়েছে তাদের টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কম নয়। তাই তারা প্রাইভেট ক্লিনিকে চিকিৎসা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
তিনি বলেন, "এনএইচএসের পরীক্ষায় টেস্টোস্টেরনের মাত্রা যতটা থাকলে কম হিসেবে গণ্য করা হয়, সেটির চেয়ে বেশি ছিলো ওই রোগীদের।
এর মানে এই নয় যে টিআরটি দিয়ে তারা উপকৃত হতে পারবেন না। বিষয়টি হ্যাঁ/না-এর মতো বাইনারিতে ফেলে দেওয়া সম্ভব নয়। এটি আরও সূক্ষ্ম ও জটিল বিষয়।"
পুরুষদের ক্ষেত্রে, টেস্টোস্টেরনের মাত্রা ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সের পর ১% হারে, অর্থাৎ একটু একটু করে কমতে শুরু করে। এনএইচএস-এর পরামর্শ অনুযায়ী, এটি বয়সজনিত স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ এবং সাধারণত লিবিডোতে কোনো প্রভাব ফেলে না।
অ্যালান রিভস প্রথমে এনএইচএস-এর মাধ্যমে টিআরটি পেয়েছিলেন। দুইটি পরীক্ষায় তার মাত্রা ছিল ১০ ন্যানোমোল/লিটার এবং ১২ ন্যানোমোল/লিটার। তিন সপ্তাহের ব্যবধান দিয়ে তাকে চারটি ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু চতুর্থ ইনজেকশনের পর বিশদ ব্যাখ্যা ছাড়াই তাকে বলা হয়, চিকিৎসা আর চালানো যাবে না। তিনি বলেন, আগের প্রচেষ্টা পুরোপুরি ব্যর্থ হওয়ায় একেবারে শুরুর থেকে ফের ভাবতে এবং উদ্যোগ নিতে হয় তাকে। সেজন্যই বেসরকারি সেবা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
পুরুষদের জন্য স্বাস্থ্যকর টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কত? এটি নির্ভর করে কোন সংস্থা বা কোন গবেষণা অনুসরণ করছেন কোনো ব্যক্তি।
ব্রিটিশ সোসাইটি অব সেক্সচুয়াল মেডিসিনের (বিএসএসএম) গাইডলাইন অনুযায়ী, যাদের টেস্টোস্টেরনের মাত্রা ১২ ন্যানোমোল/লিটার এর কম, তাদের টিআরটি বিবেচনা করা উচিত এবং তাদের হাইপোগোনাডিজমের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এটি এমন একটি অবস্থা যখন শুক্রাশয় পর্যাপ্ত পরিমাণে সেক্স হরমোন তৈরি করতে পারে না।
এনএইচএস-এর নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, যার টেস্টোস্টেরনের মাত্রা মাত্রা ৬ থেকে ৮ ন্যানোমোল/লিটার এর কম, তার টেস্টোস্টেরন অভাব থাকতে পারে। (যদিও এটি বলে রাখা ভালো যে এনএইচএসের প্রতি আস্থা সবার সমান না।)
নারীদের ক্ষেত্রে, টেস্টোস্টেরনের মাত্রা ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সের মধ্যে কমতে শুরু করে এবং মেনোপজে পৌঁছালে এটি স্থিতিশীল হয়। টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমাটা স্বাভাবিক। তবে প্রশ্ন হলো- এই হ্রাস পাওয়া যৌন আকাঙক্ষা ও সামগ্রিক সুস্থতায় কতটা প্রভাব ফেলে?
নারীদের জন্য কয়েকটি পরীক্ষা করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু পরীক্ষায় সঠিক মাত্রা পাওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ নারীদের জন্য টেস্টোস্টেরন গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটির প্রয়োজনীয় পরিমাণ, অর্থাৎ যতটুকু থাকা দরকার সেটি আসলে বেশ কম।
কাজেই এটির জন্য প্রেসক্রিপশন দেওয়া হলেও "অফ-লেবেল" হিসেবে দিতে হয়। কারণ বর্তমানে এনএইচএস-এ নারীদের জন্য লাইসেন্সকৃত এ সংক্রান্ত কোনো চিকিৎসা নেই।
টিআরটি নিয়ে যে অতিরিক্ত উন্মাদনা হচ্ছে সেটি নিয়ে ব্রিগস বেশ সতর্ক। তিনি বলেন, অনেক রোগী এসে বলেন যে তাদের টেস্টোস্টেরন প্রয়োজন। কারণ তারা যৌন সম্পর্কে একেবারেই আগ্রহ পান না।
ব্রিগস আরো বলেন, চিকিৎসা নিতে আগ্রহীরা এ সংক্রান্ত প্রাথমিক পড়াশোনা করে এসেছেন, এমনটাই দাবি করেন। প্রায়শই এর মানে দাঁড়ায় যে তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো সেলিব্রিটির জীবনে হরমোনের প্রভাব দেখেছেন।
"সেলিব্রিটির জন্য এটি কাজ করেছে, এর মানে এটি সাধারণ মানুষের জন্যও কাজ করবে- তেমনটা কিন্তু নয়।"
তিনি বলেন, তার স্থানীয় এলাকা চেশায়ার অ্যান্ড মার্সিসাইডে জিপিরা টেস্টোস্টেরন পরীক্ষা করাতে চাওয়া রোগীদের ভিড়ে হিমশিম খান। অনেকেই টিআরটি প্রেসক্রিপশন নিয়ে চলে যান, কিন্তু কয়েক মাস পরে ফিরে এসে বলেন যে এর প্রভাব পরেছে খুব কম।
তিনি বলেন, এটি কিছু মানুষকে সাহায্য করলেও যারা মনে করেন যে তাদের টেস্টোস্টেরন প্রয়োজন এবং যারা সত্যিই এটি থেকে উপকার পাবেন- তাদের অনুপাত খুবই কম।
এখন পর্যন্ত চিকিৎসাভিত্তিক প্রমাণগুলো বলছে, নারীদের ক্ষেত্রে টিআরটি শুধুমাত্র পোস্টমেনোপজাল এবং কম লিবিডোর ক্ষেত্রে কার্যকর।
উল্লেখ্য, পোস্টমেনোপজাল হলো নারীদের জীবনের সেই পর্যায়, যা মাসিক বা পিরিয়ড স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ার পর শুরু হয়।
ব্রিগস বলেন, প্রাইভেট ক্লিনিকের বিজ্ঞাপন সবকিছুকে অতিরিক্ত প্রভাবিত করেছে। "যখন টিআরটির প্রয়োজন তখন আমি এর বিরোধী নই, তবে আমি এটির অতিমাত্রায় প্রচারের বিরোধী।"
বেন ডেভিস বলেন, টিআরটিতে শারীরিক উন্নতি না হলেও মানসিক অবস্থার উন্নতি হতে পারে, যার ফলে রোগীরা কখনও কখনও প্রয়োজন নেই এমন ওষুধও ব্যক্তিগতভাবে কেনেন ও গ্রহণ করেন।
শেরল ও'মালি এখন টেস্টোস্টেরন নেওয়া বন্ধ করেছেন। তিনি বলেন, চিকিৎসার সময় যে তীব্র রাগ এবং যৌন উত্তেজনা অনুভব করতেন তা কমেছে এবং তার লিবিডো স্বাভাবিক মাত্রায় ফিরে এসেছে। তিনি বলেন, "আমি টেস্টোস্টেরন নেওয়া বন্ধ করে দিয়ে খুব প্রশান্তি অনুভব করছি।"
"এটি কোনো জাদুকরী সমাধান নয়"
ডেভিস বলেন, "কিছু মানুষের জন্য ওষুধ সত্যিই পরিবর্তন আনতে পারে।" তবে তিনি যোগ করেন, এটি কেবল ওষুধ দেওয়ার বিষয় নয়।
"রোগীর যৌন আকাঙক্ষা কম থাকার পেছনে কী কারণ থাকতে পারে, সেটা কী সঙ্গীর সাথে সম্পর্কে সমস্যা, আত্ম-দর্শন সম্পর্কৃত কিছু, কিংবা চলমান যৌন অভিজ্ঞতা কি যথেষ্ট উত্তেজিত করছে না- সেসব নিয়ে আলোচনা করার সময় জেনারেল প্র্যাকটিশনারদের হয়তো নেই।"
তিনি বলেন, কম লিবিডোর অনেক কারণ থাকতে পারে এবং টেস্টোস্টেরন একমাত্র সমাধান নয়। অ্যালান রিভস সাত বছর ধরে টিআরটি নিচ্ছেন। তিনি প্রাইভেট ক্লিনিক-ব্যালান্স মাই হরমোনস থেকে টেস্টোস্টেরন পাচ্ছেন । তিনি বলেন, তার জীবন নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে।
"আমার যৌন উত্তেজনা ফিরে এসেছে, প্রথম দিকে এতো বেশি সেটি হয়েছিল যে টানা দশ রাত ধরে প্রতিরাতেই সেক্স করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এখন পরিস্থিতি এমনটা নেই। আমি শান্ত হয়েছি এবং ভালো অবস্থায় আছি।"
তবুও রিভস মনে করেন, "এটি কোনো জাদুকরী সমাধান নয়" এবং জীবনধারায় অন্যান্য পরিবর্তন ছাড়া শুধু টেস্টোস্টেরন নেওয়ার কোনো মানে নেই।
তিনি বলেন, জীবনধারায় অন্যান্য পরিবর্তন না আনলে এটি "একটি ফেরারি ইঞ্জিনকে নষ্ট গাড়িতে বসানোর মতো।" "আমি এখন আরও দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে হেঁটে চলি। এটা আংশিক টেস্টোস্টেরনের কারণে হয়েছে, আর আংশিক হয়েছে আমার নিজের জন্য।"