আজিজুল হক, বেনাপোল (যশোর): বেনাপোল বন্দর দিয়ে গতকাল ভারত–বাংলাদেশের মধ্যে ১ হাজার ৪৩৭ জন পাসপোর্টধারী যাতায়াত করেছেন। একই সময়ে দুই দেশের মধ্যে ৬৬২ ট্রাক বিভিন্ন ধরনের পণ্যের আমদানি–রফতানি বাণিজ্য হয়েছে। এতে ভ্রমণ খাতে সরকারের প্রায় ১৩ লাখ টাকা এবং বাণিজ্য খাতে প্রায় ১১ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে।
রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) সকালে বন্দর পরিচালক (ট্রাফিক) শামিম হোসেন বেনাপোল রুটে পাসপোর্টধারী যাতায়াত ও বাণিজ্যের এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।
স্থানীয় মানিচেঞ্জার ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, রোববার বাংলাদেশি ১০০ টাকার বিপরীতে পাওয়া গেছে ৭৬ দশমিক ৫০ ভারতীয় রুপি এবং ভারতীয় ১০০ রুপিতে বাংলাদেশি টাকা পাওয়া গেছে ১২৭ টাকা। এদিন প্রতি মার্কিন ডলারের ক্রয়মূল্য ছিল ১২৫ টাকা এবং বিক্রয়মূল্য ১২৬ টাকা।
বন্দর সূত্র জানায়, বেনাপোল–পেট্রাপোল রুটে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত আমদানি ও রফতানি কার্যক্রম চলে। শনিবার দিনভর ভারত থেকে আমদানি হয়েছে ৫৩২ ট্রাক বিভিন্ন ধরনের পণ্য। এর মধ্যে ছিল ৩৮১ ট্রাক শিল্পকারখানার কাঁচামাল, তৈরি পোশাক, কেমিক্যাল, শিশু খাদ্য ও যন্ত্রপাতিসহ বিভিন্ন পণ্য। এছাড়া ৬৬ ট্রাক চ্যাসিস, ৪ ট্রাক ব্লিচিং পাউডার, ২ ট্রাংকার অক্সিজেন, ২৯ ট্রাক কাঁচা তুলা এবং ৫০ ট্রাক আপেল, আঙুর, কেনু, মাছসহ বিভিন্ন ধরনের ফল আমদানি হয়েছে।
একই দিনে বাংলাদেশ থেকে ভারতে রফতানি হয়েছে ১৩০ ট্রাক পণ্য। রফতানিকৃত পণ্যের মধ্যে রয়েছে বসুন্ধরা টিস্যু, মেলামাইন, কেমিক্যাল, মাছ ও ওয়ালটন পণ্যসামগ্রী। ভারত সরকারের নিষেধাজ্ঞার কারণে বর্তমানে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে পাট, পাটজাত দ্রব্য, তৈরি পোশাক ও কাঠের তৈরি আসবাবপত্র রফতানি বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে, দেশীয় শিল্প সুরক্ষার কারণ দেখিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নিষেধাজ্ঞায় সরকার পরিবর্তনের পর থেকে সুতাসহ কয়েকটি পণ্যের আমদানিও বন্ধ আছে।
ট্রান্সপোর্ট সূত্র জানায়, শনিবার বেনাপোল বন্দর থেকে ঢাকা পর্যন্ত পচনশীল পণ্য পরিবহনে ট্রাকপ্রতি ভাড়া ছিল ২০ থেকে ২১ হাজার টাকা, চট্টগ্রামে ২৮ থেকে ২৯ হাজার টাকা, খুলনায় ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা এবং বরিশালে ১৮ থেকে ১৯ হাজার টাকা। পচনশীল পণ্য ছাড়া অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রে ঢাকা পর্যন্ত ভাড়া ছিল ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকা, চট্টগ্রামে ২২ থেকে ২৩ হাজার টাকা, খুলনায় ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা এবং বরিশালে ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা।
বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের দপ্তর সম্পাদক মোস্তাফিজ্জোহা সেলিম জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭০০ ট্রাক পণ্যের বাণিজ্য হতো। তবে গত বছরের ৫ আগস্টের পর দুই দেশের মধ্যে একের পর এক নিষেধাজ্ঞার কারণে আমদানি–রফতানি ও পাসপোর্টধারী যাতায়াত প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে। এক বছর ধরে দুই দেশের বাণিজ্য বৈঠক বন্ধ থাকায় উভয় দেশের ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
এতে গত বছরে আগের বছরের তুলনায় দেড় লাখ টনের বেশি পণ্য আমদানি কমেছে এবং চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১ হাজার ১২ কোটি টাকা রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে। একই সময়ে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৩ লাখ ৫০ হাজার পাসপোর্টধারীর যাতায়াত কমেছে। বাণিজ্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করেন তিনি।
ইমিগ্রেশন সূত্র জানায়, প্রতিদিন ভোর সাড়ে ৬টা থেকে বেনাপোল–পেট্রাপোল বন্দরের মধ্যে পাসপোর্টধারী যাতায়াত শুরু হয়। ভারত ভ্রমণের ক্ষেত্রে ১২ বছরের ঊর্ধ্বে যাত্রীদের ভ্রমণ কর বাবদ ১ হাজার টাকা এবং বন্দর কর ৬১ টাকা দিতে হয়। ৫ থেকে ১২ বছরের নিচে যাত্রীদের ক্ষেত্রে ভ্রমণ কর ৫৬১ টাকা এবং ৫ বছরের নিচে শিশুদের ক্ষেত্রে শুধু ৬১ টাকা বন্দর কর দিতে হয়। ক্যানসার রোগী, প্রতিবন্ধী ও মুক্তিযোদ্ধাদের ভ্রমণ কর মাত্র ৬১ টাকা নির্ধারিত।
এছাড়া চলতি মাস থেকে ভারতের পেট্রাপোল ইমিগ্রেশনে বাংলাদেশি ও ভারতীয় পাসপোর্টধারীদের ভ্রমণ কর হিসেবে ৪০০ রুপি এবং বিদেশিদের জন্য ৮০০ রুপি আদায় করা হচ্ছে।
শনিবার ভোর সাড়ে ৬টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৪৩৭ জন যাত্রী যাতায়াত করেছেন। এর মধ্যে বেনাপোল বন্দর দিয়ে ভারতে গেছেন ৮৩০ জন এবং ভারত থেকে ফিরেছেন ৬০৭ জন। ভিসা জটিলতার কারণে গত ৫ আগস্টের পর পাসপোর্টধারী যাতায়াত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
বেনাপোল রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার আয়নাল হাসান জানান, রেলপথে বর্তমানে কেবল এসিআই মোটরসের আমদানিকৃত ট্রাক্টর ভারত থেকে দেশে আসে। গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে অন্যান্য পণ্যের রেল আমদানি বন্ধ রয়েছে এবং ভারতের নিষেধাজ্ঞার কারণে ঢাকা–বেনাপোল–কলকাতা রুটে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচলও বন্ধ আছে।