বণিক বার্তা প্রতিবেদন: আফ্রিকার দ্বীপরাষ্ট্র মাদাগাস্কারের একটি বিশেষ প্রাণী রিংটেইলড লেমুর। দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করতে ২০১৮ সালে বিরল প্রজাতির দুটি রিংটেইলড দেশে আমদানি করা হয়। রাখা হয় গাজীপুর সাফারি পার্কে। পরবর্তী সময়ে প্রাণীগুলো বংশবিস্তার করে। তবে গত বছরের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির সুযোগে গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকে তিনটি রিংটেইলড লেমুর চুরি হয়ে যায়।
শুধু রিংটেইলড লেমুরই নয়, নিরাপত্তা দুর্বলতায় চুরি হয়ে যাচ্ছে বিরল প্রজাতির নীলগাই, কচ্ছপ-পাখিও। বিরল প্রজাতির এসব প্রাণী দেশ থেকে চুরি হওয়ার পর ভারতের শিলিগুড়ি-জলপাইগুড়ি হয়ে যাচ্ছে চীন, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায়। জীবিত প্রাণীর পাশাপাশি কচ্ছপের হাড়ও পাচার হচ্ছে। গত তিন বছরে শুধু পাচারের সময়ই সীমান্ত থেকে উদ্ধার হয়েছে ২৯৭ কেজি কচ্ছপের হাড়। প্রাণী পাচারের রুট হিসেবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হচ্ছে মেহেরপুর, হিলি, শিবগঞ্জ, বুড়িমারী সীমান্ত।
বন্যপ্রাণী চুরি ও পাচার রোধে কাজ করে বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট। তাদের হিসাবে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪ হাজার ৪৪টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে গত জানুয়ারিতে ৪৫৮টি, ফেব্রুয়ারিতে ১ হাজার ৪৪, মার্চে ১২১, এপ্রিলে ১৪৩, মে মাসে ২৭৭, জুনে ১৬৭, জুলাইয়ে ৯৭৮, আগস্টে ৮৫৬ ও সেপ্টেম্বরে ২ হাজার ১১১টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া প্রাণীগুলোর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির কচ্ছপ, গন্ধগোকুল, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, বিভিন্ন প্রজাতির সাপ, বানর, তক্ষক, লেমুর, হাতি, ভালুক, হনুমানসহ নানা ধরনের বন্যপ্রাণী। এসব বন্যপ্রাণীর দেশ থেকে চুরি হওয়ার পর সেটি প্রথম গন্তব্য হয় প্রতিবেশী কোনো দেশে। পরে সেখান থেকে চড়া দামে চীন, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনামসহ বেশকিছু দেশে পাচার করা হয়েছে। এছাড়া জীবিত প্রাণীর পাশাপাশি কচ্ছপের হাড়, হাঙরের চর্বি ও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ আন্তর্জাতিক চোরাকারবারিদের মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়ে থাকে।
গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকে চুরি যাওয়া তিনটি রিংটেইলড লেমুরের বিষয়ে অনুসন্ধান করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তাদের তথ্য বলছে, গত ২৩ মার্চ রাতে গাজীপুর সাফারি পার্কের নিরাপত্তাবেষ্টনী কেটে বিপন্ন ও বিরল প্রজাতির দুটি পুরুষ এবং একটি স্ত্রী রিংটেইলড লেমুর চুরির ঘটনা ঘটে। তদন্তে উঠে আসে, ২০১৮ সালে মাদাগাস্কার থেকে দুটি প্রতিষ্ঠান আমদানি, সংরক্ষণ এবং বিক্রয় নিষিদ্ধ দুটি রিংটেইলড লেমুরসহ ৮৬ জোড়া প্রাণী আমদানি করে। পরবর্তী সময়ে প্রাণীগুলোকে গাজীপুর সাফারি পার্কে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রদান করা হয়। দুটি রিংটেইলড লেমুর সাফারি পার্কে আরো দুটি বাচ্চার জন্ম দিলে মোট চারটি লেমুরের আবাসন হয় পার্কে। এর মধ্যে একটি লেমুর মারা যায়।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, গাজীপুর সাফারি পার্কটিতে আউটসোর্সিংয়ে কাজ করতেন নিপেল মাহমুদ। পার্কের ভেতরে তিনি বিভিন্ন দুর্লভ, বিপন্ন ও বিরল প্রজাতির বন্যপ্রাণীদের ছবি এবং ভিডিও ধারণ করতেন। সে ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্লাটফর্মের প্রাইভেট গ্রুপ ও পেজগুলোয় পোস্ট করে দেশী-বিদেশী ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেন। ক্রেতাদের কোনো প্রাণী পছন্দ হলে দরদাম করে মূল্য নির্ধারিত হলে পছন্দকৃত প্রাণীকে চুরি করতেন তিনি।
এভাবেই গত ২৩ মার্চ ভোরে নিরাপত্তাবেষ্টনী কেটে বিপন্ন ও বিরল প্রজাতির তিনটি রিংটেইলড লেমুর চুরি করে প্রতিবেশী মো. জুয়েল মিয়ার বাড়িতে রাখেন। এর মধ্যে একটি রিংটেইলড লেমুর দেলোয়ার হোসেন তাওসীফ এবং মো. সাব্বির হোসেন তপনের কাছে ৫ লাখ ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন নিপেল মাহমুদ। আরো দুটি লেমুর আছে জানতে পেরে তারা দুজন ভারতীয় ক্রেতার সঙ্গে ৭ লাখ টাকায় বিক্রির জন্য মধ্যস্থতা করে দেয়। পরে দেলোয়ার হোসেন তাওসীফ ও সাব্বির হোসেন তপন দুজন ভারতীয় ক্রেতাসহ ময়মনসিংহের ভালুকা এলাকা থেকে দুটি লেমুর কার্টনে ভরে ক্রেতাদের গাড়িতে তুলে দেন। এ সময় নিপেলকে ৭০ হাজার টাকা কমিশন হিসেবে দেয়া হয়।
সিআইà¦