এম মাছুম বিল্লাহ: বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। অথচ বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে দেশের অবদান অত্যন্ত সামান্য। বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলোর দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে ত্বরান্বিত করেছে। এর ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়ের মতো নানা দুর্যোগের মুখোমুখি হচ্ছে বাংলাদেশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, অর্থায়ন ও সক্ষমতার দিক থেকে পিছিয়ে রয়েছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এসব দেশে তুলনামূলকভাবে বেশি এবং দীর্ঘমেয়াদি।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের মাত্র প্রায় ০.৪ শতাংশেরও কম অবদান রাখলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অন্যতম। ভৌগোলিক অবস্থান, ঘনবসতি, দারিদ্র্য এবং সীমিত অভিযোজন সক্ষমতা বাংলাদেশের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণ
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রধান কারণ হলো বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্রা বৃদ্ধি। শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, যানবাহন, বন উজাড় এবং জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂), মিথেন (CH₄) ও নাইট্রাস অক্সাইড (N₂O) বায়ুমণ্ডলে জমা হচ্ছে। এসব গ্যাস সূর্যের তাপকে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে আটকে রাখে, যার ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
অতীতে ক্লোরোফ্লুরোকার্বন (CFC) গ্যাস ওজোন স্তরের ক্ষয়ের অন্যতম কারণ ছিল। তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মূল চালিকাশক্তি হলো গ্রিনহাউস গ্যাসের বৃদ্ধি, আর ওজোন স্তর ক্ষয় ও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন দুটি পৃথক হলেও পরস্পর সম্পর্কিত পরিবেশগত সমস্যা।
বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান প্রভাব
১. সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি
বাংলাদেশ বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপগুলোর একটি। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে খুব সামান্য উঁচু হওয়ায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য বড় হুমকি।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেতে পারে। এর ফলে উপকূলীয় এলাকার বিস্তীর্ণ ভূমি প্লাবিত হওয়া, নদীভাঙন বৃদ্ধি এবং লাখো মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
২. লবণাক্ততা বৃদ্ধি
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং নদীর প্রবাহ কমে যাওয়ায় উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ত পানি ক্রমেই অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে। এতে কৃষিজমি, পুকুর, নদী এবং ভূগর্ভস্থ পানির লবণাক্ততা বাড়ছে।
এর ফলে কৃষি উৎপাদন কমছে, নিরাপদ পানির সংকট দেখা দিচ্ছে এবং জনস্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
৩. জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে রয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততার কারণে বনাঞ্চলের বাস্তুতন্ত্র পরিবর্তিত হচ্ছে।
সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবাসস্থল হুমকির মুখে পড়বে।
৪. আকস্মিক বন্যা
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে হাওরাঞ্চল, প্রায় প্রতি বছর আকস্মিক বন্যার শিকার হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়ছে, ফলে ফসল ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।
৫. খরা
বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি বৃষ্টির ঘাটতি এবং উচ্চ তাপমাত্রার কারণে খরার প্রকোপ বাড়ছে। এতে কৃষি উৎপাদন কমে যাচ্ছে এবং খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
৬. নদীর প্রবাহ পরিবর্তন
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তিত হওয়ায় অনেক নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানি কমে যাওয়ায় সেচ, নৌপরিবহন ও মৎস্যসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
৭. ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস
বঙ্গোপসাগরের উষ্ণতা বৃদ্ধি ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বাড়িয়ে তুলতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল প্রায় প্রতিবছরই ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এসব দুর্যোগ আরও শক্তিশালী ও ঘন ঘন ঘটতে পারে।
কী করা যেতে পারে?
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়েও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।
প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে—
জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়; এটি বাংলাদেশের জন্য বর্তমান বাস্তবতা। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় ইতোমধ্যেই দেশের অর্থনীতি, কৃষি, স্বাস্থ্য ও মানুষের জীবিকায় গভীর প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশ বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য সামান্য দায়ী হলেও এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগীদের অন্যতম। তাই একদিকে যেমন উন্নত দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণ কমানো ও জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন জরুরি, অন্যদিকে বাংলাদেশকেও অভিযোজন ও সহনশীল উন্নয়ন কৌশল আরও শক্তিশালী করতে হবে। সরকার, বেসরকারি খাত এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগই পারে জলবায়ু পরিবর্তনের এই ক্রমবর্ধমান সংকট মোকাবেলায় দেশের সক্ষমতা বাড়াতে।