মনজুর এ আজিজ : গ্রীষ্মে বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকায় গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করতে দাম বাড়া সত্ত্বেও মে মাসে ১১টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা করেছে সরকার। এর আগে ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা ও হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় এপ্রিলের মতো মে মাসেও এলএনজি কার্গো আমদানির সংখ্যা ১১টি থেকে কমিয়ে ৯টি করার চিন্তা করেছিল বাংলাদেশ।
তবে গ্যাস আমদানি কমালে বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ কমে যেতে পারে এবং আসন্ন তীব্র গরমের দিনে লোডশেডিং বাড়তে পারে এমন আশঙ্কায় ওই সিদ্ধান্ত থেকে পরে সরে এসেছে সরকার। ওই সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৭ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখতে বেশি পরিমাণে এলএনজি আমদানি করা জরুরি।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) একেএম মিজানুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, ১১টি এলএনজি কার্গো আমদানি করা গেলে বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতিদিন প্রায় ৯৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে, যা দিয়ে ৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে। তিনি বলেন, মে মাসে কতগুলো কার্গো প্রয়োজন হবে, তা নির্ধারণ করা হয়েছে বিদ্যুতের চাহিদা, বোরো মৌসুমে সার উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রয়োজন এবং শিল্পখাতের গ্যাস ব্যবহার বিবেচনায় রেখে।
এ পর্যন্ত পেট্রোবাংলা মে মাসের জন্য চারটি কার্গো নিশ্চিত করেছে এর মধ্যে দুটি স্পট মার্কেট থেকে এবং দুটি স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে দেশে আনা হবে। বাকি সাতটি কার্গো আগামী কয়েক দিনের মধ্যে চূড়ান্ত করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এদিকে পূর্ণ মাত্রায় জ্বালানি আমদানির পরিকল্পনা বহাল রাখার সিদ্ধান্তে সরকারের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে, কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে এখন দ্বিগুণেরও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে এলএনজি।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, মার্চ ও এপ্রিল মাসে স্পট মার্কেটে এলএনজির গড় দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রতি এমএমবিটিইউ ২১ দশমিক ৭৭ ডলার, যা বছরের শুরুতে ছিল ১০ দশমিক ১৮ ডলার—অর্থাৎ দাম বেড়ে প্রায় ১১৪ শতাংশ। এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে মূলত ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের বিঘ্নকেই দায়ী করা হচ্ছে। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) একেএম মিজানুর রহমান বলেন, মে মাসে ১১টি কার্গো আমদানি করতে যুদ্ধ-পূর্ব ব্যয়ের তুলনায় অতিরিক্ত প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।
বর্ধিত ব্যয় সামাল দিতে সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে এলএনজি আমদানির জন্য নির্ধারিত ৬ হাজার কোটি টাকার পাশাপাশি সর্বোচ্চ আরও ১৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ দিয়েছে। কর্মকর্তারা জানান, শুধু এপ্রিল ও মে মাসেই এলএনজি আমদানিতে অতিরিক্ত প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। চলমান সরবরাহ সংকটের কারণে বাংলাদেশকে এখন উচ্চমূল্যের স্পট মার্কেটের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর আগে মে মাসের ১১টি কার্গোর মধ্যে ৯টি দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে এবং মাত্র ২টি স্পট মার্কেট থেকে কেনার পরিকল্পনা ছিল। তবে সর্বশেষ পরিকল্পনায় বড় পরিবর্তন এসেছে এখন ৮টি কার্গো স্পট মার্কেট থেকে এবং মাত্র ৩টি বিদ্যমান চুক্তির মাধ্যমে আনার কথা হচ্ছে। কাতারএনার্জি, ওমানের ওকিউটি ট্রেডিং এবং এক্সেলারেট এনার্জিসহ বড় এলএনজি সরবরাহকারীদের ফোর্স মেজর ঘোষণা দেওয়ার পর পরিকল্পনায় এই পরিবর্তন আসে। চুক্তিভিত্তিক তিনটি কার্গোর মধ্যে দুটি কাতারএনার্জি ট্রেডিং থেকে এবং একটি সৌদি আরবের আরামকো ট্রেডিং কোম্পানি থেকে আসবে—যাদের সরবরাহের উৎস মূলত অ্যাঙ্গোলা ও যুক্তরাষ্ট্র।
অতিরিক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) গত ১ এপ্রিল মাস্টার সেলস অ্যান্ড পারচেজ এগ্রিমেন্ট (এমএসপিএ) এর আওতায় ২৪টি আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীকে আহ্বান জানিয়ে একটি টেন্ডার আহ্বান করেছে, যেখানে মে মাসের শুরুতে সরবরাহযোগ্য তিনটি স্পট কার্গোর জন্য প্রস্তাবিত মূল্য চাওয়া হয়েছে। পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, লোডশেডিং কমাতে মে মাসে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটি বিদ্যুৎ খাতে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৯৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা করেছে। দেশে প্রতি ১০০ এমএমসিএফডি গ্যাস দিয়ে প্রায় ৫০০-৫৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। সে হিসেবে পরিকল্পিত সরবরাহ থেকে প্রায় ৪,৭০০ থেকে ৫,১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। এদিকে, এপ্রিলের শুরুতেই বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। ৫ এপ্রিল গড় সরবরাহ ছিল ৮৭৫ এমএমসিএফডি এবং একই দিনে সর্বোচ্চ ৯১৩ দশমিক ২ এমএমসিএফডি সরবরাহ রেকর্ড করা হয়েছে, যা ১ এপ্রিলের ৮৫২ দশমিক ৫ এমএমসিএফডি থেকে কিছুটা বেশি।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য মোট চাহিদা ২,৫২৪ দশমিক ৯ এমএমসিএফডি হলেও সরবরাহ এখনো তার অনেক কম। মে মাসে সার খাতে প্রায় ৮৫ এমএমসিএফডি গ্যাস বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যা চাহিদা ৩২৯ এমএমসিএফডির তুলনায় অনেক কম। বাকি গ্যাস শিল্প ও আবাসিক খাতে দেওয়া হবে।সামগ্রিকভাবে গ্যাস সরবরাহ ২,৫৭০ থেকে ২,৬৫০ এমএমসিএফডির মধ্যে স্থিতিশীল থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বৃষ্টিপাত কম হলে মে মাসে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে প্রায় ১৭ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে। গত বছর ১০ মে সর্বোচ্চ ১৬ হাজার ১৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেও চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট। ফলে সে সময় ৬৫১ মেগাওয়াট লোডশেডিং দিতে হয়েছিল। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা ১১ হাজার ৭৯৪ মেগাওয়াট, যা মোট ২৭ হাজার ৪১৪ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) একেএম মিজানুর রহমান বলেন, সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বাড়তি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এই দুই চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে সামলানো এখন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এদিকে গ্রীষ্মের চাহিদার সময়ে লোডশেডিং এড়াতে বিদ্যুৎকেন্দ্রে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে এলএনজির দামের অস্বাভাবিক ওঠানামা ভর্তুকি ব্যবস্থার ওপর বড় চাপ তৈরি করছে। আমরা একইসঙ্গে ব্যয় সহনীয় রাখতে এবং সরবরাহ নিশ্চিত করতে চেষ্টা করে যাচ্ছি। তবে চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ব্যয়বহুল স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়তে থাকায় নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন একদিকে গ্যাস সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা এবং অন্যদিকে বাড়তি ভর্তুকির চাপ সামাল দেওয়ায় কঠিন চ্যালেঞ্জ।