ছোট বড় বিভিন্ন প্রজাতির গাছের সমারোহ। মাঝ দিয়ে পায়ে হাঁটা সরু পথ। এত কাছাকাছি গাছ আর লতা-গুল্মের ঝোপ, সূর্যের আলোও যেন ঠিকমতো মাটিতে পড়ছে না। দেখে মনে হচ্ছে, কয়েকশ বছর ধরে গড়ে ওঠা ঘন জঙ্গল।
একসময় দেশের গ্রামাঞ্চলে এমন দৃশ্য হরহামেশা চোখে পড়লেও এখন যেন দেখা মেলা ভার। খাদ্যপণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি সড়ক, কলকারখানা আর বসতবাড়ির চাহিদা মেটানোই যেন এখন মূখ্য। যাতে অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে এমন ক্ষুদ্র বনাঞ্চল।
সুন্দরবন কিংবা পার্বত্য এলাকার গহীন পাহাড়ি অরণ্যে এমন দৃশ্য চোখে পড়লেও নগর জীবনে এগুলো এখন আর খুব একটা চোখে পড়ে না। উল্টো কংক্রিটের চাহিদা মেটাতে গাছপালা কেটে পোড়ানো হচ্ছে ইটভাটায়।
এমন প্রেক্ষাপটে ব্যক্তি উদ্যেগে চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে গড়ে উঠেছে একটি কৃত্রিম বন। যেখানে মাত্র চার হাজার ৪০০ বর্গফুট জায়গায় ছোট-বড় ১২০ প্রজাতির গাছ ও লতাগুল্মে মাত্র তিন বছরেই ঘন জঙ্গলে পরিণত হয়েছে।
এই প্রকল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, 'মিয়াওয়াকি ফরেস্ট' পদ্ধতিতে পরীক্ষামূলকভাবে দেশের প্রথম কৃত্রিম বন তৈরিতে সফল হয়েছেন তারা।
এর মাধ্যমে কেবল সবুজের সমারোহই নয়, ওই এলাকার প্রকৃতি ও জীববৈচিত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলেও মনে করেন তারা।
প্রাকৃতিক কৃষি কেন্দ্রের উদ্যোক্তা ও পরিচালক দেলোয়ার জাহান বিবিসি বাংলাকে বলছেন, বিশেষ উপায়ে মাটি প্রস্তুত করে কোনো ধরনের রাসায়নিকের ব্যবহার ছাড়াই খুব কম সময়ে কৃত্রিম বন তৈরি সম্ভব মিয়াওয়াকি পদ্ধতিতে।
"যা ঘন করে রোপন করার কারণে দশ বছরেই একশ বছরের একটি ঘন বনের আকার ধারণ করে," বলেন মি. জাহান।
তিনি বলছেন, "দেশের প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায় বণাঞ্চল বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আঞ্চলিক পর্যায়ে 'মিয়াওয়াকি ফরেস্ট' অবশ্যই কার্যকর একটি উপায় হতে পারে। তবে আমাদের দেশে কয়েক বছর আগেও বাড়িঘরের আশপাশে যে ঝোপঝাড় বা ছোট বন প্রাকৃতিক উপায়েই তৈরি হতো সেগুলোও তো এখন নেই।"
বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে রিফরেস্টেশন বা অরণ্যায়ন করার ক্ষেত্রে 'মিয়াওয়াকি ফরেস্ট' পদ্ধতি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ফরেস্ট্রি এন্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক মো. দানেশ মিয়া।
তিনি বলছেন, "জাপানের একটা কনসেপ্ট এখানে বলা হচ্ছে । কিন্তু এই ধরনের বনাঞ্চল বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে কিন্তু ঐতিহ্যগতভাবে অনেক আগে থেকেই ছিল, কিন্তু অতিরিক্ত মানুষের কারণে এটা রাখা যায়নি।"
'মিয়াওয়াকি ফরেস্ট' আসলে কি
'মিয়াওয়াকি ফরেস্ট' মূলত বনায়নের একটি পদ্ধতি। জাপানি উদ্ভিদবিদ এবং উদ্ভিদ বাস্তুবিদ্যা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আকিরা মিয়াওয়াকি বনায়নের এই পদ্ধতিটি তৈরি করেছিলেন।
যার মূল উদ্দেশ্য ছিল, প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মাত্র ২০-৩০ বছরের মধ্যে শতভাগ জৈব, ঘন এবং বৈচিত্র্যময় বন তৈরি করা।
এই পদ্ধতির মাধ্যমে ছোট জায়গায় নিজেদের মত কৃত্রিম বন তৈরি করা যায়। যা স্বাভাবিক বনাঞ্চলের তুলনায় ১০ গুণ দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে, অনেক বেশি ঘন এবং জীববৈচিত্র্য ধারণ করতে সক্ষম।
নির্দিষ্ট জলবায়ু পরিস্থিতি বিবেচনা করে, শুধুমাত্র সেই স্থানীয় প্রজাতিগুলোই রোপণ করা হয়, যা ওই অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবেই জন্মেছিল।
এ পদ্ধতিতে লাগানো গাছ প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা বনের গাছের তুলনায় ১০ গুণ দ্রুতগতিতে বড় হয়। এছাড়া অন্য সাধারণ বন থেকে এই বন ৩০ গুণ বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করতে পারে, যা এই পদ্ধতিতে গড়ে ওঠা বনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় এই পদ্ধতি ব্যবহার করে বনাঞ্চল গড়ে তোলা হয়েছে। বিশেষ করে আকিরা মিয়াওয়াকির এই ধারণা কাজে লাগিয়ে 'মিয়াওয়াকি ফরেস্ট' গড়ে তুলে সুফল পাচ্ছে ভারত এবং নেদারল্যান্ড।
বাংলাদেশে মীরসরাই উপজেলার সোনাপাহাড় এলাকায় 'প্রকল্প সোনাপাহাড়' নামে একটি প্রকল্পে প্রথমবারের মতো পরীক্ষামূলকভাবে এই 'মিয়াওয়াকি ফরেস্ট' ধারণার বাস্তবায়ন করা হয় প্রায় তিন বছর আগে।
যেখানে এখন ছোট আকারের একটি বন তৈরি হয়েছে, যা ওই এলাকার জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও বড় ভূমিকা রাখছে।
এই পদ্ধতিতে বন তৈরির প্রক্রিয়া
মিয়াওয়াকি পদ্ধতি মূলত প্রাকৃতিক এবং কৃত্রিম এই দুইয়ের মিশ্রণ। অর্থাৎ এই পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট অঞ্চলের গাছ সেই অঞ্চ